আহলে কিতাব: ভবিষ্যদ্বাণী, পূর্বাভাস ও অতীত ঘটনাবলী


নবীর মৃত্যুর পরে ইসলামী বিজয় অভিযানসমূহের সময় এবং পরপরই বিপুল সংখ্যক খৃষ্টান ইসলাম গ্রহণ করে। তারা এতে বাধ্য হয়নি, বরং তারা যা ইতোমধ্যেই আশা করছিল, এটা তারই স্বীকৃতি। আনসেলম টরমিদা, যিনি একজন যাজক ও খৃষ্টান পণ্ডিত, তিনি এধরনের একজন ছিলেন যার ইতিহাস উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক। তিনি একটি বিখ্যাত বই লিখেছেন খৃষ্টানদের যুক্তি প্রত্যাখ্যান করার জন্য বুদ্ধিমানদের জন্য উপহার। বইয়ের ভূমিকায় তিনি তাঁর ইতিহাস বর্ণনা করেছেন।

আপনাদের জানার জন্য বলছি যে আমি এসেছি মাজোরকা শহর থেকে, যা সমুদ্র তীরে অবস্থিত একটি বড় শহর, দুটি পর্বতের মাঝখানে এবং একটি উপত্যকা দিয়ে দ্বিধাবিভক্ত। দুটি চমৎকার পোতাশ্রয় সহ এটি একটি বাণিজ্যিক শহর। বড় বড় বাণিজ্য তরী বিভিন্ন মালপত্র নিয়ে পোতাশ্রয়ে নোঙ্গর করে। শহরটি যে দ্বীপে অবস্থিত, তার নামও একই-মাজোরকা, এবং এর অধিকাংশ ভূমিই ডুমুর ও জয়তুন গাছে ভরা। আমার পিতা শহরের একজন সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন। আমি তাঁর একমাত্র পুত্র। যখন আমি ছয় বছরের বালক, তিনি আমাকে একজন যাজকের কাছে পাঠালেন যিনি আমাকে ইনজিল পড়ালেন ও যুক্তিবিদ্যা শেখালেন, যা আমি ছয় বছরেই শেষ করি। তারপর আমি মাজোরকা ছেড়ে কাস্টিলিয়ন এলাকার লার্ডা নগরে গেলাম, যা সেই এলাকার খৃষ্টানদের শিক্ষাকেন্দ্র ছিল। এক হাজার থেকে দেড় হাজার খৃষ্টান ছাত্র সেখানে সমবেত হত। সবাই যাজকদের শাসনে থাকত, যারা তাদের শিক্ষা দিতেন। আমি আরো চার বছর ইনজিল ও ভাষা শিক্ষা করলাম। তারপর আমি আনবাদিয়া এলাকার বোলোন-এ গেলাম। বোলোন বিরাট বড় শহর; সেই এলাকার সব মানুষের শিক্ষাকেন্দ্র। প্রতি বছর দু হাজারেরও বেশী ছাত্র সেখানে নানা জায়গা থেকে আসত। তারা মোটা খসখসে কাপড়ে দেহ ঢেকে রাখত যা তারা বলত আল্লাহর রঙতাদের সকলে, শ্রমিকের সন্তান বা শাসকের সন্তান যে হোক, ঐ চাদর পরত; যাতে অন্যদের থেকে ছাত্রদের আলাদা করা যায়। শুধু যাজকরাই তাদের শেখাতেন, নিয়ন্ত্রণ করতেন এবং নির্দেশনা দিতেন। আমি গির্জায় একজন বৃদ্ধ যাজকের সাথে থাকতাম। তিনি তাঁর জ্ঞান, ধার্মিকতা ও কৃচ্ছতার জন্য মানুষের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ছিলেন, যা তাঁকে অন্যান্য খৃষ্টান যাজক থেকে বিশিষ্টতা দিয়েছিল। সব জায়গা থেকে প্রশ্ন ও উপদেশ দানের অনুরোধ আসত, বাদশাহ ও শাসকদের কাছ থেকেও; উপহার, উপঢৌকনসহ। তারা আশা করত যে তিনি তাদের উপহার গ্রহণ করবেন ও তাদের আর্শীবাদ করবেন। তিনি আমাকে খৃষ্টবাদের মূলনীতিসমূহ এবং এর প্রায়োগিক বিধিসমূহ শিক্ষা দিলেন। আমি তাঁর সেবাযত্ন করে ও সব দায়িত্ব পালনে সাহায্য করে তাঁর খুব কাছের লোক হয়ে গেলাম এবং তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহকারীতে পরিণত হলাম। ফলে তিনি আমাকে তাঁর গির্জার ভিতরে তাঁর বাসগৃহের এবং খাদ্য ও পানীয়ের ভাণ্ডারের চাবির দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তিনি নিজের কাছে শুধু একটা চাবি রেখেছিলেন যে ঘরে তিনি ঘুমাতেন সে ঘরের। আমার ধারণা, আল্লাহই ভাল জানেন, যে তিনি তার কোষাগার সেখানে রাখতেন। আমি দশ বছর যাবত ছাত্র ও খাদেম ছিলাম, তারপর তিনি অসুস্থ হলেন এবং তাঁর সহকর্মী যাজকদের সভায় উপস্থিত হতে পারলেন না। তাঁর অনুপস্থিতিতে যাজকরা কিছু ধর্মীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছিল, যতক্ষণ না তারা সেই জায়গায় আসে যেখানে ইনজিলে সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাঁর নবী যীশুর মাধ্যমে বলছেন: তারপর পারাক্লীট নামে এক নবী আসবেন। এই নবীকে নিয়ে এবং নবীদের মধ্যে ইনি কোনজন তা নিয়ে তারা বহু তর্কবিতর্ক করলো। প্রত্যেকেই নিজ নিজ জ্ঞানবুদ্ধি অনুসারে মতামত দিল; এবং তারা এই বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত ছাড়াই আলোচনা শেষ করলো। আমি আমার যাজকের কাছে গেলাম এবং তিনি যথারীতি সেদিনের ঘটনার বিবরণ জানতে চাইলেন। আমি তাঁর কাছে পারাক্লীট সম্পর্কে যাজকদের বিভিন্ন মতামত উল্লেখ করলাম, এবং কিভাবে তারা এর অর্থ পরিষ্কারভাবে না বুঝেই সভা শেষ করেছে তা বললাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার উত্তর কি? আমি বাইবেলের সুপরিচিত ব্যাখ্যার আলোকে আমার মতামত দিলাম। তিনি বললেন যে আমার বক্তব্য কোন কোন যাজকের মত প্রায় সঠিক, এবং অন্যান্যরা ভুল। কিন্তু সত্য এসবকিছুর চেয়ে ভিন্ন। এটা এজন্য যে এই মহান নামের ব্যাখ্যা খুব অল্প সংখ্যক সুশিক্ষিত পণ্ডিতের জানা আছে। এবং আমরা খুব কমই জানি। আমি নীচু হয়ে তাঁর পায়ে চুমু খেলাম, বললাম: জনাব, আপনি জানেন যে আমি বহু দূরের দেশ থেকে সফর করে আপনার কাছে এসেছি, দশ বছরেরও বেশী সময় ধরে আপনার সেবা করছি, এবং অনুমানের বাইরে জ্ঞান অর্জন করেছি, সুতরাং দয়া করে আমাকে অনুগ্রহ করুন এবং এই নামের ব্যাপারে আমাকে সত্য কি তা বলুন। যাজক তখন কাঁদলেন এবং বললেন, হে বৎস! আল্লাহর শপথ, তোমার সেবাযত্ন ও আমার প্রতি তোমার আন্তরিকতার জন্য তুমি আমার খুবই প্রিয়। এই নামের সত্য জানার ভিতরে বিরাট উপকার রয়েছে, কিন্তু বিরাট বিপদও আছে। এবং আমি ভয় করি যে যখন তুমি সত্য জানবে এবং খৃষ্টানরা সেটা বুঝতে পারবে, তুমি সাথে সাথে নিহত হবে। আমি বললাম, আল্লাহর শপথ, ইনজিলের শপথ এবং তাঁর যিনি এটা সহ প্রেরিত হয়েছিলেন, আপনি যা বলবেন তার একটি কথাও আমি কাউকে বলব না, আমি তা আমার অন্তরের মাঝে গোপন রাখব। তিনি বললেন, হে বৎস! যখন তুমি তোমার দেশ থেকে এখানে এসেছিলে, আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম দেশটি মুসলিমদের এলাকার কাছে কিনা, এবং তারা তোমাদের উপর হামলা করে কিনা বা তোমরা তাদের উপর হামলা করো কিনা। এটা ইসলামের প্রতি তোমার বিদ্বেষ কতটুকু তা পরীক্ষার করার জন্য। জেনে রাখ, হে বৎস, পারাক্লিট নবী মুহাম্মাদের নাম, যাঁর প্রতি দানিয়েল নবীর কথামত চতুর্থ কিতাব নাযিল হয়েছে। তাঁর পথই হচ্ছে ইনজিলে বর্ণিত সরল পথ। আমি বললাম: তাহলে জনাব, এই খৃষ্টানদের ধর্ম সম্পর্কে আপনি কি বলবেন? তিনি বললেন: হে বৎস, যদি এই খৃষ্টানরা যীশুর আদি ধর্মের উপর থাকত, তাহলে তারা আল্লাহর ধর্মের উপর থাকত, কারণ যীশুর ধর্ম ও অন্য সব নবীদের ধর্ম আল্লাহর একই সত্য ধর্ম। কিন্তু তারা তা পরিবর্তন করেছে এবং অবিশ্বাসী হয়ে গেছে। আমি তাঁকে বললাম: তাহলে জনাব এ থেকে বাঁচার