আল-কুরআনের হক


আল-কুরআনের হক

হাবীবুল্লাহ মুহাম্মাদ ইকবাল

সম্পাদনাঃ আবু বকর যাকারিয়া

কুরআনুল কারীম বিশ্ব মানবতার জন্য এক অফুরন্ত নিয়ামাত। আল্লাহ তা‘আলার বড়ই মেহেরবানী যে, তিনি আমাদের উপর কুরআন অবতীর্ণ করেছেন। কুরআনে বলা হয়েছে

‘বড়ই মেহেরবান তিনি (আল্লাহ) কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন’ -[সূরা আর-রহমান : ১-২]।

কুরআন এমন একটি কিতাব যার মাধ্যমে আরবের সেই বর্বর জাতি সৌভাগ্যবান জাতিতে পরিণত হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআন দিয়েই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ তৈরি করেছিলেন। তিনি বলেছেন,

‘বিশ্বমানবমন্ডলীর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হলো আমার যুগ’ -[সহীহ বুখারী : ২৬৫২]।

কুরআন মাজীদের বেশ কিছু হক রয়েছে যেগুলো আদায় করা আবশ্যক। এর অনেকগুলো হক এমন যে, কেউ যদি তা আদায় না করে কিয়ামাতের দিন নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বিরুদ্ধে আল্লাহর দরবারে অভিযোগ করবেন। কুরআনে বলা হয়েছে,

‘আর রাসূল বলবেন (কিয়ামাতে), ‘‘হে আমার রব, নিশ্চয় আমার জাতি এ কুরআনকে পরিত্যাজ্য গণ্য করেছে’’ -[সূরা আল-ফুরকান : ৩০]।

আমাদের উপর কুরআনের যে হকগুলো রয়েছে তা এখানে আলোচনা করা হলো :

ঈমান আনা

কুরআনের হকসমূহের মধ্যে প্রধানতম হক বা অধিকার হলো কুরআনের প্রতি ঈমান আনা। কুরআনের প্রতি ঈমান আনার অর্থ হলো : কুরআন আল্লাহর কালাম, ইহা আসমানী শেষ কিতাব এবং এই কিতাবের মধ্য দিয়ে সকল আসমানী কিতাব রহিত হয়ে গিয়েছে। কুরআন বিশ্ব মানবমন্ডলীর জন্য হিদায়াত এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে নূর বা আলো। কুরআনে এসেছে,

‘অতএব তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের এবং আমি যে নূর অবতীর্ণ করেছি তার প্রতি ঈমান আন। আর তোমরা যে আমল করছ আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবহিত’ -[সূরা আত-তাগাবুন : ০৮]।

‘তোমরা কি কিতাবের কিছু অংশে ঈমান রাখ আর কিছু অংশ অস্বীকার কর, সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা তা করে দুনিয়ার জীবনে লাঞ্চনা ছাড়া তাদের কী প্রতিদান হতে পারে! আর কিয়ামাতের দিন তাদেরকে কঠিনতম আযাবে নিক্ষেপ করা হবে। আর তোমরা যা কর, আর আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন’ -[সূরা আল-বাকারাহ : ৮৫]।

Continue reading

মদ ও মাদক দ্রব্য প্রভৃতি সম্পর্কে ফতওয়া


বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের জন্য। শেষ ফলাফল মুত্তাকীদের জন্য নির্ধারিত এবং একমাত্র যালিমদের ক্ষেত্রেই শত্রুতা। দরূদ ও সালাম অবতীর্ণ হোক নবী ও রাসূলদের সর্ব শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব তথা আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর।

(ক) মদপান কারীর ইবাদত:

প্রশ্নঃ যে ব্যক্তি সদাসর্বদা মদ্যপান করে, যেনা করে এবং নামায এবং ইসলামের অন্যান্য রুকন সমূহও আদায় করে। কিন্ত সে তার উক্ত অপকর্ম থেকে বিরত হয়না। এর ইবাদত কি ছহীহ হবে?

উত্তরঃ যে ব্যক্তি হালাল মনে করে মদ্যপান করে বা যেনা ব্যভিচার কিংবা যে কোন পাপ সম্পাদন করে তবে সে কাফির বলে গণ্য। আর কুফরীর সাথে কোন আমলই বিশুদ্ধ হবেনা। তবে যদি কেউ পাপের কাজ সম্পাদন করে ওটাকে হারাম জ্ঞান করার পরেও প্রবৃত্তির তাড়নায় এবং এ আশা করে যে আল্লাহ তাকে তা থেকে রক্ষা করবেন। তবে এই ব্যক্তিটি তার ঈমানের কারণে মুমিন এবং পাপের কারণে ফাসেক।

