বাংলাদেশের সংবিধান হৌক ইসলাম


(১) বাংলাদেশের সংবিধান হৌক ইসলাম


মে ২০০৬ (৯/৮ সংখ্যা) ‘দরসে কুরআন’ কলামে আমাদের শিরোনাম ছিল ‘জাতিসংঘের সংবিধান হৌক ইসলাম’। আজ আমরা সম্পাদকীয়তে বলছি ‘বাংলাদেশের সংবিধান হৌক ইসলাম’। কেন বলছি? শুনুন তাহ’লে-
সংবিধান হ’ল একটি জাতি ও রাষ্ট্রের আয়না স্বরূপ। যার মধ্যে তাকালে পুরা দেশটাকে চেনা যায়। যদিও ছোট্ট পকেট সাইজ ঐ বইটির বাস্তবে কোন গুরুত্ব দেখা যায় না। কেননা কোন সরকারই এর কোন তোয়াক্কা করেন না। প্রত্যেকে স্ব স্ব চিন্তা-চেতনা বা দলীয় ইশতেহার বাস্তবায়নের নামে দেশ শাসন করেন। তবে এটি কাজে লাগে মূলতঃ বিচার বিভাগের। কেননা তারা সংবিধানের দেওয়া গাইড লাইনের বাইরে কোন বিচার করতে পারেন না। এটা কাজে লাগে সংসদে আইন রচনার ক্ষেত্রে ও প্রেসিডেন্ট কর্তৃক তা অনুমোদনের ক্ষেত্রে। কেননা তখন সংবিধানের বাইরে গিয়ে আইন রচনা করা বা তা অনুমোদন করা যায় না। এটা প্রয়োজন হয় জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় পরিচিতির ক্ষেত্রে। আমাদের দেশটি ইসলামী রাষ্ট্র, না ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, আমাদের পাসপোর্টে সেটা লেখা থাকে। যা দেখে বিদেশী রাষ্ট্রগুলি আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজ সম্পর্কে প্রাথমিক পরিচিতি লাভ করে।
বাংলাদেশের ১ম সংবিধান রচিত হয় ১৯৭২ সালে পাকিস্তান গণপরিষদের জন্য ১৯৭০ সালে নির্বাচিত এম.পি-দের মাধ্যমে। যদিও উচিত ছিল স্বাধীন দেশে নতুনভাবে নির্বাচিত এম.পি-দের মাধ্যমে নতুন সংবিধান রচনা করা। ঐ সংবিধানে হঠাৎ করে রাষ্ট্রের চারটি মূলনীতি যুক্ত করা হয়। যথা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ। অথচ এইগুলি ১৯৫২ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত ২১ দফা, ৬ দফা প্রভৃতি ৭টি বড় বড় আন্দোলনের ইশতেহারের কোথাও ছিল না। এমনকি ১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল মুজিবনগর সরকারের জারিকৃত ‘স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রে’ও ছিল না। তাহ’লে এলো কোত্থেকে? সোজা কথায় বলতে গেলে বলতে হয়, এগুলি এসেছিল ভারতীয় সংবিধান থেকে। যাদের রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হ’ল ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্র। যদিও বাস্তবে সেখানে আছে চরম সাম্প্রদায়িকতাবাদ, চরম পুঁজিবাদ ও অন্ধ দলতন্ত্র ও পরিবারতন্ত্র। বর্তমান সংবিধানে আমাদের দেশের নাম হ’ল ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’। জানি না এর প্রকৃত অর্থ কী? কেননা এদেশে কোন রাজা নেই। তাহ’লে আমরা কার প্রজা? এর সাথে ‘গণ’ শব্দটি জুড়ে দিয়ে তালগোল পাকিয়ে বুঝানো হচ্ছে যে, ‘জনগণই সকল ক্ষমতার মালিক’। অথচ জনগণই এদেশে সবচেয়ে নির্যাতিত শ্রেণী। আর মালিক হ’ল দলনেতা ও দলীয় ক্যাডাররা।

