ইসলাম ও পর্দা



মুহাম্মাদ হাবীবুর রহমান


আল্লাহ তা‘আলা মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর ইবাদতের জন্য। এটা আসমানী কিতাব আল-কুরআনে বিঘোষিত হয়েছে। এজন্য পৃথিবীতে মানবের বংশ বিস্তারের প্রয়োজন। এই প্রয়োজনের কারণে নর এবং নারীকে সৃষ্টি করা হয়েছে। পুরুষ এবং নারী বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে মানব বংশ বিস্তার করবে। আল্লাহ তা‘আলা অপূর্ব কৌশলে পুরুষ এবং নারী উভয়ের মধ্যে একটা আকর্ষণীয় শক্তি দিয়েছেন। তা না দিলে সৃষ্টি প্রক্রিয়া অকার্যকর হ’ত। চুম্বক লোহাকে আকর্ষণ করে। কিন্তু অন্য ধাতুকে আকর্ষণ করে না। তাহ’লে বলতেই হবে যে লোহারও আকর্ষিত হবার গুণ রয়েছে। এটাই সঠিক যে, পুরুষ আকৃষ্ট হয় নারীর প্রতি, আর নারী আকৃষ্ট হয় পুরুষের প্রতি। তথাপি এটাই সত্য যে, নারীর প্রতি পুরুষই অধিক আকর্ষণ বোধ করে। মানসিকভাবে পুরুষই নারীর প্রতি অধিক দুর্বল। আদম (আঃ) হাওয়া (আঃ)-এর অনুরোধ উপেক্ষা করতে পারেননি। তাই তিনি হাওয়ার অনুরোধে নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণ করেছিলেন। এটা শুধু আদি মানবের বেলাতে ঘটেছিল তা নয়, আজও এরূপ ঘটতে দেখা যায়।

নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা প্রতিহত করতেই নারীর জন্য পর্দা ফরয করা হয়েছে। নির্দিষ্ট কয়েকজন পুরুষ ব্যতীত অন্যান্য পুরুষের সংগে নারীর দেখা-সাক্ষাৎ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এটা আল্লাহর কিতাব আল-কুরআনের বিধান। রাসূল (ছাঃ)-এর প্রতি আল্লাহর অহী, ‘মুমিনা নারীগণকে বল, তারা যেন তাদের আপন দৃষ্টি সংযত রাখে, আপন লজ্জাস্থান রক্ষা করে চলে, প্রকাশ না করে তাদের বেশ-ভূষা এবং অলংকার ততটুকু ব্যতীত, যতটুকু সাধারণতঃ প্রকাশমান এবং আপন চাদর গলা ও বুকের উপর জড়িয়ে দেয় এবং প্রকাশ না করে তাদের সাজ-সজ্জা তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, নিজের পুত্র, স্বামীর পুত্র, সহোদর ভাই, ভাইয়ের পুত্র, ভাগিনা অথবা তাদের নারীগণ, তাদের অধীনস্থ গোলাম অথবা কামপ্রবৃত্তিহীন গোলাম অথবা সেই সকল শিশু যারা নারীর গোপন বিষয় সম্পর্কে জানে না এদের নিকট ব্যতীত। আর নারীরা যেন তাদের পা এমন জোরে না ফেলে, যা দ্বারা তাদের গোপন সাজ-সজ্জা প্রকাশ পায়’ (নূর ৩১)।

কুরআন মাজীদে আরও বলা হয়েছে, ‘হে নবীর বিবিগণ তোমরা সাধারণ নারীর মত নও, যদি তোমরা পরহেযগার হও, তবে পর পুরুষের সাথে কোমল ও আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে কথা বলবে না, তাহ’লে যাদের অন্তরে রোগ আছে, তারা তোমাদের প্রতি কু-বাসনা করবে। তোমরা সঙ্গত কথাবার্তা বলবে আর গৃহাভ্যন্তরে অবস্থান করবে এবং পূর্বের মূর্খতার যুগের ন্যায় নিজেদের প্রদর্শন করবে না’ (আহযাব ৩২-৩৩)।