উপায় কি? তিনি বললেন, হে আমার পুত্র, ইসলাম গ্রহণ করা। আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম: যে ইসলাম গ্রহণ করেছে সে কি মুক্তি পাবে? তিনি উত্তর দিলেন: হ্যাঁ, এই দুনিয়ায় এবং পরজীবনে। আমি বললাম: বিচক্ষণ ব্যক্তি নিজের জন্য উত্তমকেই বেছে নেয়; যদি আপনি ইসলামের মূল্য বুঝে থাকেন, জনাব, তাহলে কিসে আপনাকে এ থেকে বিরত রেখেছে? তিনি উত্তর দিলেন: হে বৎস, সর্বশক্তিমান আল্লাহ আমাকে ইসলামের সত্য জানার ও ইসলামের নবীকে বোঝার সুযোগ দেননি যতক্ষণ না আমি বৃদ্ধ হয়েছি এবং আমার হাড় দুর্বল হয়েছে। হ্যাঁ, আমাদের জন্য এতে কোন ওজর নেই, অপরপক্ষে আল্লাহর প্রমাণ আমাদের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যদি আল্লাহ আমাকে তোমার মত বয়সে এই নির্দেশনা দান করতেন, আমি সবকিছু ত্যাগ করে সত্য ধর্ম গ্রহণ করতাম। এই দুনিয়ার প্রতি ভালবাসাই সকল পাপের উৎস, এবং দেখ, আমি খৃষ্টানদের দ্বারা কত শ্রদ্ধেয়, প্রশংসাপ্রাপ্ত ও সম্মানিত, এবং আমি কত সচ্ছলতা ও আরামের মধ্যে বাস করছি! আমার ক্ষেত্রে, আমি যদি ইসলামের প্রতি সামান্য আকর্ষণ প্রদর্শন করি, তারা অনতিবিলম্বে আমাকে হত্যা করবে। মনে কর আমি তাদের হাত থেকে বেঁচে গেলাম এবং মুসলিমদের কাছে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলাম, তারা বলবে, তোমার ইসলাম গ্রহণ করাতে আমাদের অনুগ্রহ করা হয়েছে বলে মনে করো না, এতে তুমিই নিজের প্রতি অনুগ্রহ করেছ সত্য ধর্মে প্রবেশ করে, সেই ধর্ম যা তোমাকে আল্লাহর শাস্তি থেকে বাঁচাবে! অতএব আমি তাদের মাঝে একজন নব্বই বছরের দরিদ্র বৃদ্ধ হিসাবে বাস করব, তাদের ভাষা না জেনে, এবং তাদের মাঝে উপবাসে মৃত্যুবরণ করবো। আল্লাহর জন্যই সমস্ত প্রশংসা, আমি যীশুর ধর্মের উপর আছি, যা সহকারে তিনি এসেছিলেন, এবং আল্লাহ আমার সম্পর্কে এটা জানেন। তাই আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কি আমাকে মুসলিমদের দেশে যাওয়ার ও তাদের ধর্ম গ্রহণ করার উপদেশ দেন? তিনি আমাকে বললেন, যদি তুমি বিজ্ঞ হও এবং নিজেকে বাঁচাতে চাও, তাহলে তার দিকে দৌড়ে যাও যাতে দুনিয়া ও আখিরাত দুটোই অর্জিত হয়। কিন্তু হে পুত্র, এ বিষয় সম্পর্কে কেউ আমাদের সাথে উপস্থিত না থাকায় জানে না, এটা শুধু তোমার ও আমার মধ্যে। চেষ্টা কর এবং এটাকে গোপন রাখ। যদি এটা প্রকাশিত হয় এবং লোকে এ সম্পর্কে জানতে পারে, তারা অনতিবিলম্বে তোমাকে হত্যা করবে। তাদের বিরুদ্ধে আমি তোমার কোন কাজেই লাগতে পারব না। না তোমার একথা বলা কোন কাজে আসবে যে তুমি আমার কাছে ইসলাম সম্পর্কে শুনেছ বা আমি তোমাকে মুসলিম হতে উপদেশ দিয়েছি, কারণ আমি তা অস্বীকার করব। তারা তোমার বিরুদ্ধে আমার সাক্ষ্য বিশ্বাস করবে। সুতরাং যা কিছুই ঘটুক, একটি শব্দও বলো না। আমি প্রতিজ্ঞা করলাম তা না করার জন্য। তিনি আমার প্রতিজ্ঞায় সন্তুষ্ট ও তৃপ্ত হলেন। আমি আমার ভ্রমণের প্রস্তুতি নিতে থাকলাম এবং তাঁকে বিদায় জানালাম। তিনি আমার জন্য প্রার্থনা করলেন এবং পঞ্চাশ দীনার দিলেন। তারপর আমি জাহাজে করে মাজোরকায় গেলাম ও বাবা-মার সাথে ছয় মাস অবস্থান করলাম। তারপর আমি সিসিলি গেলাম ও মুসলিম দেশে যাওয়ার জন্য জাহাজের অপেক্ষায় পাঁচ মাস থাকলাম। অবশেষে তিউনিসগামী একটি জাহাজ এলো। আমরা সূর্যাসে-র পূর্বেই যাত্রা করলাম এবং দ্বিতীয় দিন দুপুরে তিউনিস পৌঁছলাম। যখন আমি জাহাজ থেকে নামলাম, যে সব খৃষ্টান পণ্ডিতরা আমার আসার খবর পেয়েছিলেন, আমাকে অভ্যর্থনা জানাতে এলেন এবং আমি তাদের সাথে সহজভাবে ও আরামে চার মাস কাটালাম। তারপর আমি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলাম কোন দোভাষী আছে কিনা। তখন সুলতান ছিলেন আবুল আব্বাস আহমেদ। তারা বললেন যে সুলতানের যিনি চিকিৎসক, তিনি একজন মহৎ লোক, এবং তিনি সুলতানের নিকট উপদেষ্টাদের একজন। তাঁর নাম ইউসুফ আল তাবিব। আমি শুনে অত্যন্ত খুশী হলাম এবং তিনি কোথায় থাকেন জানতে চাইলাম। তারা আমাকে সেখানে আলাদাভাবে সাক্ষাতের জন্য নিয়ে গেলেন। আমি তাঁকে আমার কাহিনী শোনালাম এবং আমার এখানে আসার কারণ জানালাম; যা হলো ইসলাম গ্রহণ। তিনি অত্যন্ত আনন্দিত হলেন যে ব্যাপারটি তাঁর সাহায্যে সম্পূর্ণ হবে। সুলতান রাজী হলেন এবং আমি তাঁর সামনে উপস্থিত হলাম। সুলতান আমাকে প্রথম প্রশ্ন করলেন আমার বয়স সম্পর্কে। আমি বললাম যে আমার বয়স পঁয়ত্রিশ বছর। তিনি তখন আমার শিক্ষা ও যে সব বিষয়ে আমি জ্ঞান অর্জন করেছি তা জানতে চাইলেন। আমি উত্তর দেবার পর তিনি বললেন, আপনার আগমন ভালত্বের আগমন। আল্লাহর রহমতে মুসলিম হয়ে যান। আমি তখন ডাক্তারকে বললাম, সম্মানিত সুলতানকে বলুন যে যখন কেউ তার ধর্ম পরিবর্তন করে, তার লোকজন তার অমর্যাদা করে এবং তার সম্পর্কে মন্দ কথা বলে। তাই, আমি চাই সুলতান যেন দয়া করে এই নগরীর খৃষ্টান যাজকদের ও ব্যবসায়ীদের আনতে পাঠান এবং আমার সম্পর্কে তাদের কাছ থেকে জেনে নেন তাদের কি বলার আছে। তারপর আল্লাহর ইচ্ছায়, আমি ইসলাম গ্রহণ করবো। তিনি দোভাষীর মাধ্যমে আমাকে বললেন, আপনি তাই বলেছেন যা আবদুল্লাহ বিন সালাম নবী (সঃ) এঁর কাছে এসে ইসলাম গ্রহণের সময় বলেছিলেন। তিনি তখন যাজকদের ও কয়েকজন খৃষ্টান ব্যবসায়ীকে আনতে পাঠালেন ও আমাকে একটি সংলগ্ন কক্ষে বসিয়ে রাখলেন তাদের চোখের আড়ালে। আপনারা এই নতুন যাজক সম্পর্কে কি মনে করেন যিনি জাহাজে করে এসেছেন? তারা বললেন: তিনি আমাদের ধর্মের একজন বড় পণ্ডিত। আমাদের পাদ্রীরা বলেন যে তিনি সবচেয়ে জ্ঞানী এবং ধর্মীয় জ্ঞানে কেউ তাঁর চেয়ে অগ্রগামী নয়। খৃষ্টানদের একথা শোনার পর সুলতান আমাকে ডেকে পাঠালেন এবং আমি তাদের সম্মুখে এলাম। আমি দুটি সাক্ষ্য উচ্চারণ করলাম যে আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল, এবং যখন খৃষ্টানরা একথা শুনল তারা পরস্পরকে ক্রসচিহ্ন এঁকে দেখাল এবং বলল: বিয়ে করার আকাঙ্খা ছাড়া আর কিছুই তাকে এ কাজে প্রেরণা দেয়নি, কারণ আমাদের ধর্মে যাজকরা বিয়ে করতে পারে না। তারপর তারা হতাশা ও দুঃখের সাথে স্থানত্যাগ করলো। সুলতান আমার জন্য দৈনিক এক চতুর্থাংশ দীনার বরাদ্দ করলেন এবং আল হাজ্জ মুহাম্মাদ আল সফর এর কন্যার সাথে আমার বিয়ে দিলেন। যখন আমি স্ত্রীকে ঘরে আনতে মনস্থ করলাম, তিনি আমাকে একশত সোনার দীনার ও একপ্রস্থ চমৎকার পোশাক উপহার দিলেন। আমি সংসার শুরু করলাম এবং আল্লাহ আমাকে এক পুত্র দিয়ে অনুগ্রহ করলেন যার নাম আমি রেখেছি মুহাম্মাদ, নবীর নাম অনুসারে, বরকতের জন্য।

