জামাআতে সালাতের গুরুত্ব ; প্রেক্ষিত বর্তমান সমাজ


জামাআতের গুরুত্ব, পরিপ্রেক্ষিত বর্তমান সমাজ

আল্লাহ তাআলা সালাতের মর্যাদা সমুন্নত করেছেন। পবিত্র কুরআনের বহু জয়গায়  সালাত আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন । সালাতের প্রতি যত্নবান ও  জামাআতভুক্ত হয়ে  সালাত আদায়ের আদেশ করেছেন। সালাতকে  গুরুত্বপূর্ন ইবাদত হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন ও আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশ হিসাবে সাব্যস্ত করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:—

وأقيموا الصلاة وآتوا الزكاة واركعوا مع الراكعين – سورة البقرة :43

আর সালাত কায়েম কর, যাকাত প্রদান কর এবং সালাতে রুকুকারীদের সাথে রুকু কর। (বাকারা-৪৩) আর এর প্রতি অবমাননা এবং তা আদায়ে অলসতা মুনাফিকের আলামত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ইরশাদ হচ্ছে :—

إن المنافقين يخادعون الله وهو خادعهم وإذا قاموا إلى الصلاة قاموا كسالى – سورة النساء :142

মুনাফিকরা অবশ্যই প্রতারণা করছে আল্লাহর সাথে অথচ তারা প্রকারান্তরে নিজেদেরই প্রতারিত করছে । বস্তুতঃ তারা যখন সালাতে দাড়ায় তারা  দাড়ায় একান্ত শিথিলভাবে।   (সূরা নিসা-১৪২) অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে :—

ولايأتون الصلاة إلا وهم كسالى . سورة التوبة: 54

তারা সালাতে আসে আলস্যভরে (সূরা তওবা : ৫৪)

Continue reading

ইসলামে সালাতের গুরুত্ব


লেখক: জাকিরুল্লাহ আবুল খায়ের
تأليف: ذاكر الله أبو الخير
সম্পাদনা : আব্দুল্লাহ শহীদ আব্দুর রহমান
مراجعة: عبد الله شهيد عبد الرحمن

ইসলাম প্রচার ব্যুরো, রাবওয়াহ রিয়াদ
المكتب التعاوني للدعوة وتوعية الجاليات بالربوة بمدينة الرياض

1429 – 2008
*************


সালাতের গুরুত্ব:
*********
আল্লাহ মানুষকে তার এবাদতের জন্যেই সৃষ্টি করেছেন। শুধু মানুষ নয় ; মানুষ ও জ্বীন-উভয় জাতিকে আল্লাহ তার এবাদত তথা তার দাসত্বের জন্য সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ বলেন-
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ (الذاريات :56)
অর্থাৎ আমি মানব ও জ্বীন জাতিকে একমাত্র আমার এবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি।
ফলে তিনি মানুষের জন্য কিছু দৈহিক, আত্মিক ও আর্থিক এবাদতের প্রচলন করেছেন।
দৈহিক এবাদতের মাঝে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ও মহান এবাদত হল সালাত। সালাত এমন একটি এবাদত যাকে আল্লাহ তার মাঝে এবং তার বান্দার মাঝে সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যম সাব্যস্ত করেছেন।
সালাতের মাধ্যমে একজন মানুষ আল্লাহর সাথে দেয়া প্রতিশ্রুতির বার বার প্রতিফলন ঘটায়। সে তার প্রভু বা স্রষ্টাকে বুঝাতে সক্ষম হয় যে, সে তার প্রতিশ্রুতি পালন করে যাচ্ছে। এ সালাতের মাধ্যমেই মানুষ আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে। আল্লাহর সাথে মানুষের সম্পর্কের বন্ধন সুদৃঢ় ও মজবুত হয়। ইহকাল ও পরকালের মুক্তির পথ কংটকমুক্ত হয়। সালাত ব্যক্তি, পরিবার, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে শান্তি, শৃঙ্খলা, ভ্রাতৃত্ব ও মমতাবোধ ফিরিয়ে আনে। গড়ে উঠে সামাজিক ঐক্য। সালাতের মাধ্যমে ছগীরা তথা ছোট ছোট গুনাহগুলো হতে পরিত্রাণ লাভ করে এবং দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ লাভ হয়।