Continue reading

ইলম অর্জনে শিশুর অধিকার


ইলম অর্জন, জীবন ও জগৎ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা লাভ, ইহপরকালীন কল্যাণের পথ পথান্তর বিষয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা অর্জন শিশুর একটি মৌলিক অধিকার। এ অধিকার প্রদানে, এ বিষয়ে শিশুর যথাযথ পরিচর্যায় মহানবী সা. স্থাপন করেছেন সর্বোচ্চ আদর্শ। আমাদের সালাফে সালেহীনগণও এক্ষেত্রে রেখেছেন উজ্জ্বল উদাহরণ।

মহানবী সা. জ্ঞান অন্বেষণ প্রতিটি মুসলমানের জন্য ফরজ বলে ঘোষণা করেছেন। [ দ্রঃ: আল মাকাসিদুল হাসানা: ৬৬০] জ্ঞান অন্বেষণ সর্বোত্তম ইবাদত। আর এ ইবাদত চর্চার জীবনব্যাপী চলমান প্রক্রিয়া শুভ শুরু শিশুকাল থেকেই শুরু হয়, শুরু হওয়া আবশ্যক; কেননা শিশুকালে লব্ধ জ্ঞান পাথরে খচিত রেখার মতোই, যা কখনো মুছে যাবার নয়।

আবু হুরায়রা (রাযি:) হতে এক বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:’যে ব্যক্তি শিশুকালে কুরআন শিখল, কুরআন তার রক্তমাংসের সাথে মিশে গেল, আর যে ব্যক্তি বৃদ্ধ বয়সে কুরআন শিখল, আর কুরাআন তার কাছ থেকে ছুটে যাওয়া সত্ত্বেও সে লেগে রইল, তার জন্য রয়েছে দ্বিগুণ ছোয়াব। [ দায়লামি, হাকেম]

ইবনে আব্বাস (রাযি:) বলেন :’যে ব্যক্তি বয়ঃপ্রাপ্তির পূর্বেই কুরআন শিখল তাকে প্রজ্ঞা দিয়ে ভূষিত করা হল। ‘
খতিব আল বাগদাদি ইলম শেখানোর ব্যাপারে সালাফে সালেহীনদের উদ্যোগ-আগ্রহের একটি দীর্ঘ বর্ণনা দিয়েছেন যার কিছু অংশ এখানে তুলে দেওয়া হল:

Continue reading

রাসূলুল্লাহ সা. -এর শিক্ষাক্রম ও বর্তমান শিক্ষাক্রমের একটি তুলনামূলক পর্যালোচনা


ডঃ মোহাম্মদ মানজুরে ইলাহী

যুগের উন্নতির সাথে সাথে আমাদের শিক্ষাক্রমেও সাধিত হয়েছে প্রভূত উন্নয়নের ছোঁয়া। আমাদের শিক্ষার বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানামুখী গবেষণার যে বিশাল সম্ভারের সমারোহ আমরা দেখতে পাচ্ছি তা অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক। মূলত শিক্ষাকে সকল মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার জন্য যে বিরাট সুযোগ-সুবিধা ও সম্ভাবনার দ্বার আজ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় উন্মোচিত হয়েছে, সে তুলনায় আমাদের আগে যারা অতিবাহিত হয়েছেন তাদের সুযোগ-সুবিধা ছিল অনেক বেশী সংকুচিত। বর্তমান সময়ের এত বিশাল সুযোগ-সুবিধা স্বত্ত্বেও আমরা অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি যে, আমাদের শিক্ষা সর্বস্তরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে কাঙ্খিত ইতিবাচক পরবির্তন সাধন করতে পারছে না

এবং স্বাধীন জাতিসত্ত্বা হিসেবে সত্যিকার শিক্ষার যে মৌলিক লক্ষ্যমাত্রা আমাদের রয়েছে বর্তমান শিক্ষাক্রমের মাধ্যমে সে লক্ষ্যও আমাদের অর্জিত হয়নি। এর বিপরীতে যদি আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবাদের যুগের শিক্ষাক্রম ও শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে তাকাই তাহলে ফলাফলের দিক থেকে দেখব যে, তা শতভাগ সফল ও সার্থক। অথচ সে যুগে শিক্ষাপোকরণ ছিল সীমিত এবং প্রযুক্তি ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার দিক থেকে তারা ছিল আমাদের চেয়ে অনেক বেশী পিছিয়ে।

ফলে স্বভাবতই একটি প্রশ্নের সৃষ্টি হয়, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সফল শিক্ষাক্রম ও আমাদের আধুনিক শিক্ষাক্রমের মধ্যে তাহলে পার্থক্যটা কোথায়?