মদীনায় ইহুদীদের এক সমপ্রদায় বাস করত যারা সেখানে হিজরত করেছিল প্রত্যাশিত নবীর আগমনের অপেক্ষায় থাকার জন্য। তারা মদীনার মূর্তিপূজারী আরবদের তাঁর আগমনের কথা বলে হুমকি দিত এভাবে যে তিনি এসে তাদের ধ্বংস করবেন যেভাবে আল্লাহ আদ ও সামুদ জাতিকে ধ্বংস করেছিলেন। এ কারণেই কিছু সংখ্যক আরব নবীর কথা জানার সাথে সাথে তাঁর সাথে যোগ দেবার জন্য তাড়াহুড়া করেছিল। একজন জ্ঞানী ইহুদী, ইবনুল হাইয়াবান, নবীর আগমনের সাত বছর পূর্বেই সিরিয়া ত্যাগ করে এসেছিল এবং তার মৃত্যুর সময়ে তার সমপ্রদায়কে বলেছিল:

ওহে ইহুদীগণ, তোমরা কি মনে কর এ সম্পর্কে যে আমি কেন খাদ্য ও পানীয়ে পূর্ণ দেশত্যাগ করে কষ্ট ও ক্ষুধার এই দেশে এসেছি?

যখন তারা উত্তর দিল যে তারা বুঝতে পারছে না কেন, তখন সে বললো যে সে এদেশে এসেছে একজন নবীর আবির্ভাবের আশায়, যাঁর আসার সময় সন্নিকট। এই সেই শহর যেখানে তিনি হিজরত করবেন এবং সে এখানে এই আশায় এসেছিল যে তিনি এলে সে তাঁর অনুসারী হবে। বেশ কিছুসংখ্যক ধর্মযাজক ইসলাম গ্রহণ করেছিল, যাদের মাঝে আবদুল্লাহ ইবনে সালাম ছিলেন যিনি, যখন নবীর কাছে তাঁর ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিতে গিয়েছিলেন, বলেছিলেন: ও আল্লাহর রাসূল! আমার লোকেরা অত্যন্ত কূটবুদ্ধি সম্পন্ন, সুতরাং তাদের ডেকে জিজ্ঞাসা করুন আমার সম্পর্কে তারা কি ভাবে। অতএব নবী (সঃ) তাই করলেন, তাদের জিজ্ঞাসা করলেন: তোমরা আবদুল্লাহ ইবনে সালাম সম্পর্কে কি বল? তারা তখন বলল,আল্লাহর কসম, সে আমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি, সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত ও জ্ঞানী। নবী (সঃ) বললেন, যদি সে ইসলাম গ্রহণ করে তাহলে তোমরা কি বলবে? তারা বলল, আমরা আল্লাহর আশ্রয় চাই, সে কখনো তা করবে না! তখন আবদুল্লাহ আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে বললেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। শোনামাত্র তার লোকেরা তাকে গালাগালি করতে লাগল একথা বলে, সে আমাদের মধ্যে নিকৃষ্ট, নীচ বংশজাত এবং সবচেয়ে অজ্ঞ। একবার আবদুল্লাহ ইবনে সালাম এই আয়াতটির উপর মন্তব্য করছিলেন-

এবং তারা (আহলে কিতাব) একথা জানে (যে মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল) যে ভাবে তারা তাদের নিজ সন্তানদের জানে।

“আল্লাহর শপথ, আল্লাহ সত্য বলেন, কারণ আমরা আমাদের সন্তানদের পরিচয়ের ব্যাপারে শুধু আমাদের স্ত্রীদের উপর নির্ভর করি, অথচ আল্লাহ আপনার সম্পর্কে তাঁর কিতাবে উল্লেখ করেছেন (অর্থাৎ তাওরাতে)।” তিনি এটাও সাক্ষ্য দেন যে যখন তিনি নবীর সম্পর্কে শুনেছিলেন, ইতোমধ্যেই তিনি তাঁর নাম, আগমনের সময় এবং স্থান সম্পর্কে জানতেন।

অসংখ্য ঘটনা আছে যেখানে ইহুদীরা নবীকে পরীক্ষা ও প্রশ্ন করেছিল, কেউ তাঁর কথা গ্রহণ করেছিল অন্যেরা করেনি। নবী (সঃ) এঁর স্ত্রী, সাফিয়া বিনতে হুয়াই, তাঁর পিতা ও চাচা (যাঁরা ইহুদী ছিলেন) সম্পর্কে বলেন:

যখন রাসূলুল্লাহ কুবায় আসেন, আমার পিতা হুয়াই ইবনে আখতাব এবং আমার চাচা আবু ইয়াসের ফজরের নামাজের পর অন্ধকার থাকতেই তাঁর সাথে দেখা করতে যান এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত ফিরে আসেননি। তারা ক্লান্ত, ভগ্নোৎসাহ হয়ে ফিরলেন, এবং ধীরে ধীরে হাঁটছিলেন। আমি তাদের কাছে গেলাম কিন্তু তাঁরা এতই বিষণ্ন ছিলেন যে আমাকে খেয়ালই করলেন না। তখন আমি শুনলাম আমার চাচা আমার বাবাকে জিজ্ঞাসা করছেন, ইনি কি সেই জন? তিনি উত্তর দিলেন: হ্যাঁ, আল্লাহর কসম। আমার চাচা বললেন: তুমি কি তাকে চিনতে পেরেছ এবং নিশ্চিত? তিনি বললেন: হ্যাঁ। আমার চাচা বললেন: এখন তুমি তাহলে তার সম্পর্কে কি করবে? তিনি বললেন: আল্লাহর শপথ! যতদিন বেঁচে থাকব ঘৃণা ও শত্রুতা পোষণ করব।