Continue reading

বাদশাহ ফাহদ কুরআন কমপ্লেক্স : কুরআন মুদ্রণ, গবেষণা ও প্রচারের এক অনন্য কেন্দ্র


বিশ্বব্যাপী পবিত্র কুরআনের বিশুদ্ধ তেলাওয়াত, চর্চা ও অনুশীলন ছড়িয়ে দেয়ার এক মহৎ ব্রত নিয়ে সঊদী আরবের বাদশাহ ফাহদ ১৯৮৫ সালে ২,৫০,০০০ বর্গমিটার এলাকা জুড়ে মদীনায় এ কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠা করেন। এ পর্যন্ত এখান থেকে পৃথিবীর ৫০টি জীবন্ত ভাষায় কুরআনের অনুবাদ ও তাফসীর প্রকাশ করা হয়েছে। তন্মধ্যে এশীয় ভাষায় ২৪টি, ইউরোপীয় ভাষায় ১২টি ও আফ্রিকান ভাষায় ১৪টি। এখানে অনুবাদসহ ও অনুবাদবিহীন দু’ধরনের কুরআন মুদ্রণ ও বিতরণ করা হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ প্রতিষ্ঠানটি ২০ কোটি কুরআন ছেপে বিশ্বব্যাপী বিনামূল্যে বিতরণ করেছে। অন্ধ ব্যক্তিরা যাতে কুরআন তেলাওয়াত করতে পারে সেজন্য প্রকাশ করেছে ‘ব্রেইল’ (Braille) পদ্ধতির সংস্করণ। এ প্রকল্পে বিশুদ্ধ তেলাওয়াতের অডিও ও ভিডিও ফর্মে কুরআনের সিডি, ডিভিডি তৈরী ও সরবরাহ করা হয়।
পবিত্র কুরআন ছাড়াও এ পর্যন্ত এ কমপ্লেক্স থেকে তাফসীর, হাদীছ ও সীরাতুন্নবী বিষয়ক গ্রন্থ বেরিয়েছে ১৬০ প্রকার। এ কমপ্লেক্সের বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ৬ কোটি কপি গ্রন্থ। হজ্জ মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুসারে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৩,৬১,৪৫,৫৩৩ কপি কুরআন, ২৫,২০,৮৭৫ কপি ক্যাসেট, ২,৭৫,৯৭,৩৮৭ কপি অনুবাদ, ২,২০,০০০ কপি সীরাতুন্নবী, ৫০,৪৫,০০০ কপি অন্যান্য গ্রন্থ এ কমপ্লেক্স থেকে প্রকাশিত হয়েছে।