সেটা কি শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য স্থির করার ক্ষেত্রে, নাকি সিলেবাসের ক্ষেত্রে অথবা যারা কারিকুলাম তথা শিক্ষাক্রম প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করেন তাদের ক্ষেত্রে?

নাকি পার্থক্য রয়েছে উল্লিখিত প্রতিটি ক্ষেত্রেই?

হাদীস ও সীরাতের গ্রন্থসমূহ অধ্যয়ন করে দেখা যায় যে, উপরোক্ত তিনটি ক্ষেত্রেই আমাদের বর্তমান শিক্ষাক্রম ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষাক্রমের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এ প্রবন্ধে আমরা সে পার্থক্যগুলো কিছুটা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষাক্রম থেকে গুরুত্বপূর্ণ দিক-নির্দেশনা খূঁজে পাওয়ার চেষ্টা করব।

Continue reading

আল্লাহর পথে দাওয়াত : ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর -১


ভূমিকা

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

আল-হামদু লিল্লাহ। ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু আলা রাসূলিল্লাহ। ওয়াআলা আলিহী ওয়া আসহাবিহী আজমাঈন।

আল্লাহর পথে আহবান করতেই নবী-রাসূলগণের পৃথিবীতে আগমন। মুমিনের জীবনের আন্যতম দায়িত্ব এই দাওয়াত। কোরআনুল কারিমে এ দায়িত্বকে কখনো দাওয়াত, কখনো সৎকার্যে আদেশ ও অসৎকার্যে নিষেধ, কখনো প্রচার, কখনো নসিহত ও কখনো দীন প্রতিষ্ঠা বলে অভিহিত করা হয়েছে। কোরআন ও হাদিসের আলোকে এ কাজের গুরুত্ব, এর বিধান, পুরস্কার, এ দায়িত্ব পালনে অবহেলার শাস্তি, ও কর্মে অংশগ্রহণের শর্তাবলী ও এর জন্য আবশ্যকীয় গুণাবলী আলোচনা করেছি এই পুস্তিকাটিতে। এ বিষয়ক কিছু ভুলভ্রান্তি, যেমন বিভিন্ন অজুহাতে এ দায়িত্বে অবহেলা, ফলাফলের ব্যস্ততা বা জাগতিক ফলাফল ভিত্তিক সফলতা বিচার, এ দায়িত্ব পালনে কঠোরতা ও উগ্রতা, আদেশ, নিষেধ বা দাওয়াত এবং বিচার ও শাস্তির মধ্যে পার্থক্য নির্ণয়, আদেশ নিষেধ বা দাওয়াত এবং গীবত ও দোষ অনুসন্ধানের মধ্যে পার্থক্য ইত্যাদি বিষয় আলোচনা করেছি। সবশেষে এ ইবাদত পালনের ক্ষেত্রে সুন্নাতে নববী এবং এ বিষয়ক কিছু ভুলভ্রান্তির কথা আলোচনা করেছি।

হাদিসের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র সহিহ বা নির্ভরযোগ্য হাদিসের উপর নির্ভর করার চেষ্টা করেছি। মুহাদ্দিসগণ অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও বৈজ্ঞানিক নিরীক্ষার মাধ্যমে হাদিসের বিশুদ্ধতা ও দুর্বলতা নির্ধারণ করেছেন, যে নিরীক্ষা-পদ্ধতি বিশ্বের যে কোনো বিচারালয়ের সাক্ষ্য-প্রমাণের নিরীক্ষার চেয়েও বেশি সূক্ষ্ম ও চুলচেরা। এর ভিত্তিতে যে সকল হাদিস সহিহ বা হাসান অর্থাৎ গ্রহণযোগ্য বলে প্রমাণিত হয়েছে আমি আমার আলোচনায় শুধুমাত্র সে হাদিসগুলিই উল্লেখ করার চেষ্টা করেছি।

অতি নগণ্য এ প্রচেষ্টাটুকু যদি কোনো আগ্রহী মুমিনকে উপকৃত করে তবে তা আমার বড় পাওয়া। কোনো সহৃদয় পাঠক দয়া করে পুস্তিকাটির বিষয়ে সমালোচনা, মতামত, সংশোধনী বা পরামর্শ প্রদান করলে তা লেখকের প্রতি তাঁর এহসান ও অনুগ্রহ বলে গণ্য হবে।

মহান আল্লাহর দরবারে সকাতরে প্রার্থনা করি, তিনি দয়া করে এ নগণ্য কর্মটুকু কবুল করে নিন এবং একে আমার, আমার পিতামাতা, স্ত্রী-সন্তান, আত্মীয়স্বজন ও পাঠকদের নাজাতের ওসিলা বানিয়ে দিন। আমীন!