প্রত্যেক পাপী বান্দার উপর ওয়াজিব হল আল্লাহর নিকট তাওবাহ করা, তার কাছে প্রত্যাবর্তন করা। গুনাহের স্বীকারোক্তি দেয়া, উক্ত পাপ পূণরায় না করার প্রতি দৃঢ় প্রত্যয় গ্রহণ করা এবং কৃতপাপের উপর লজ্জিত হওয়া। আল্লাহর দ্বীন নিয়ে সে খেলা করবেনা, এবং আল্লাহ তার পাপ গোপন করে রেখেছেন এবং ঢিল দিয়ে রেখেছেন একারণ সে ধোকাগ্রস্থ হবেনা। কারণ মহান আল্লাহ শুধুমাত্র একটি পাপের কারণে ইবলীসকে তার রহমত থেকে বের করেছেন এবং চিরতরের জন্য বিতাড়িত করেছেন। আল্লাহ তাকে আদমকে সিজদা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন কিন্ত সে তা থেকে বিরত থেকে ছিল। আদম (আঃ)কে আল্লাহ জান্নাত থেকে দুনিয়ায় অবতীর্ণ করেছিলেন মাত্র একটি অপরাধের কারণে (তাহলঃ নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল খাওয়া)। কিন্ত আদম (আঃ) তাওবাহ করেছিলেন এবং আল্লাহও তার তাওবাহ গ্রহণ করেছিলেন ও তাকে সঠিক পথে পরিচালনা করেছেন। অতএব, কোন বান্দাহর জন্য তার প্রতিপালকের সাথে প্রতারনার পন্থাবলম্বন করা উচিত নয়; বরং তার উপর ওয়াজিব হলঃ আল্লাহকে ভয় করা তাঁর আদেশ বাস্তবায়ন করা এবং নিষেধ থেকে বিরত থাকা।- ফাৎওয়া দানের স্থায়ী কমিটি (ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ ৩/৩৭৮)

Continue reading

কেন এত ভূমিকম্প হয়? এবং এ থেকে পরিত্রাণের উপায়


লিখেছেনঃ আবদ্ আল-আযীয ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে বাজ (রহিমাহুল্লাহ)
(সাবেক প্রধান মুফতি, সৌদি আরব)

কয়েকদিন পরপরই মৃদু কম্পনে সারা দেশ কম্পিত হয়ে উঠছে, এগুলো বড় একটা কম্পন আসার আগে সতর্ককারী কম্পন। মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাহদের সতর্ক করেন যাতে করে তারা অনুতপ্ত হয় এবং আল্লাহর পথে ফিরে আসে। চলুন দেখি কুরআন ও সহীহ হাদীস অনুযায়ী ভূমিকম্পের কারণ অনুসন্ধান এবং এ থেকে কিভাবে আমরা বাঁচতে পারি তার উপায় বের করি।

কেন এত ভূমিকম্প সংগঠিত হয়? এবং এ থেকে পরিত্রাণের উপায় :

সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য, এবং শান্তি বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসূলের, তাঁর পরিবারের উপর, তাঁর সাহাবাদের উপর এবং তাদের উপর যারা তাদের অনুসরণ করেন।

মহান আল্লাহ সর্বজ্ঞানী, তাঁর ইচ্ছা এবং তিনি যা কিছু প্রেরণ করবেন সে সকল বিষয়ে তিনিই সবকিছু জানেন এবং তিনি সর্বাধিক জ্ঞানী এবং সর্বাধিক অবহিত তাঁর আইন কানুন ও আদেশ সম্পর্কে। মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাহদেরকে সতর্ক করার জন্য বিভিন্ন প্রকারের নিদর্শন সৃষ্টি করেন এবং বান্দাহর উপর প্রেরণ করেন যাতে করে তারা মহান আল্লাহ কর্তৃক তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন ও ভীত হয়। বান্দাহরা মহান আল্লাহর সাথে যা শিরক করে (অর্থাৎ, ইবাদত করার ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর সাথে অংশিদারিত্ব করে) এবং তিনি যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকার জন্য তিনি এই নিদর্শন সমূহ প্রেরণ করেন যাতে করে তারা তাদের ভুল বুঝতে পারে, তাদের বোধদয় হয় এবং তাদের রবের দিকেই একনিষ্ঠভাবে ইবাদত করে।

মহান আল্লাহ বলেন:


“(আসলে) আমি ভয় দেখানোর জন্যই (তাদের কাছে আযাবের) নিদর্শনসমূহ পাঠাই” ( সূরা ইসরা ১৭:৫৯)