Continue reading

মৃত ব্যক্তির নিকট সওয়াব পৌঁছান


প্রশ্ন :

সূরা ইখলাস পাঠ করে কেউ যদি মৃত ব্যক্তিকে ঈসালে সাওয়াব করে, তাহলে মৃত ব্যক্তি কি উপকৃত হবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কি করতেন, কবরবাসীর জন্য তিনি কি তিলাওয়াত করতেন, না শুধু দোয়া করতেন?

উত্তর :
প্রথমত : কেউ যদি কুরআন তিলাওয়াত করে মৃত ব্যক্তিকে ঈসালে সাওয়াব করে, আলেমদের বিশুদ্ধ মতানুযায়ী এ সাওয়াব মৃত ব্যক্তির নিকট পৌঁছায় না, কারণ এটা মৃত ব্যক্তির আমল নয়। আল্লাহ তাআলা বলছেনে :
{আর এই যে, মানুষ যা চেষ্টা করে, তাই সে পায়।} {সূরা নাজম: ৩৯}

এ তিলাওয়াত জীবীত ব্যক্তির চেষ্টা বা আমল, এর সাওয়াব সে নিজেই পাবে, অন্য কাউকে সে ঈসালে সাওয়াব করার অধিকার রাখে না। এ সংক্রান্ত সৌদি আরবরে “ইলমি গবষেণা ও ফতোয়ার স্থায়ী ওলামা পরষিদ” এর একটি বিস্তারিত ফতোয়া রয়েছে নিচে তা উল্লেখ করা হলো :

Continue reading

আয়েশা (রাঃ) এর ফজিলত পর্ব-২


উম্মুল মুমেনিন আয়েশা রাদিআল্লাহু আনহার সম্পর্কে আরো কিছু হাদিস

ফজিলত :

এক. আয়েশা রাদিআল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :

“আমাকে তিন দিন স্বপ্নে দেখানো হয়েছে তোমাকে, রেশমের একটি পাত্রে তোমাকে নিয়ে এসে মালাক বলে এ হচ্ছে তোমার স্ত্রী, আমি তার চেহারা খুলে দেখি তুমিই সে নারী। অতঃপর আমি বলি, এটা যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়, তবে অবশ্যই তা বাস্তবায়ন হবে”। {মুসলিম- অষ্টম খণ্ড, পনেরতম অংশ, পৃষ্ঠা : (২০২) দারু ইহইয়াউত তুরাসিল আরাবি, বইরুত, দ্বিতীয় মুদ্রণ, হি.১৩৯২, ই.১৯৭২}

ইমাম নববি রহিমাহুল্লাহ বলেন : سَرَقَة সীন ও রা-তে ফাত্হ (জবর) বিশিষ্ট سَرَقَة শব্দের অর্থ রেশমের সাদা টুকরো। আর إن يك من عند الله يمضه অর্থ : এটা যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়, তাহলে অবশ্যই তিনি তা সত্যে রূপ দেবেন ও বাস্তবায়ন করবেন।