ভবিষ্যদ্বাণী, পূর্বাভাস ও অতীত ঘটনাবলী

মুহাম্মাদের নবুওয়াত গ্রহণ করার ব্যাপারে বাইবেল কি বলে সে সম্পর্কে আমার জ্ঞানে আমি নিজেই প্রভাবিত ছিলাম। এবং দুজন ইহুদী রাবাই বক্তাদের আসরে আমার কাছে স্বীকার করেছিলেন যে তাঁদের কিতাবে উল্লেখিত নবী হচ্ছেন মুহাম্মাদ। এটা বহু আগে থেকেই স্বীকৃত যে নবুওয়াতের দাবীর সত্যতার সুনিশ্চিত লক্ষণ হচ্ছে একজনের সঠিকভাবে এবং ক্রমাগতভাবে ভবিষ্যৎ ঘটনা সম্পর্কে পূর্বাভাস দেওয়ার ক্ষমতা থাকা। এটা বিশেষভাবে খৃষ্টানদের জন্য সত্যি যারা প্রায়ই দাবী করে, মুহাম্মাদ কি কি ভবিষ্যৎদ্বাণী করেছেন? এটা এজন্য যে বাইবেল একে সত্য নবী থেকে মিথ্যা নবী পার্থক্য করার একটা উপায় হিসাবে বর্ণনা করেছে। সবাই কখনো না কখনো ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কিছু বলতে পারে, কেউ সেগুলিকে অনেকবারই সঠিক হিসাবে পেতে পারে, কিন্তু শুধুমাত্র সেই সবসময় সঠিক পূর্বাভাস দিতে পারে যে এমন একজনের কাছ থেকে তথ্য গ্রহণ করে যাঁর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সম্পূর্ণ জ্ঞান আছে। কুরআনে ও সহীহ হাদীসে অনেক ভবিষ্যদ্বাণী আছে যা সত্যি হয়েছে।

  • § ১। কুরআন বলছে:

আল্লাহর ইচ্ছায় তোমরা অবশ্যই মসজিদুল হারামে নিরাপদে প্রবেশ করবে, কেউ মুণ্ডিত মস্তকে, কেউ কেশ কর্তন করবে। তোমাদের কোন ভয় থাকবে না। (সূরা আল ফাতহ, ৪৮ : ২৮)

এই আয়াতটি হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় নাযিল হয়। প্রায় দুই বছরের মধ্যেই আয়াতের ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হয়, মক্কা বিজয় হয় এবং মুসলিমরা হজ্জ করে যেভাবে আয়াতে বলা হয়েছে সেভাবে।

  • § ২। কুরআন বলছে:

তোমাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে আল্লাহ তাদের এ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তিনি তাদের জমীনের উত্তরাধিকারী করবেন, যেমন তিনি করেছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদের এবং তিনি অবশ্যই তাদের জন্য তাদের ধর্মকে সুদৃঢ় করবেন-যা তিনি তাদের জন্য মনোনীত করেছেন এবং ভয়-ভীতির পরিবর্তে তাদেরকে নিরাপত্তা দান করবেন। তারা আমার ইবাদাত করবে, আমার কোন অংশী করবে না। (সূরা আন-নূর, ২৪, ৫৫)

এবং আরো বলছে:

যারা অবিশ্বাস করে তাদের বল, তোমরা শীঘ্রই পরাজিত হবে। (সূরা আলে ইমরান, ৩:১২)

এবং

যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসবে, তুমি দেখবে লোকে দলে দলে প্রবেশ করছে আল্লাহর দ্বীনে…” (সূরা আন-নাসর, ১১০:১-২)

প্রথম আয়াতটি নাযিল হয়েছিল যখন মুসলিমরা দুর্বল ছিল, তাদেরকে ন্যায্য বিজয়ের ওয়াদা দিয়ে। দ্বিতীয়টি সফল হয়েছিল মক্কা বিজয়ের পর এবং প্রথম চার খলীফার খিলাফতকালে যখন মুসলিমরা আল্লাহর সাহায্যে ভূমিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো, পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্য বিজয়ের পর এবং মাত্র বিশ বছরের মধ্যেই স্পেন থেকে চীনের অংশবিশেষ পর্যন্ত মুসলিম সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল। এই বিজয় কুরআনের আরেকটি আয়াতকেও পূর্ণ করছে:

তিনিই রাসূল পাঠিয়েছেন হিদায়াত ও সত্য দ্বীন সহকারে, যাতে তা অন্য সমস্ত ধর্মের উপর বিজয়ী হয়। (সূরা আত-তাওবাহ, ৯:৩২)

ইসলাম আসার পর খৃষ্টান, ইহুদী ও মূর্তিপূজারী ধর্মসমূহ আর কখনই পূর্ব প্রাধান্য ফিরে পায়নি-বাহ্যিকভাবে ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে। কুরআনের (সূরা আল ফাতহ, ৪৮:১৮-২১) এবং (১:১৩) আয়াতও বিজয়ের ওয়াদা ও গণীমত লাভের ওয়াদা করছে-যেগুলি পূর্ণ হয়েছে। ইসলামের বর্তমান বৃদ্ধির হার অব্যাহত থাকলে ২০২৫ সালে সংখ্যায় তারা খৃষ্টানদের ছাড়িয়ে যাবে।

  • § ৩। কুরআন বলছে:

রোমকরা পরাজিত হয়েছে-নিকটবর্তী অঞ্চলে; কিন্তু তারা তাদের এ পরাজয়ের পর শীঘ্রই বিজয়ী হবে, কয়েক বছরের মধ্যেই, অগ্র ও পশ্চাতের সিদ্ধান্ত আল্লাহরই। সেদিন বিশ্বাসীরা হর্ষোৎফুল্ল হবে; আল্লাহর সাহায্যে। তিনি যাকে ইচ্ছা সাহায্য করেন এবং তিনি পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু। এ আল্লাহরই প্রতিশ্রুতি; আল্লাহ তাঁর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন না, কিন্তু অধিকাংশ লোক বোঝে না। তারা জীবনের বাহ্য দিক সম্বন্ধে অবগত, পারলৌকিক জীবন সম্বন্ধে তারা অনবধান। (সূরা আর-রূম, ৩০:১-৭)