*********************

**************

৯/১১, লাদেন ও মুসলিম জাহান (বেদনাদায়ক প্রতারনা)……


শেখ ফরিদ আলম

৯/১১, সংকেতেই সবাই বুঝে যায় । সবাই বুঝতে পারে ৯/১১ এর অর্থ সেই ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসবাদী হামলা, যেটা হয়েছিল আমেরিকার বুকে । এর জন্য দায়ি করা হয়েছিল লাদেনকে । আবশ্য তাদের কাছে এ সম্পর্কে কোনো প্রমান ছিল না । সেখানে একটা পাশপোর্ট পাওয়া গিয়েছিল । তারপর আমেরিকা বলেছিল এটা লাদেনের কাজ । তবে এই প্রমানটা অযৌক্তিক, হাস্যকর । ঐ ব্লাস্টে দুটি জাহাজ এবং World Trade Centre এর প্রায় পুরো অংশটাই জ্বলে ছাড়খাড় হয়ে গিয়েছিল । অথচ সেই পাশপোর্টটার কিছুই হয়নি । তখন আমেরিকানরাই বলেছিল এখন থেকে বুলেট প্রুফ জ্যাকেট বানাতে হবে সেই পাশপোর্ট দিয়ে । আমেরিকার কাছে কোনো প্রমান ছিল না । তাই আফগানিস্থান সরকার যখন বলেছিল প্রমান দিন আমরা লাদেনকে আপনাদের হাতে তুলে দিচ্ছি । তখন আমেরিকা কোনো প্রমান না দিয়ে হামলা করল আফগানিস্থানে । আর যদি প্রমান থেকেও থাকত তবুও লাদেনের জন্য আফগানিস্থানকে হামলা করা কোনো মতেই উচিত হয়নি । আমরা সবাই জানি লাদেনকে তৈরি করেছে আমেরিকা । এমনকি আমেরিকা লাদেন ও তার দলকে প্রশিক্ষনও দিয়েছে । তারা নিজ স্বার্থে আফগান যুদ্ধে লাদেনকে কমান্ডার করেছিল । কিন্তু আমেরিকার কুনজর যখন আরবের উপর পড়ল,তা বুঝতে পেয়ে লাদেন তাদের বিরোধিতা করেছিল ।তখন লাদেন তাদের বন্ধু থেকে শত্রু হয়ে গেল । ৯/১১ বা বিশ্ব বানিজ্য কেন্দ্র হামলায় যে লাদেনের হাত আছে তার প্রমান এখনও আমেরিকা মিডিয়ার সামনে দেয়নি । আমেরিকানদের মধ্যে আনেকের মতে ৯/১১ সরকারের একটা চাল ।জজ বুশ ক্ষমতায় থাকার জন্য নিজেই World Trade Centre এ হামলা করিয়ে ছিল, যাতে সরকারের ব্যর্থতার দিক থেকে লোকের ধ্যান সরানো যায় । এ নিয়ে আমেরিকাতে বেশ কয়েকটি বই লেখা হয়েছে । অনেক সেমিনার করা হয়েছে । ইসলামের আলো লাইব্রেরিতেও এমন একটা সেমিনারের ভিডিও ক্যাসেট আছে । যেখানে আমেরিকার ৭৫ জন বিষেশজ্ঞের একটা দল যাদের মধ্যে ছিল ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী, প্রফেসর ও সমাজসেবীরা । তারা প্রায় ২ ঘন্টার সেমিনারে এটা প্রমান করেছেন যে, ঐ কাজ বাইরের কোনো লোকের পক্ষে সম্ভব না ।এটা আমেরিকার ভেতরের লোকই করেছে । সেই বিশেষজ্ঞ দলের একজনও মুসলিম ছিল না । সবাই খৃস্টান ।

Continue reading

ডা. জাকির নাইকের সাক্ষাৎকার


(সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন মুহাম্মাদ তাওহীদ আহমেদ । স্থান; আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়)