Continue reading

আল্লাহর জন্যে ভালোবাসা


অনুবাদক : নুমান বিন আবুল বাশার

“আল্লাহর জন্য ভালোবাসা” সম্পর্কে জাহেলী যুগে মানুষের কোন ধারণা ছিল না। স্বাদেশিকতা বংশ সম্পর্ক বা অনুরূপ কিছু ছিল তাদের পরস্পর সম্পর্কের মূল ভিত্তি। আল্লাহর বিশেষ দয়ায় ইসলামের আলো উদ্ভাসিত হল। পরস্পর সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় উৎকর্ষতা আসল। ধর্মীয় সম্পর্ক সর্বোচ্চ ও সুমহান সম্পর্ক হিসেবে রূপ লাভ করল। এ-সম্পর্কের উপরেই প্রতিদান, পুরস্কার, ভালোবাসা ও ঘৃণা সাব্যস্ত হল। ইসলামের বিকাশের সাথে সাথে ইসলামি ভ্রাতৃত্ব ও আল্লাহর জন্য ভালোবাসা ইত্যাদি পরিভাষা চালু হল।

আল্লাহর জন্য ভালোবাসা-এর অর্থ হচ্ছে, এক মুসলিম ভাই অপর মুসলিম ভাইয়ের কল্যাণ ও আল্লাহর আনুগত্য কামনা করা। সম্পদের মোহ, বংশ বা স্থান ইত্যাদির কোন সংশ্লিষ্টতা এক অপরের সম্পর্কের ও ভালোবাসার মানদণ্ড হবে না।

আল্লাহর জন্য ভালোবাসার কতিপয় ফজিলত :

১. আল্লাহর জন্য ভালোবাসা স্থাপনকারীদেরকে আল্লাহ ভালোবাসেন :-আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন –

عن أبي هريرة عن النبي صلى الله عليه وسلم أن رجلا زار أخا له في قرية أخرى، فأرصد الله له على مدرجته ملكا، فلما أتى عليه قال أين تريد؟ قال: أريد أخا لي في هذه القرية، قال:هل لك عليه من نعمة تربها ؟ قال:لا، غير أني أحببته في الله عز وجل، قال:فإني رسول الله إليك أن الله قد أحبك كما أحببته فيه .(رواه مسلم:4656)

এক ব্যক্তি অন্য গ্রামে বসবাসকারী নিজ ভাইয়ের সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে বের হল। মহান আল্লাহ তার জন্য পথে একজন ফেরেশতা মোতায়েন করে রাখলেন। যখন সে ফেরেশতা সে ব্যক্তির নিকটবর্তী হল, বলল তুমি কোথায় যাও ? সে বলল, এই গ্রামে বসবাসকারী আমার এক ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করা আমার উদ্দেশ্য। ফেরেশতা বলল, তার কাছে তোমার কোন পাওনা আছে কি-না ? সে বলল, না। কিন্তু আমি তাকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসি। তখন ফেরেশতা বলে উঠল, নিশ্চয় আমি তোমার নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত দূত। মহান আল্লাহ অবশ্যই তোমাকে ভালোবেসেছেন যে রকম তুমি তাকে আল্লাহর জন্য ভালোবেসেছ। (সহীহ মুসলিম:৪৬৫৬) হাদিসে কুদসীতে আছে মহান আল্লাহ বলেন :—

وجبت محبتي للمحتابين فيّ ، والمتجالسين فيّ، والمتزاورين فيّ، والمتباذلين فيّ ( رواه أحمد:21717)

আমার জন্য পরস্পর ভালোবাসা স্থাপনকারী, পরস্পর উঠা-বসা-কারী, পরস্পর সাক্ষাৎকারী, পরস্পর ব্যয়কারীদের জন্য আমার ভালোবাসা অবধারিত। (আহমদ:২১৭১৭)

Continue reading

রোজার আদব পর্ব – ২


(১০) ইফতারি করতে বিলম্ব না করা :

সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে রাতের আগমন ঘটে ও ইফতার করার সময় হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেছেন :—

ثُمَّ أَتِمُّوا الصِّيَامَ إِلَى اللَّيْلِ (البقرة : 187)

অতঃপর রাত পর্যন্ত সিয়াম পালন করবে। সূরা বাকারা : ১৮৭

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামবলেছেন :—

إذا أقبل الليل هاهنا، وأدبر النهار هاهنا، وغربت الشمس فقد أفطر الصائم. رواه البخاري ومسلم