পূর্ব রোমান বা বাইজানটাইন সাম্রাজ্য পারস্যের হাতে বিরাট পরাজয় বরণ করেছিল যারা ৬১৪ খৃষ্টাব্দে জেরুজালেম দখল করে নিয়েছিল, এবং এরপর মিশর ও সিরিয়ার পতন ঘটে, এবং কনস্টান্টিনোপল অবরুদ্ধ হয়-(নিকটবর্তী অঞ্চলে)। মুশরিক আরবরা এতে উল্লসিত হয়, কারণ এটি ছিল আহলে কিতাবদের উপর মূর্তিপূজারীদের বিজয়। যখন এই আয়াত নাযিল হয়, তখন এটা ধারণাতীত ছিল যে রোমানরা আবার উঠে দাঁড়াতে পারবে। “কয়েক বছর” শব্দটি “বিদ’আ” শব্দের অনুবাদ, যার আসল অর্থ তিন থেকে নয় বছর। একজন মুশরিক উবাই, আবু বকরের সাথে একশত উটের বাজী ধরেছিল যে এটা কখনো ঘটবে না। ৬২৩ খৃষ্টাব্দে বাইজানটাইন রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াস বিভিন্ন যুদ্ধ ক্ষেত্রে পারস্যবাসীদের ধ্বংস করেছিলেন। উবাই নিহত হয়েছিল যুদ্ধে ও তার আত্মীয়রা বাজীর শর্ত পূরণ করেছিল। একই সময়ে মুসলিমরাও মুশরিকদের উপর বিজয়ী হয়ে আনন্দ করেছিল যেমন কুরআনে বলা হয়েছে।