তাওহীদ আহমেদঃ স্যার, আপনি একজন সফল ডাক্তার হওয়া সত্যেও সেই পেশা ত্যাগ করে; আপনার সকল সময়, শ্রম এই দাওয়াহ’র কাজেই সমর্পন করে চলেছেন । এত বড় কৃতিত্বের জন্য কাদের তরফ থেকে সবচেয়ে সহযোগিতাপুর্ন প্রভাবের কথা আজও অনুভব করেন ?
ডা. জাকির নাইকঃ  হ্যাঁ, এই দাওয়াহ’র কাজে অতিনিবেশকরণে যে ব্যক্তিত্ব আমাকে অনুপ্রাণিত করেন তিনি হলেন শেখ আহমেদ দিদাত । তিনি একবার মুম্বাই এসেছিলেন তখন আমি এম.বি.বি.এস দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র । সেই সময় আমি তাঁর বক্তৃতা শুনি এবং স্বয়ং তাঁর সাথে দেখাও করি ।আর এর পরেই তাঁর কাছ থেকে ভীষণভাবে অনুপ্রানিত হয় তথা এই দাওয়াহ মুলক কর্মকান্ডের ময়দানে নেমে পড়ার জন্য খুবই প্রভাবিত হয়ে পরি । সুতরাং সেই মতো আমি আমার স্মাতক স্তরে পাঠরত দিন গুলিতেই শুরু করে দিয় দাওয়াহ’র কাজ । এমনকি আমাদের ওই মেডিক্যাল কলেজেও তা জারি রাখি । এরপর আমি যখন আমার ডাক্তারি শিক্ষা সফল্ভাবে সমাপন করি, তখন আমি আমার অর্ধেক সময় ব্যয় করতাম দাওয়াহ’র কাজে আর বাকি অর্ধেক ওই ডাক্তারি পেশায় । তারপর ধীরে ধীরে আমি মাত্র দু-ঘন্টা করে সময় দিতে লাগলাম আমাদের সেই ক্লিনিকে, যেটা পুর্ব থেকেই আমার বাবা ও দাদা দু-জনেই পেশাদার ডাক্তার হিসেবে পরিচালিত করে আসছেন সফল্ভাবে । যাইহোক এরপর আলহামদুলিল্লাহ সেই দু-ঘন্টা ব্যতিত বাকী সময়টা তখন এই দাও’আর কাজেই উৎসর্গ করার চেষ্টা করতাম । কিন্তু সুম্মাআলহামদুলিল্লাহ বিগত ১৯৯৫ থেকে আমি সম্পুর্নভাবে দাও’আর কাজেই ব্যতিব্যস্ত । হ্যাঁ, তবে প্রারম্ভিক দিন গুলিতে আমার মমতাময়ী মা চেয়ে ছিলেন যে আমি যেন আগামিতে (পৃথিবী বিখ্যাত ডাক্তার) ডঃ ক্রিস্টিয়ান বার্নাড এর মতোই একজন সফল ও বিখ্যাত ডাক্তার হয় । কিন্তু পরবর্তীতে আমি যখন আমার বেশির ভাগ সময় দাও’আ তেই দিতে লাগলাম, তখন একদিন আমার মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে আপনি কোনটা পছন্দ করেন- হয় আমি ডঃ বার্নাড হয় নই আহমেদ দিদাত ? তো মা বলেছেন, জাকির তুমি দুটোই হওয়ার চেষ্টা কর । অথচ আজ সেই একই প্রশ্ন আমার মার সামনে রাখলে তিনি বলেন, আজ আমি একজন শেখ দিদাতের জন্য সহস্র ক্রিস্টিয়ান বার্নাড ত্যাগ করতে পারি ।
তাওহীদ আহমেদঃ আপনার পরিবারের সমন্ধে আমাদের আরও কিছু বলুন ?
ডা. জাকির নাইকঃ আমার তিন জন  সন্তান, এক ছেলে দুই মেয়ে । আর আমি এমনই এক অতিশয় ধর্মপ্রান পরিবারের সাথে যুক্ত রয়েছি, যেখানে একটা আদর্শ পরিবারের তরফ থেকে যতটা সম্ভব সমর্থন লাগে তার প্রায় সবটুকুই আমি পেয়ে এসেছি আলহামদুলিল্লাহ । আর এই সমর্থনের পরিপেক্ষিতেই আজ আমার সহধর্মনীও একজন ধার্মীক মহিলা স্বরুপ আমাদের ‘ইসলামিক রিসার্চ ফাউন্ডেশান’ এর মহিলা বিভাগের প্রধান তত্ত্বাবধায়ীকা রুপে দাও’আর কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন ।
তাওহীদ আহমেদঃ আচ্ছা, আপনার কলেজ জীবনের ব্যাপারেও আমাদের কিছু বলুন ?
ডা. জাকির নাইকঃ আমার কলেজের দিন গুলিতে আমি বিশেষ করে আমাদের সম্মানিত-শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক মহাদয়গণকে এই দাও’আর প্রতি যথেষ্ট কৌশলের সহিত আকৃষ্ট করার কাজ চালিয়ে যেতাম । আর এভাবেই ইসলামের মর্মবাণী তাঁদের মর্মস্থলে স্পর্শ করানোর চেষ্টা করতাম । যদিও এতে তাঁরা প্রথমে আমাকে দার্শনিক (?) বলেই ডাক হাঁক দিতেন, তবুও প্রকৃতপক্ষে আমাকে ঢ়েড় বেশি সম্মানও করতেন । আর না তাঁরা এজন্য আমাকে কখনো ফেল করিয়েছেন । এমনকি তাঁরা যদিও বা আমাকে ফেল করিয়ে দিতেন, তবুও আমি নিশ্চিন্ত থাকতাম এই ভেবে যে, এই অতিরিক্ত একটা বছর আল্লাহ তা’লা আমাকে দিয়েছেন যাতে আমি তাঁদেরকে আরও এক বছর দাও’য়াত দিতে পারি । এটাই হল আমার আল্লাহর প্রতি ইমান (বিশ্বাস) ।