Continue reading

হজ্জের ক্ষেত্রে প্রচলিত কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি


মূল : ড. ছালেহ বিন ফাওযান আল-ফাওযান*
অনুবাদ : মুহাম্মাদ ইমদাদুল্লাহ**

মহান আল্লাহর প্রশংসা ও রাসূলের উপর ছালাত ও সালাম পেশের পর বক্তব্য এই যে, যেহেতু হজ্জ পালন করা ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম, তাই রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাঁর কথা, কাজ ও তাক্বরীর বা অনুমোদনের মাধ্যমে এর বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। আর ছাহাবীগণ (রাঃ) তাঁর অনুসরণ করার জন্য তাঁকে পর্যবেক্ষণ করতেন। কেননা তিনি বলেছেন, ‘তোমরা আমার নিকট থেকে তোমাদের হজ্জের নিয়ম-পদ্ধতি শিক্ষা করে নাও’।
এই নির্দেশের ফলে ছাহাবীগণ তাঁর নিকট থেকে হজ্জের বিধি-বিধান শিখে তা আমাদের নিকট পরিপূর্ণরূপে বর্ণনা করেছেন। এরূপ সুস্পষ্ট ও পরিপূর্ণ বিবরণ থাকা সত্তেবও কতিপয় লোক ফযীলত অর্জনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি অথবা কোন বিদ‘আত বা পাপে পতিত হওয়ার মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) প্রদর্শিত পন্থা বিরোধী কার্যকলাপের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। এর অন্যতম কারণ হ’ল অজ্ঞতা, বিবেক-বুদ্ধি নির্ভর সিদ্ধান্ত ও অনির্ভরযোগ্য আলেমের অনুসরণ। এরূপ কতিপয় বিষয় যেগুলোতে অনেক হাজী ছাহেবই পতিত হয়ে থাকেন, তার কিছু বিবরণ নিম্নে প্রদত্ত হ’ল।-
ইহরামের ক্ষেত্রে ত্রুটি-বিচ্যুতি :
১। আকাশপথে আগমনকারী কোন কোন হাজী জেদ্দা বিমানবনদরে পৌঁছার পর সেখান থেকে বা মক্কার আরো নিকটবর্তী হয়ে ইহরাম বাঁধেন। অথচ রাস্তায় তার মীক্বাত পূর্বেই অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, هُنَّ لَهُنَّ وَلِمَنْ أَتَى عَلَيْهِنَّ مِنْ غَيْرِ أَهْلِهِنَّ. ‘যারা এইসব মীক্বাত এলাকার অধিবাসী অথবা যারা এগুলি অতিক্রম করেন, তারা হজ্জ বা ওমরার জন্য এসব স্থান থেকে ইহরাম বাঁধবেন। কিন্তু যারা এসব মীক্বাত-এর অভ্যন্তরীণ অঞ্চলে বসবাস করেন, তারা স্ব স্ব অবস্থান থেকে ইহরাম বাঁধবেন।২ সুতরাং যে ব্যক্তি হজ্জ ও ওমরা করতে ইচ্ছুক তাকে ঐ মীক্বাত থেকে ইহরাম বাঁধতে হবে যেটি সে অতিক্রম করবে অথবা বিমান ও স্থলপথে তার সামনাসামনি হবে। যদি সে তা অতিক্রম করে এবং অন্য জায়গায় গিয়ে ইহরাম বাঁধে তাহ’লে সে হজ্জের একটি ওয়াজিব পরিত্যাগ করার কারণে ‘দম’ বা একটি বকরী কুরবানী দিতে হবে। হজ্জের ওয়াজিব সমূহের মধ্যে একটি ওয়াজিব ছেড়ে দেওয়ার কারণে ‘দম’ বা কুরবানী করা ওয়াজিব হবে। আর জেদ্দা তার অধিবাসী ব্যতীত অন্যদের জন্য মীক্বাত নয়।
২। অনেক হাজী মনে করেন ইহরাম বাঁধার সময় তার নিকট যে সকল সামগ্রী (জুতা, কাপড়, টাকা-পয়সা প্রভৃতি) থাকবে, ইহরাম অবস্থায় সে শুধুমাত্র সেগুলোই ব্যবহার করতে পারবে। পরবর্তীতে সংগৃহীত বা ক্রয়কৃত সামগ্রী ব্যবহার করতে পারবে না। এটা বড় ভুল ও নিরেট মূর্খতা। বরং তিনি ইহরামের সময় যে জিনিসগুলো তার নিকট ছিল না সেগুলো ব্যবহার করতে পারবে, প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে পারবে ও ব্যবহার করতে পারবে এবং পরিধানকৃত ইহরামের পোষাকের অনুরূপ পোষাক এবং পরিধেয় জুতা পরিবর্তন করতে পারবে। তবে মুহরিম ব্যক্তিকে অবশ্যই ‘নিষিদ্ধ কার্যাবলী’ থেকে বিরত থাকতে হবে।
৩। অনেক পুরুষ ইহরাম বাঁধার সময় ইযতেবার মত কাঁধ খোলা রাখেন। এটা ঠিক নয়। বরং ইযতেবা (কাঁধ খোলা রাখা) শুধু তাওয়াফের (তাওয়াফে কুদূম বা তাওয়াফে ওমরা) এর সাথে সংশ্লিষ্ট। অন্য সকল সময়ে কাঁধ চাদর দ্বারা ঢাকা থাকবে।
৪। অনেক মহিলা মনে করেন তাদের ইহরামের জন্য নির্দিষ্ট রঙের কাপড় রয়েছে। যেমন সবুজ। এটা ভুল ধারণা। কেননা তাদের জন্য নির্দিষ্ট কোন রংয়ের পোষাক ইহরামের জন্য নির্ধারিত নেই, বরং তারা স্বাভাবিক যে কোন কাপড়ে ইহরাম বাঁধতে পারবেন। তবে সৌন্দর্য্যমন্ডিত, আটসাঁট অথবা পাতলা কাপড় পরিধান করা ইহরাম বা অন্য কোন অবস্থাতেও জায়েয নয়।

Continue reading