  • § ৪। দুটি সহীহ হাদীস গ্রন্থে বর্ণিত একটি দীর্ঘ বর্ণনা পাওয়া যায়, যেখানে নবী (সঃ) একটি বাগানে বসেছিলেন। উসমান ইবনে আফফান সেখনে এলেন এবং নবী (সঃ) আবু মূসা আশ’আরী (বর্ণনাকারী) কে বললেন উসমানকে জান্নাতের সুসংবাদ দিতে, এবং এটা জানাতে যে লোকে তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে। এই ভবিষ্যদ্বাণী সফল হয়েছিল, উসমান মুসলিমদের নেতা হয়েছিলেন, এবং কিছুসংখ্যক বিদ্রোহী তাঁকে হত্যা করেছিল।
  • § ৫। আলী ইবনে আবি তালিব, চতুর্থ খলীফা নবী (সঃ) কর্তৃক তাঁর হত্যার পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য জানতে পেরেছিলেন, এমনকি যে তাঁকে হত্যা করার কথা, তাকেও তিনি চিনতেন, লোকদের তিনি সনাক্ত করেও দেখিয়েছিলেন। সবাই যখন জানতে চাইল কেন তিনি লোকটিকে হত্যা করছেন না, তখন তিনি উত্তর দিয়েছিলেন: “তাহলে কে আমাকে হত্যা করবে?” হত্যার পূর্ব রাত্রে, আলী বেরিয়ে এসে আকাশের দিকে তাকালেন এবং বললেন: “আল্লাহর শপথ, তিনি কখনো মিথ্যা বলেননি বা তাঁর সম্পর্কে কোন মিথ্যা বলা হয়নি।” পরদিন সেই লোকই আলীকে হত্যা করে, এবং তাঁর রক্ত ছিটকে গিয়ে তাঁর দাড়িতে লাগে, যেমনটি নবী বলেছিলেন।
  • § ৬। যখন মুসলিমরা খায়বারে ইহুদীদের সাথে যুদ্ধ করছিলেন, কয়েকদিনের দুর্গ অবরোধের পর নবী (সঃ) বললেন যে পরদিন তিনি এমন একজনকে নেতৃত্বের পতাকা দেবেন যাঁকে আল্লাহ বিজয় দান করবেন। তিনি আলীকে পতাকা দেন এবং আলীর নেতৃত্বে সেদিনই দুর্গের পতন ঘটে।
  • § ৭। একদিন নবী (সঃ) আলী ও যুবাইরকে একসাথে হাসতে দেখে জানতে চাইলেন আলী কি যুবাইরকে ভালবাসেন? আলী উত্তর দিলেন: “আমি কিভাবে তাকে ভালবাসব না যখন সে আমার ভাতিজা/ভাগ্নে ও একই ধর্মের?” নবী (সঃ) যুবাইরকে একই প্রশ্ন করলেন ও অনুরূপ উত্তর পেলেন। নবী (সঃ) তখন যুবাইরকে বললেন, সে আলীর সাথে অন্যায়ভাবে যুদ্ধ করবে। জামালের যুদ্ধে, যুদ্ধক্ষেত্রে যখন আলী ও যুবাইর মুখোমুখি হলেন, আলী যুবাইরকে এই ঘটনাটি স্মরণ করিয়ে দিলেন। যুবাইরের মনে পড়ল, তিনি বললেন যে তিনি ভুলে গিয়েছিলেন এবং তিনি যুদ্ধ ক্ষেত্র ত্যাগ করলেন, কারণ আলী ন্যায়তঃ খলীফা, তাঁকে যুদ্ধের মাধ্যমে বিরোধিতা করা অন্যায়।
  • § ৮। নবী (সঃ) বলেছেন: “খিলাফত তিরিশ বছর স্থায়ী হবে, তারপর আসবে রক্তক্ষয়ী রাজতন্ত্র।” তাই ঘটেছিল। আবু বকর দুই, উমর দশ, উসমান বার, আলী আড়াই এবং হাসান সাড়ে তিন-মোট ত্রিশ বছর। এরপর মন্দ বিস্তৃত হয় ও রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • § ৯। নবী (সঃ) মিশর দখলের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন এবং তাদের সাথে সাহাবাদের ভাল ব্যবহার করতে বলেছিলেন। এবং বলেছিলেন তারা পারস্য সম্রাট খসরুর ধনভাণ্ডার লাভ করবে, এবং সুরাকা ইবনে মালিক সিজারের ব্রেসলেট হাতে পরবে। তাই হলো এবং উমরের কাছে যখন সিজারের ব্রেসলেট এলো, তিনি সুরাকাকে ডেকে রাসূলের প্রতিশ্রুতি ভবিষ্যদ্বাণী স্মরণ করিয়ে দিয়ে সেই ব্রেসলেট পরিয়ে দিলেন।
  • § ১০। সহীহ বুখারীর একটি হাদীসে আউফ বিন মালিককে বলা হয়েছে কিয়ামতের পূর্বে ছয়টি লক্ষণের কথা: “প্রথম, আমার মৃত্যু; দ্বিতীয়, জেরুজালেম বিজয়; তৃতীয়, তাদের মধ্যে একটি মহামারী; চতুর্থ, ধনসম্পদের প্রাচুর্য যখন কাউকে একশ দীনার দিলেও সে তাতে খুশী হবে না; পঞ্চম, একটি বিপদ যা সমস্ত আরব পরিবারকে ব্যতিক্রম ছাড়াই গ্রাস করবে; ষষ্ঠ, খৃষ্টানদের সাথে চুক্তি, যা খৃষ্টানরা ভঙ্গ করবে ইত্যাদি… (এই শেষটি এখনও পূর্ণ হয়নি)। জেরুজালেম জয় করা হয়েছে, ১৬ হিজরীতে আমওয়াসে মড়ক শুরু হয় এবং সত্তর হাজার মারা যায়, সম্পদের প্রাচুর্য দেখা দেয়, বিশেষতঃ উসমানের খিলাফতের সময় এবং পরে খলীফা ওমর বিন আবদুল আযীয় এর সময়, যখন যাকাত নেবার লোক পাওয়া যেত না। তারপর উসমানের সময়কার বিদ্রোহ ও হত্যা পরবর্তী পরিসিস্থিতিতে যাতে সব আরব পরিবারই কোন না কোনভাবে জড়িত ছিল।