Continue reading

অনৈক্য প্রবণতা: মুসলিম উম্মাহর প্রধান সংকট


লেখক : মুহাম্মদ রাবে আল-হাসানী আন-নববী
অনুবাদক : জহীর উদ্দীন বাবর
সম্পাদক : ইকবাল হোছাইন মাছুম

মুসলিম জাতির অনন্য কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। পারস্পরিক ঐক্য ও বিভক্তি এর অন্যতম। এটি শুধু আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্যের ভিত্তিতেই হয়। হাদীসে উল্লেখ আছে “এক মুসলমান অন্য মুসলমানের জন্য এক শরীর সদৃশ। যদি এর একটি অংশ আঘাতপ্রাপ্ত হয় তবে এর প্রভাবে সারা শরীর ব্যথিত ও আঘাতপ্রাপ্ত হয়” অদৃশ্য এই শক্তিই মুসলমানদের অবিস্মরণীয় বিজয়ের গোপন রহস্য। সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ূবী রহ. বায়তুল মুকাদ্দাস পুনর্উদ্ধারের জন্য ঐ সময় চূড়ান্ত বিজয়ের প্রস্তুতি নেন, যখন মুসলমানদের পারস্পরিক বন্ধন সুদৃঢ় হয় এবং শামের নেতৃস্থানীয়রা একই প্লাটফর্মে জড়ো হন। ইতিহাসের ঘটনাবলী বিশ্লেষণ করলে একথা স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, মুসলমানরা কোনো একটি যুদ্ধেও সফলকাম হতে পারেনি; যতক্ষণ না তাদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতির সুদৃঢ় বন্ধন স্থাপিত হয়েছে। পারস্পরিক সহযোগিতাবোধ জেগেছে। মতবিরোধ ও ভেদাভেদ থেকে নিস্কৃতি পেয়েছে। কিন্তু যখন প্রত্যেক ব্যক্তি নিজস্ব মত-পথ ও চিন্তাধারায় খেয়ালী বিচরণ করবে; নিজেদের মধ্যে সৃষ্ট মত পার্থক্য শত্রতার রূপ নেবে; তখন সফলতার আর কোনো প্রচেষ্টাই কাজে আসবে না। সর্ব ক্ষেত্রে মুসলমানরা হবে অপদস্থ। তাদের জন্য থাকবে পরাজয়ের গ্লানি।
বর্তমান মুসলিম উম্মাহ অনৈক্য ও অসংহতির মারাত্মক ব্যাধিতে আক্রান্ত। দুনিয়াতে আজ মুসলামানদের রয়েছে বৃহৎ একটি জনগোষ্ঠী। পৃথিবীর এক চতুর্থাংশ তাদের। তবুও দুনিয়ার অন্যান্য শক্তির কাছে তারা আজ নত। লাঞ্ছিত ও নিস্পেষিত হচ্ছে দেশে দেশে। তাদের দেখে বিদ্রুপের হাসি হাসছে বাতিল শক্তি। কিন্তু মুসলমানদের এই অবস্থা হলো কেন? এর একমাত্র কারণ, মুসলিম উম্মাহর ভেতরে ঢুকে পড়েছে অনৈক্যের বীজ। মুসলিম বিশ্ব আজ শতধা বিভক্ত। তাদের খন্ড খন্ড শক্তি নির্জীব হয়ে আছে। প্রত্যেকে তাদের নিজস্ব মতের পূঁজায় লিপ্ত। নিজের গোত্র বা দলনেতার কথাই তিল-তাবিজ; অন্যের কোনো গুরুত্ব নেই। উম্মতের এই অনৈক্য ও অসংহতি সৃষ্টি করছে মারাত্মক বিষক্রিয়ার। ফলে তারা কাটাচ্ছে মুমূর্ষু অবস্থা ।
Continue reading