যখন এখান থেকে রাত্রির আগমন ঘটে ও ওখান থেকে দিন চলে যায় এবং সূর্য অস্ত যায় তখন সিয়াম পালনকারী ইফতার করবে। বর্ণনায় : বোখারি ও মুসলিম

তাই ইফতারের আদব হল সূর্যাস্ত মাত্রই তাড়াতাড়ি ইফতার করা। তাড়াতাড়ি ইফতার করার ব্যাপারে অনেক হাদিসে উৎসাহ দেয়া হয়েছে। যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :—

لا يزال الناس بخير ما عجلوا الفطر .رواه البخاري ومسلم

মানুষ যতদিন পর্যন্ত তাড়াতাড়ি ইফতার করবে ততদিন কল্যাণের সাথে থাকবে।’ বর্ণনায় : বোখারি ও মুসলিম

তিনি আরো বলেছেন :—

لا يزال الدين ظاهرا ما عجل الناس الفطر، لأن اليهود والنصارى يؤخرونه. رواه أبو داود

যতদিন মানুষ তাড়াতাড়ি ইফতার করবে ততদিন দ্বীন বিজয়ী থাকবে। কেননা ইহুদি ও খ্রিস্টানরা ইফতারিতে দেরি করে। বর্ণনায় : আবু দাউদ

হাদিসে আরো এসেছে –

قال أبو الدرداء رضي الله عنه : ثلاث من أخلاق النبوة : تعجيل الإفطار، وتأخير السحور، ووضع اليمين على الشمال في الصلاة. رواه الطبراني

আবু দারদা রা. বলেন : তিনটি বিষয় নবী চরিত্রের অংশ : তাড়াতাড়ি ইফতার করে ফেলা, দেরি করে সেহরি খাওয়া ও সালাতে দাঁড়িয়ে ডান হাত বাম হাতের উপর রাখা। বর্ণনায় : তাবরানী

আমর ইবনে মায়মুন আওদী বলেন :—

كان أصحاب محمد صلى الله عليه وسلم أسرع الناس إفطارا وأبطأهم سحورا. رواه عبد الرزاق

রাসূলুল্লাহ স.-এর সাহাবিরা সকলের চেয়ে তাড়াতাড়ি ইফতার করতেন ও সকলের চেয়ে দেরিতে সেহরি খেতেন। বর্ণনায় : মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক

কোন ব্যক্তি দেখে-শুনে ধারণা করে নিল যে, সূর্য ডুবে গেছে ও সে ইফতার করে নিল অথচ সূর্য তখনও অস্ত যায়নি এমতাবস্থায় তার সওমের কোন ক্ষতি হবে না। তবে ইফতার শুরু করার পর সে যদি বুঝতে পারে সূর্য এখনও অস্ত যায়নি তা হলে সাথে সাথে সে পানাহার থেকে বিরত হবে। তার বিষয়টা যে ভুলে পানাহার করেছে তার মতই।

Continue reading

এতেকাফ তাৎপর্য, উদ্দেশ্য ও বিধান


সংকলন : মুহাম্মদ আকতারুজ্জাম

সম্পাদনা : মুহাম্মদ শামছুল হক সিদ্দিক

এতেকাফের সংজ্ঞা

বিশেষ নিয়তে বিশেষ অবস্থায় আল্লাহ তা-আলার আনুগত্যের উদ্দেশ্যে মসজিদে অবস্থান করাকে এতেকাফ বলে।