  • § ১১। নবী (সঃ) উল্লেখ করেছেন যে মুসলিমরা রোম ও কনস্টান্টিনোপল জয় করবে। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আগে হিরাক্লিয়াসের শহর জয় করবে অর্থাৎ কনস্টান্টিনোপল। পঞ্চদশ শতকে তা হয়েছে। রোম বিজয় পূর্ণ হওয়া বাকী আছে। নবী (সঃ) এই বক্তব্যগুলির ব্যাপারে যা লক্ষণীয় তা হচ্ছে এগুলি এমন এক সময় করা হয়েছিল যখন এটা কল্পনারও বাইরে ছিল যে মদীনার মত একটি ক্ষুদ্র নগর-রাষ্ট্র, যা সবদিকে মুশরিক আরবদের দ্বারা পরিবেষ্টিত, তারা শক্তি ও ক্ষমতার এমন চূড়ান্ত পর্যায়ে কখনো পৌঁছাবে। তাছাড়াও এই ভবিষ্যদ্বাণীগুলিতে পরিষ্কার ভাষায়, সুনির্দিষ্ট নাম ও তারিখ ও সঠিকভাবে নির্দেশ করা হয়েছে, বাইবেল বা নষ্ট্রাডামুসের মত অস্বচ্ছ, অনির্দ্দেশ্যভাবে নয়।
  • § ১২। নবী (সঃ) মুসলিমদের ভিতরে বিভক্তির কথা ও বিভিন্ন দলের বৈশিষ্ট্যের কথাও উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন কিছু লোক আলীর প্রতি তাই করবে যা খৃষ্টানরা যীশুর প্রতি করেছে। এটা পরিষ্কারভাবে শিয়াদের নির্দেশ করছে যারা আলীকে প্রশংসা ও ভালবাসার বাড়াবাড়ি করে এবং তাদের মধ্যে নুসারিয়া উপদল আলীকে আল্লাহর প্রকাশ হিসাবে ইবাদত করে। তিনি একদলের কথা বলেছেন যারা “কদর” বা ভাগ্যকে অস্বীকার করবে, তিনি তাদেরকে উম্মাহর অগ্নি উপাসক বলেছেন এবং তাই হয়েছে। তিনি আরও বলেছেন যে কেউ কেউ কুরআনকে সৃষ্ট বস্তু বলবে, কেউ কুরআনের বাইরে অন্য কিছুকে অর্থাৎ সুন্নাহকে অস্বীকার করবে-এসবই সত্য হয়েছে। তিনি আরো বলেছেন যে একদল কুরআনের আয়াত ব্যবহার করে বিশ্বাসীদের অবিশ্বাসী হিসাবে ঘোষণা করবে এবং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে এবং তাদেরকে হত্যা করতে হবে। খারেজীরা ছিল এ ধরনের দল যারা আলী ও মুয়াবিয়াকে অবিশ্বাসী ঘোষণা করেছিল এবং যারা তা বিশ্বাস করবে না, তারাও অবিশ্বাসী হবে বলে ঘোষণা করেছিল, এবং তারা মুসলিমদের হত্যা করতো, এবং তারা ছিল তামীম গোত্রের, যেমন নবী বলেছিলেন।
  • § ১৩। নবী (সঃ) বলেছিলেন যে কিয়ামতের পূর্বসতর্কীকরণ হিসাবে কিছু লক্ষণ দেখা যাবে। সেগুলির মধ্যে যা সত্য হয়েছে তা হচ্ছে:
    • § ক) নগ্নপদ বেদুইনরা উচ্চ প্রাসাদ তৈরীর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে। বর্তমানে আরব উপদ্বীপের এককালের দরিদ্র মেষপালকের বংশধররা ভবন নির্মাণে আধুনিক বিশ্বের সাথে পাল্লা দিচ্ছে।
    • § খ) মসজিদগুলি প্রাসাদের মত হবে। বর্তমানে বিভিন্ন মসজিদে কারুকার্য, মার্বেল মোড়া মেঝে, দামী কার্পেট, ঝাড়বাতি ইত্যাদি দেখা যায়, অথচ নবী (সঃ) আল্লাহর ঘর সাজসজ্জাহীন রাখতে বলেছেন।
    • § গ) বিশ্বস্ততা উঠে যাবে মানুষের অন্তর থেকে এমনভাবে যে একজন বলবে, “আমি অমুক শহরের একজন বিশ্বস্ত লোককে জানি।”
    • § ঙ) হত্যা বেড়ে যাবে এমনভাবে যে, যে হত্যাকারী সে জানবে না যে সে কেন হত্যা করেছে আর যে নিহত সেও জানবে না যে সে কেন নিহত হয়েছে।
    • § চ) সুদের ব্যবহার এমনভাবে বৃদ্ধি পাবে যে কেউই এর হাত থেকে বাঁচতে পারবে না।
    • § ছ) মুসলিমদের শত্রুরা তাদের ভূমি ও সম্পদ নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেবে, মুসলিমরা জিহাদ ছেড়ে দেবে, এবং কেবল দুনিয়াবী ব্যাপার নিয়ে মত্ত থাকবে।
    • § জ) শিক্ষার হার বাড়বে।
    • § ঝ) আলেমদের তিরোধানের সাথে সাথে ধর্মীয় জ্ঞানও লোপ পাবে।
    • § ঞ) বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার বাড়বে, এবং মুসলিমরা তা হালাল করবে যদিও নবী (সঃ) তা হারাম করেছেন।
    • § ট) যৌন স্বেচ্ছাচারিতা বাড়বে, এবং এর পরিণতিতে এমন সব নতুন রোগ দেখা দেবে যা আগে শোনা যায়নি। যেমন, এইডস ইত্যাদি।
    • § ঠ) দাজ্জালের আবির্ভাব, প্রত্যেকেই নবুওয়াতের দাবী করা, অথচ মুহাম্মাদ (সঃ)-ই শেষ রাসূল। মুসাইলামা থেকে শুরু করে এলিজা মোহাম্মদ (নেশন অফ ইসলাম এর প্রতিষ্ঠাতা) এবং ভারতের গোলাম আহমদ কাদিয়ানী পর্যন্ত সবাই এর অন্তর্ভুক্ত।
    • § ড) কাপড় পরেও মহিলারা উলঙ্গ থাকবে।
    • § ঢ) মদ্যপান সাধারণ হয়ে যাবে এবং মুসলিমরা অন্য নামে একে হালাল করবে।
    • § ণ) মসজিদে শোরগোল হবে।
    • § ত) নিকৃষ্ট ও মূর্খ লোকেরা নেতা হবে ও জুলুম করবে।
    • § থ) একজন তার স্ত্রীর আনুগত্য করবে ও মাতার অবাধ্য হবে, এবং তার বন্ধুদের সাথে উত্তম আচরণ করবে এবং পিতাকে ঘৃণা করবে।
    • § দ) পুরুষেরা রেশম ও স্বর্ণ পরিধান করবে, এবং তা বৈধ করবে যদিও নবী (সঃ) তা তাঁর উম্মার পুরুষদের জন্য তা অবৈধ করেছেন।
    • § ধ) মানুষ দুনিয়ার স্বার্থে দ্বীনকে ত্যাগ করবে, এবং দ্বীনের উপর দৃঢ় থাকা দুই হাতে জ্বলন্ত কয়লা ধরে রাখার সমান হবে।