ঈদুল ফিতর


লিখেছেন: হাবীবুল্লাহ মুহাম্মাদ ইকবাল

ঈদ কী
ঈদ আরবি শব্দ। যার অর্থ ফিরে আসা। এমন দিনকে ঈদ বলা হয় যে দিন মানুষ একত্র হয় ও দিনটি বারবার ফিরে আসে। এ শব্দ দ্বারা এ দিবসের নাম রাখার তাৎপর্য হলো আল্লাহ রাববুল আলামিন এ দিবসে তাঁর বান্দাদেরকে নিয়ামাত ও অনুগ্রহ দ্বারা বারবার ধন্য করেন ও বারবার তাঁর ইহসানের দৃষ্টি দান করেন। যেমন রমাদানে পানাহার নিষিদ্ধ করার পর আবার পানাহারের আদেশ প্রদান করেন। ছদকায়ে ফিতর, হজ-যিয়ারত, কুরবানির গোশত ইত্যাদি নিয়ামাত তিনি বারবার ফিরিয়ে দেন। আর এ সকল নিয়ামাত ফিরে পেয়ে ভোগ করার জন্য অভ্যাসগতভাবেই মানুষ আনন্দ-ফুর্তি করে থাকে।

ইসলামে ঈদের প্রচলন
আল্লাহ রাববুল আলামিন মুসলিম উম্মাহর প্রতি নিয়ামাত হিসেবে ঈদ দান করেছেন। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদিনাতে আগমন করলেন তখন মদিনা বাসীদের দুটো দিবস ছিল, যে দিবসে তারা খেলাধুলা করত। আনাস রাদি আল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন এ দু দিনের কী তাৎপর্য আছে? মদিনা বাসীগণ উত্তর দিলেন : আমরা জাহেলী যুগে এ দু দিনে খেলাধুলা করতাম। তখন তিনি বললেন : ‘আল্লাহ রাববুল আলামিন এ দু দিনের পরিবর্তে তোমাদের এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ দুটো দিন দিয়েছেন। তা হল ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতর’ [সুনান আবূ দাউদ : ১১৩৪]। শুধু খেলাধুলা, আমোদ-ফুর্তির জন্য যে দুটো দিন ছিল আল্লাহ তায়ালা তা পরিবর্তন করে এমন দুটো দিন দান করলেন যে দিনে আল্লাহর শুকরিয়া, তাঁর জিকির, তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনার সাথে সাথে শালীন আমোদ-ফুর্তি, সাজ-সজ্জা, খাওয়া-দাওয়া করা হবে। বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ  গ্রন্থে ইবনে জারীর রাদি আল্লাহু আনহু বর্ণনা মতে, দ্বিতীয় হিজরীতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম ঈদ পালন করেছেন।

ঈদে করণীয়
ঈদ আমাদের জন্য এক বিরাট নিয়ামাত। কিন্তু  আমরা এ দিনকে নিয়ামাত হিসাবে গ্রহণ করি না  এ দিনে অনেক কাজ আছে যার মাধ্যমে আমরা আল্লাহ তায়ালার নিকটবর্তী হতে পারি এবং ঈদ উদযাপনও একটি ইবাদাতে পরিণত হতে পারে। নীচে করণীয়গুলো আলোচনা করা হল :