এতেকাফের ফজিলত

এতেকাফ একটি মহান ইবাদত, মদিনায় অবস্থানকালীন সময়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি বছরই এতেকাফ  পালন করেছেন। দাওয়াত, তরবিয়ত, শিক্ষা এবং জিহাদে ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও রমজানে তিনি এতেকাফ ছাড়েননি। এতেকাফ ঈমানি তরবিয়তের একটি পাঠশালা, এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিদায়েতি আলোর একটি প্রতীক। এতেকাফরত অবস্থায় বান্দা নিজেকে আল্লাহর ইবাদতের জন্য দুনিয়ার অন্যান্য সকল বিষয়  থেকে আলাদা করে নেয়।  ঐকান্তিকভাবে মশগুল হয়ে পড়ে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের নিরন্তর সাধনায়। এতেকাফ  ঈমান বৃদ্ধির একটি মূখ্য সুযোগ। সকলের উচিত এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিজের ইমানি চেতনাকে প্রাণিত করে তোলা ও উন্নততর পর্যায়ে পৌছেঁ দেয়ার চেষ্টা করা।

আল-কুরআনুল কারিমে বিভিন্নভাবে এতেকাফ সম্পর্কে বর্ণনা এসেছে, ইবরাহিম আ. ও ইসমাইল আ.  এর কথা উল্লেখ করে এরশাদ হয়েছে :

وَعَهِدْنَا إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ أَنْ طَهِّرَا بَيْتِيَ لِلطَّائِفِينَ وَالْعَاكِفِينَ وَالرُّكَّعِ السُّجُودِ) ﴿১২৫﴾ سورة البقرة

এবং আমি ইবরাহিম ও ইসমাইলকে আদেশ করলাম, তোমরা আমার গৃহকে তাওয়াফকারী, এতেকাফকারী ও রুকু-সেজদাকারীদের জন্য পবিত্র করো।” ( সূরা বাকারা : ১২৫)

এতেকাফ অবস্থায় স্ত্রীদের সাথে কি আচরণ হবে তা বলতে গিয়ে আল্লাহ তা-আলা বলেন :

وَلَا تُبَاشِرُوهُنَّ وَأَنْتُمْ عَاكِفُونَ فِي الْمَسَاجِدِ.  سورة البقرة ১৮৭

আর তোমরা মসজিদে এতেকাফ কালে স্ত্রীদের সাথে মেলামেশা করো না।” ( সূরা বাকারা : ১৮৭)

ইবরাহিম আ.  তাঁর পিতা এবং জাতিকে লক্ষ্য করে মূর্তির ভর্ৎসনা করতে যেয়ে যা বলেছিলেন, আল্লাহ তা-আলা তা উল্লেখ করে বলেন:

إِذْ قَالَ لِأَبِيهِ وَقَوْمِهِ مَا هَذِهِ التَّمَاثِيلُ الَّتِي أَنْتُمْ لَهَا عَاكِفُونَ ﴿৫২﴾ سورة الأنبياء

যখন তিনি তাঁর পিতা ও তাঁর সম্প্রদায়কে বললেন: “এই মূর্তিগুলো কি, যাদের পূজারি (এতেকাফকারী) হয়ে) তোমরা বসে আছ” ?  (সূরা আম্বিয়া : ৫২)

রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অসংখ্য হাদিস এতেকাফ সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে, তার মধ্য হতে ফজিলত সম্পর্কিত কিছু হাদিস নিচে উল্লেখ করা হল।

عن عائشة رضي الله عنها قالت: كان رسول الله صلي الله عليه وسلم يعتكف العشر الأواخر حتي توفاه الله، ثم أزواجه من بعده.     رواه البخاري و مسلم

আয়েশা রাদি-আল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানের শেষের দশকে এতেকাফ করেছেন, ইন্তেকাল পর্যন্ত। এরপর তাঁর স্ত্রীগণ এতেকাফ করেছেন। [ বুখারি ও মুসলিম]

عن عائشة رضي الله عنها قالت: كان رسول الله صلي الله عليه وسلم يعتكف في كل رمضان . ( البخاري  رقم الحديث :  ২০৪১)

অর্থাৎ: আয়েশা রাদি-আল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি  ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক রমজানে এতেকাফ করতেন। (বুখারি ২০৪১)