Continue reading

ঠকানোর মানে যদি টাকা কম দেওয়া বুঝায়, তাহলে ইসলাম কাকে ঠকালো ? পুরুষকে না নারীকে ?


সম্পদ বন্টনে সবচেয়ে প্রচলিত যে কথা আছে সমাজে তা হল

“নারীরা পুরুষের অর্ধেক পায়।”

কিন্তু কয়টি ক্ষেত্রে?

মিসরের জাতীয় ফতোয়া বোর্ড কর্তৃক প্রচারিত এক ফতোয়ায় মিরাছের সম্পদ পাওয়ার ক্ষেত্রে নারী পুরুষের একটি তুলনামূলক পর্যালোচনা তুলে ধরা হয়েছে। তাতে যে বিস্ময়কর তথ্য এসেছে তার মাধ্যমে অনেকের চোখ খুলে যেতে পারে, বিবেক পেতে পারে নতুন খোরাক। ঐ পরিসংখ্যানে নারী কখন পুরুষের অর্ধেক পায়, আর কখন সমান পায়, আর কখন বেশি পায় তার বর্ণনা এসেছে অত্যন্ত পরিস্কারভাবে। লক্ষ্য করুন:

নারী কেবলমাত্র চার অবস্থায় পুরুষের অর্ধেক পায় :
১. মেয়ে ও নাতনী(ছেলের মেয়ে) ছেলে ও নাতী (ছেলের ছেলে) থাকা অবস্থায়।
২. ছেলে সন্তান ও স্বামী বা স্ত্রী না থাকলে “মা” পিতার অর্ধেক পায় ।
৩. “সহোদরা বোন” সহোদর ভাইয়ের সাথে ওয়ারিস হলে।
৪. “বৈমাত্রেয় বোন” বৈমাত্রেয় ভাইয়ের সাথে ওয়ারিস হলে।

Continue reading

প্রকৃত ইসলামী সমাজের বৈশিষ্ট্য


যে সমাজের মানুষের ছোট থেকে বড়, ব্যক্তিগত থেকে রাজনৈতিক বা আন্তর্জাতিক, কোর্ট-কাচারি, অর্থনীতিসহ সকল বিষয় আল্লাহর গোলামীর মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে আল্লাহর আইন দ্বারা পরিচালিত হয় সেই সমাজকেই কেবল সত্যিকার অর্থে ইসলামী সমাজ বলা যেতে পারে। অর্থাৎ সমাজের মানুষের চিন্তা-চেতনা, শিল্প-সংস্কৃতি, আচার-অনুষ্ঠান, আইন-কানুন তথা সকল কাজের মধ্য দিয়েই যারা প্রমাণ করে যে, তারা একমাত্র আল্লাহরই গোলামী করে যাচ্ছে-এমন সমাজই হলো ইসলামী সমাজ। আর কালেমা শাহাদাত এ ধরনের আল্লাহর দাসত্বমূলক জীবনব্যবস্থা গ্রহণ করে নেয়ার মৌখিক স্বীকৃতি দেয় এবং বাস্তব জীবনে তা পালনের পদ্ধতি নির্ধারণ করে।

”আল্লাহ বললেনঃ তোমরা দুই উপাস্য গ্রহণ করো না ,উপাস্য তো মাত্র একজনই। অতএব আমাকেই ভয় কর। যা কিছু নভোমন্ডল ও ভুমন্ডলে আছে তা সবই তাঁর জন্য নিবেদিত। (এরপরও কি) তোমরা কি আল্লাহ ব্যতীত কাউকে ভয় করবে?” [সূরা আন নাহল: ৫১-৫২]

Continue reading