 ১. ফজরের নামায জামায়াতে আদায় করা

আমাদের দেশের অনেকেই ফজরের নামায আদায় করে না। ঈদের জন্য ফজরের নামায জামায়াতে পড়ার গুরুত্বও দেয় না। অথচ ফজরের নামাযের গুরুত্ব অপরিসীম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যদি তারা ইশা ও ফজর নামাযের মধ্যে কী আছে তা জানতে পারতো তবে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও এ দুটি নামাযের জামায়াতে শামিল হত’ [সহীহ বুখারী : ৬১৫]।

Continue reading

দারিদ্র বিমোচনে যাকাতের ভূমিকা


ইকবাল হুসাইন মাসুম

সম্পাদনা : নুমান বিন আবুল বাশার

দারিদ্র ও প্রাচুর্য দু’টি বিপরীতধর্মী শব্দ কিন্তু মানব জীবনে দু’টিই জড়িয়ে আছে অন্ধকার এবং আলোর মত। এইতো প্রাচুর্যের ছন্দময় উপস্থিতি আবার কিছু সময় পরই  দারিদ্রের সেই অনাকাংখিত ভয়াল থাবা। কারো কারো জন্য প্রাসাদোপম আলীশান বাড়ী। বিলাম বহুল গাড়ীসহ সুখের সব রকম সরঞ্জামাদির বিপুল সমাহার। আবার কারো কারো ক্ষেত্রে  হাড় ভাঙ্গা খাটুনি পরিশ্রমের পরও দু’মুঠু ভাতের নিশ্চয়তা নেই, নেই মাথা গোজার একটু ঠাঁই। দু’টিু অবস্থাই প্রজ্ঞাময় মহামহীমের রহতমতায় সৃষ্টি। সম্ভবত ইবাদতের দু’টি অনুপত ধারা সৃষ্টিই এর মুল রহস্য। একটি সবর অন্যটি শুকর। দু’টিই আল্লাহ তাআালার বিশেষ ইবাদাত। দু’টির মাধ্যমেই রয়েছে মহামহীম রাব্বুল আলামীনের নৈকট্য অর্জনের সুনিপুন ব্যবস্থা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
عجبا لأمر المؤمن، إن أمره كله خيرله، وليس ذاك لأحد إلا للمؤمن، إن أصابته سراء شكر، فكان خيرا له، وإن أصابته ضراء صبر، فكان خيرا له. رواه مسلم: ৭৪২৫
মুমিনের বিষয়টি অতিশয় বিস্ময়কর। তার প্রত্যেকটি বিষয়ই তার জন্যে কল্যাণকর আর এটি একমাত্র মু’মিনের জন্যেই। যদি তার সুদিন আসে, সমৃদ্ধি অর্জিত হয়, তা হলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। এটি তার জন্যে কল্যাণকর। আবার যদি দুর্দিন আসে দারিদ্রে আক্রান্ত হয়, ধৈর্য ধারণ করে এটিও তার জন্যে কল্যাণকর। (মুসলিম: ৭৪২৫)
হাদীস থেকে সু-স্পষ্ট রূপে বুঝা যায় যে, দারিদ্র ও প্রাচুর্য দু’টিই আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের দু’টি সহজ পন্থা। দরিদ্র ধৈর্য ধারণ করবে আর ধনবান শুকরিয়া আদায় করবে। মানব জীবনে দু’টি সুযোগই কারো কারো ক্ষেত্রে  আসতে পারে, আবার কেউ এর যে কোন একটি সুযোগ প্রাপ্ত হতে পারে। তবে  বুদ্ধিমত্তার পরিচয় হল যখন যার যে সুযোগ আসে তখন তাকে কাজে লাগিয়ে সুযোগের সৎ ব্যবহার করা। আমরা আলোচনা করব, যিনি শুকরিয়া আদায়ের সুযোগ পেলেন, তিনি কিভাবে তা বাস্তবায়ন করবেন।