অন্য এক হাদিসে এসেছে—

إني اعتكفت العشر الأول ألتمس هذه الليلة، ثم اعتكفت العشر الأوسط، ثم أُتيت فقيل لي إنها في العشر الأواخر فمن أحب منكم أن يعتكف فليعتكف، فاعتكف الناس معه، قال: وإني أُريتها ليلة وتر وأني أسجد صبيحتها في طين وماء، فأصبح من ليلة إحدى وعشرين وقد قام إلى الصبح، فمطرت السماء فوكف المسجد، فأبصرت الطين والماء، فخرج حين فرغ من صلاة الصبح وجبينه وروثة أنفه فيهما الطين والماء، وإذا هي ليلة إحدى وعشرين

আমি (প্রথমে) এ রাতের সন্ধানে প্রথম দশে এতেকাফ পালন করি। অত:পর এতেকাফ পালন করি মাঝের দশে। পরবর্তীতে ওহির মাধ্যমে আমাকে জানানো হয় যে, এ রাত শেষ দশে রয়েছে। সুতরাং তোমাদের মাঝে যে (এ দশে) এতেকাফ পালনে আগ্রহী, সে যেন তা পালন করে। লোকেরা তার সাথে এতেকাফ পালন করল। রাসূল বলেন—আমাকে তা এক বেজোড় রাতে দেখানো হয়েছে এবং দেখানো হয়েছে যে, আমি সে ভোরে কাদা ও মাটিতে সেজদা দিচ্ছি। অত:পর রাসূল একুশের রাতের ভোর যাপন করলেন, ফজর পর্যন্ত তিনি কিয়ামুল্লাইল করেছিলেন। তিনি ফজর আদায়ের জন্য দণ্ডায়মান হয়েছিলেন। তখন আকাশ ছেপে বৃষ্টি নেমে এল, এবং মসজিদে চুঁইয়ে চুঁইয়ে পানি পড়ল। আমি কাদা ও পানি দেখতে পেলাম। ফজর সালাত শেষে যখন তিনি বের হলেন, তখন তার কপাল ও নাকের পাশে ছিল পানি ও কাদা। সেটি ছিল একুশের রাত।

আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন :

كان النبي صلي الله عليه و سلم يعتكف في كل رمضان عشرة أيام، فلما كان العام الذي قبض فيه اعتكف عشرين يوماً

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি রমজানে দশ দিন এতেকাফ  করতেন, তবে যে বছর তিনি পরলোকগত হন, সে বছর তিনি বিশ দিন এতেকাফে কাটান।

আবু হুরাইরা  রা. হতে বর্ণিত হাদিসে উভয়টির উল্লেখ পাওয়া যায়।  তিনি বলেন —

عن أبي هريرة رضي الله عنه قال: كان النبي صلي الله عليه وسلم يعتكف في كل رمضان عشرة أيام فلما كان العام الذي قبض فيه اعتكف عشرين يوما. رواه البخاري

আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি রমজানের শেষ দশদিন এতেকাফ করতেন। তবে যে বছর পরলোকগত হন তিনি বিশ দিন এতেকাফ করেছেন। ( বুখারি)

عن عائشة رضي الله عنها أن النبي صلي  الله عليه وسلم اعتكف معه بعض نسائه وهي مستحاضة تري الدم فربما وضعت الطست تحتها من الدم) رواه البخاري

আয়শা রাদিয়াল্লাহু  আনহা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে তাঁর জনৈকা স্ত্রীও এতেকাফ করলেন। তখন তিনি ছিলেন এস্তেহাজা  অবস্থায়, রক্ত দেখছেন। রক্তের কারণে হয়তো তাঁর নীচে গামলা রাখা হচ্ছে। ( বুখারি)

রাসূল বলেন—

إني اعتكفت العشر الأُوَل ألتمس هذه الليلة، ثم اعتكفت العشر الأوسط، ثم أُتيت فقيل لي: إنها في العشر الأواخر؛ فمن أحب منكم أن يعتكف فليعتكف؛ فاعتكف الناس معه