এগুলো মুহাম্মাদ (সঃ) এর অসংখ্য ভবিষ্যদ্বাণীর কয়েকটি, যেগুলি স্পষ্টভাবে সত্য হয়েছে এবং কিছু সংখ্যক বর্তমানে আমাদের যুগে সত্য হিসাবে দেখা দিয়েছে যা তাঁর দাবীকে শক্তিশালী করেছে।

কুরআন অতীতের সম্পর্কেও সঠিক জ্ঞান দান করে। এগুলি এমন তথ্য যা মুহাম্মাদ (সঃ) আল্লাহর কাছ থেকে ছাড়া পেতে পারতেন না। কিছু উদাহরণ নীচে দেওয়া হলো:

  • § ১। কুরআনে নূহের নৌকার উল্লেখ আছে:

নৌকাটি যুদী পর্বতের উপর স্থির হল (সূরা হুদ, ১১:৪৪)

সামপ্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় যুদী পর্বতের উপর নূহের নৌকার একই আয়তনের একটি নৌকা আকৃতির বস্তু আবিষ্কৃত হয়েছে। বাইবেল দাবী করছে যে নৌকাটি আরারাত পর্বতমালা থেকে বিশ মাইল দূরে এসে স্থির হয়েছিল। এটা সম্ভব নয়, কারণ এই পাহাড়গুলির ভূতাত্ত্বিক গঠন সমপ্রতি সম্পূর্ণ হয়েছে এবং নূহের সময় তার অস্তিত্বই ছিল না। কুরআনেও এই বন্যাকে একটি স্থানীয় ঘটনা হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা শুধু নূহের জাতিকে ধ্বংস করেছিল। বাইবেল বন্যার যে সময় ও তারিখ দিয়েছে এবং এটি একটি বিশ্বব্যাপী দুর্যোগ বলে যে দাবী করেছে, তা সমস্ত প্রত্নতাত্ত্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণ দিয়ে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।

  • § ২। কুরআন ইউসুফের কালে মিশরের শাসককে রাজা হিসাবে উল্লেখ করেছে, আর মূসা শাসককে ফারাওহিসাবে উল্লেখ করেছেন। এটা সামান্য হলেও সঠিকত্বের দিক দিয়ে জোরালো, কারণ ইউসুফের সময় শাসকরা হাইকোস বংশের এবং সেমেটিক ছিল। তারা নিজেদের ফারাও বলত না। মূসার সময়ে হাইকোসদের জায়গায় যে স্থানীয় মিশরীয় রাজবংশ রাজত্ব করত, তারা এই শব্দ ব্যবহার করত। বাইবেল উভয় ক্ষেত্রেই ফারাও সম্বোধন করে অশুদ্ধ প্রমাণিত হয়েছে। কুরআনে প্রাচীন মিশরীয় ধর্মের নানা দিকও সঠিকভাবে বর্ণিত হয়েছে, বিশেষতঃ ফারাও কে খোদা হিসাবে এবাদত করা।
  • § ৩। কুরআন যীশুর আদি অনুসারীদের “নাজারেন” বলে উল্লেখ করেছে যা ঐতিহাসিকভাবে সঠিক। যীশুর পরে রোমানরা তাদেরকে “খৃষ্টান” ডাকনামে ডাকত-এ্যাক্টস ১১:২৬ “এন্টিয়োকে প্রথম শিষ্যদের খৃষ্টান ডাকা হয়।”
  • § ৪। কুরআনে ইরাম নামে এক শহরের উল্লেখ আছে যা আল্লাহ তার অধিবাসীদের পাপের জন্য ধ্বংস করেছিলেন। সামপ্রতিক কাল পর্যন্ত এই শহরের কোন চিহ্ন পাওয়া যায়নি এবং এটাকে উপকথা হিসাবেই ধরে নেওয়া হয়েছিল। ১৯৭৩ সালে উত্তর-পশ্চিম সিরিয়াতে, ৪৩০০ বছর পুরানো এবলা শহরটি খনন করা হয়। মাটির ফলকে উৎকীর্ণ কিউনিফর্ম লিপিতে যেসব নগরের সাথে এবলার ব্যবসা বাণিজ্য ছিল, তাদের নাম পাওয়া যায়। এদের মাঝে ইরামের উল্লেখ পাওয়া যায়। এসব তথ্য মুহাম্মাদ কোথায় ও কিভাবে পেলেন? বাইবেলে পেয়ে থাকলে তিনি তার ভুলগুলি কিভাবে শুদ্ধ করলেন?

*************************

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s