আমি কদরের রাত্রির সন্ধানে প্রথম দশ দিন এতেকাফ করলাম। এরপর এতেকাফ করলাম মধ্যবর্তী দশদিন। অত:পর ওহি প্রেরণ করে আমাকে জানানো হল যে তা শেষ দশদিনে। সুতরাং তোমাদের যে এতেকাফ পছন্দ করবে, সে যেন এতেকাফ করে। ফলে, মানুষ তার সাথে এতেকাফ যাপন করল।

Continue reading

যাকাতুল ফিতর


সংকলনে : আব্দুল্লাহ শহীদ আব্দুর রহমান
تأليف : عبد الله الشهيد عبد الرحمن

সম্পাদনা : নুমান বিন আবুল বাশার
مراجعة : نعمان بن أبو البشر

আমাদের প্রতি আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের একটি অনুগ্রহ এই যে তিনি আমাদের ইবাদত-বন্দেগিতে কোন ত্রুটি হলে তার ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা রেখেছেন। যেমন নফল নামাজ দ্বারা ফরজ নামাজের ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা রেখেছেন। এমনিভাবে সিয়াম পালনে যে সকল ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়ে থাকে তার ক্ষতি পুষিয়ে দেয়ার জন্য যাকাতুল ফিতর আদায়ের বিধান দিয়েছেন। সাথে সাথে দরিদ্র ও অনাহার ক্লিষ্ট মানুষেরা যেন ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারে সে ব্যবস্থাও দিয়েছেন। কেউ যেন অর্থাভাবে ঈদের খুশি থেকে বঞ্চিত না থাকে সে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য ইসলামি সমাজকে এ বিধান দিয়েছেন। এ ফিতরা আদায়ের মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করে থাকে। তিনিই তো সিয়াম পূর্ণ করা ও রমজানের রাতে কিয়ামসহ অন্যান্য নেক আমল এবং কল্যাণকর কাজ করার তওফিক দিয়েছেন।

যাকাতুল ফিতরের বিধান :
হাদিসে এসেছে,
عن ابن عباس رضى الله عنهما قال: فرض رسول الله صلى الله عليه وسلم زكاة الفطر طهرة للصائم من اللغو والرفث وطعمة للمساكين، فمن أداها قبل الصلاة فهي مقبولـة، ومن أداها بعد الصلاة فهي صدقة من الصدقات.
رواه أبو داود
‘ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিয়াম পালনকারীর জন্য সদকাতুল ফিতর আদায় অপরিহার্য করে দিয়েছেন। যা সিয়াম পালনকারীর অনর্থক কথা ও কাজ পরিশুদ্ধকারী ও অভাবী মানুষের জন্য আহারের ব্যবস্থা হিসেবে প্রচলিত। যে ব্যক্তি ঈদের সালাতের পূর্বে তা আদায় করবে তা সদকাতুল ফিতর হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে। আর যে ব্যক্তি ঈদের সালাতের পর আদায় করবে তা সাধারণ সদকা বলে গণ্য হবে। (আবু দাউদ)
অতএব সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব। আল্লাহর রাসূল স. যা কিছু ওয়াজিব করেছেন তা পালন করা উম্মতের জন্য অপরিহার্য। আল্লাহর রাব্বুল আলামিন বলেন:—
مَنْ يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ وَمَنْ تَوَلَّى فَمَا أَرْسَلْنَاكَ عَلَيْهِمْ حَفِيظًا . (النساء :80)
‘যে রাসূলের আনুগত্য করল সে তো আল্লাহরই আনুগত্য করল। এবং যে মুখ ফিরিয়ে নিল আমি তোমাকে তাদের উপর তত্ত্বাবধায়ক পাঠাইনি।’ (সূরা আন-নিসা : ৮০)
অতএব রাসূল যা নির্দেশ দিয়েছেন তা মূলত আল্লাহরই নির্দেশ। আল্লাহ বলেন:—
أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ. (النساء : 59)
‘তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং আনুগত্য কর রাসূলের।’ সূরা আন-নিসা: ৫৯

যাকাতুল ফিতর কার উপর ওয়াজিব ?
যার কাছে ঈদের দিন স্বীয় পরিবারের একদিন ও একরাতের ভরন-পোষণের খরচ বাদে এক সা’ পরিমাণ খাদ্যসামগ্রী থাকবে তার উপরই সদকাতুল ফিতর ফরজ হবে। যার উপর সদকাতুল ফিতর ফরজ তিনি নিজের পক্ষ থেকে যেমন আদায় করবেন তেমনি নিজের পোষ্যদের পক্ষ থেকেও আদায় করবেন।

যাকাতুল ফিতর এর পরিমাণ :
যা কিছু প্রধান খাদ্য হিসেবে স্বীকৃত যেমন গম, যব, ভুট্টা, চাউল, খেজুর ইত্যাদি থেকে এক সা’ পরিমাণ দান করতে হবে। হাদিসে এসেছে—
عن ابن عمر رضى الله عنهما قال : فرض رسول الله صلى الله عليه وسلم زكاة الفطر من رمضان، صاعا من تمر أو صاعا من شعير. رواه البخاري ومسلم
ইবনে উমার রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন : ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপরিহার্য করে দিয়েছেন রমজানের জাকাতুল ফিতর হিসেবে এক সা’ খেজুর অথবা এক সা’ গম।’ (বোখারি ও মুসলিম)
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগের সা’-র হিসেবে : এক সা’-তে ২ কেজি ৪০ গ্রাম।

কখন আদায় করবেন যাকাতুল ফিতর ?
সদকাতুল ফিতর আদায় করার দুটো সময় রয়েছে। একটি হল উত্তম সময় অন্যটি হল বৈধ সময়। উত্তম সময় হল ঈদের দিন ঈদের সালাতের পূর্বে আদায় করা। যেমন হাদিসে এসেছে—
عن ابن عمر رضى الله عنهما أن النبي صلى الله عليه وسلم أمر بزكاة الفطر قبل خروج الناس إلى الصلاة. رواه مسلم
‘ইবনে উমার থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ স. ইদগাহে যাওয়ার পূর্বে সদকাতুল ফিতর আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন। ( মুসলিম)
সদকাতুল ফিতর আদায় করার সুযোগ দেয়ার জন্যইতো ঈদুল ফিতরের সালাত একটু বিলম্বে আদায় করা মোস্তাহাব। সদকাতুল ফিতর আদায় করার বৈধ সময় হল: যদি কেউ ঈদের দু একদিন পূর্বে সদকাতুল ফিতর আদায় করে দেয় তবে আদায় হয়ে যাবে। সহি বোখারিতে আছে আব্দুল্লাহ ইবনে উমর এ রকম আদায় করতেন। তবে কোন সংগত কারণ ব্যতীত ঈদের সালাতের পরে আদায় করলে সদকাতুল ফিতর হিসেবে আদায় হবে না বরং সাধারণ নফল সদকা হিসেবে আদায় হবে। ওজর বা বিশেষ অসুবিধায় কেউ যদি ঈদের সালাতের পূর্বে আদায় করতে না পারে তবে সে ঈদের সালাতের পর আদায় করবে।

যাকাতুল ফিতর কাকে দেবেন ?
নিজ শহরের অভাবী ও দরিদ্র মানুষদের মাঝে সদকাতুল ফিতর আদায় করবেন। যারা জাকাত গ্রহণের অধিকার রাখে এমন অভাবী লোকদেরকে সদকাতুল ফিতর প্রদান করতে হবে। একজন দরিদ্র মানুষকে একাধিক ফিতরা দেয়া যেমন জায়েজ আছে তেমনি একটি ফিতরা বণ্টন করে একাধিক মানুষকে দেয়াও জায়েজ।

 

********************