Continue reading

ইসলামের হক حق المسلم


ইসলামের হক    حق المسلم
عن أبي هريرة- رَضِيَ اللهُ عَنْهُ – قَالَ : قَالَ رَسُوْلُ اللهِ- صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ- حَقُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ سِتٌّ، قِيْلَ: مَا هُنَّ يَا رَسُوْلَ اللهِ ؟ قَالَ إذَا لَقِيْتَهُ فَسَلِّمْ عَلَيْهِ، وَ إذَا دَعَاكَ فَأجِبْهُ، وَ إذَا اسْتَنْصَحَكَ فَانْصَحْ لَهُ، وَ إذَا عَطَسَ فَحَمِدَ اللهَ فَشَمِّتْهُ، وَ إذَا مَرِضَ فَعُدْهُ، وَ إذَا مَاتَ فَاتَّبِعْهُ. رَوَاهُ مُسْلِمٌ(৪০২৩)
আবু হুরাইরা রা. বর্ণনা করেন যে রাসূল সাল¬াল¬াহু আলাইহি ওয়াসাল¬াম বলেছেন, একজন মুসলমানের উপর অপর মুসলমানের ছয়টি হক রয়েছে। প্রশ্ন করা হল, হে আল¬াহর রাসূল ! সেগুলো কি কি ? বললেন, (এক) সাক্ষাতে সালাম বিনিময় করা, (দুই) আমন্ত্রণ করলে গ্রহণ করা, (তিন) উপদেশ চাইলে উপদেশ দেওয়া, (চার) হাঁচি দিয়ে আলহামদুলিল¬াহ বললে উত্তরে ইয়ারহামুকাল¬াহ বলা, (পাঁচ) অসুস্থ হলে সাক্ষাত করে খোঁজ খবর নেয়া (ছয়) মৃত্যুবরণ করলে জানাজায় উপস্থিত থাকা।
আভিধানিক ব্যাখ্যা
حَقُّ : হক বলতে ঐ সব কাজ বুঝানো হয়, যা পালন করা অপরিহার্য। যথা ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নতে মোয়াক্কাদা—ইত্যাদি।
سِتٌّ : এ হাদিসে মুসলমানের ছয়টি হকের কথা বলা হয়েছে। তার অর্থ এই নয় যে মুসলমানের হক ছয়টির মাঝেই সীমাবদ্ধ। বরং উদ্দেশ্য হল, মুসলমানের হকসমূহের অন্যতম ছয়টি এই…। অন্যথায় বিশুদ্ধ হাদিসে আলোচিত হক ছাড়াও অন্য হকের কথা বলা হয়েছে।
إذَا لَقِيْتَهُ فَسَلِّمْ عَلَيْهِ: যদি মুসলমানের সাথে সাক্ষাৎ হয়, অথবা তার ঘরে প্রবেশের প্রয়োজন হয়। তাহলে তাকে বল—السلام عليكم و رحمة الله و بركاته
و السلام: এটা আল¬াহর গুণবাচক নাম। অর্থাৎ, হে মোমিন তুমি আল¬াহর আশ্রয়ে থাক। কোন কোন আলেম বলেছেন, السلام অর্থাৎ নিরাপত্তা। তখন পূর্ণ অর্থ হবে—হে মোমিন ! তোমার জন্য আল¬াহর নিরাপত্তা অনিবার্য হোক।
وَ إذَا دَعَاكَ অর্থাৎ শরিয়ত সম্মত কোন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানালে তা গ্রহণ কর। যেমন অলিমা বা বউভাত—ইত্যাদি।
وَ إذَا اسْتَنْصَحَكَ فَانْصَحْ لَهُ : অর্থাৎ যদি কেউ উপদেশ চায় তাহলে উপদেশ দাও। হাদিসের বাহ্যিক অর্থে প্রতীয়মান হয় যে, উপদেশপ্রার্থীকে উপদেশ প্রদান করা ফরজ। আর যে প্রার্থী নয়, তাকে উপদেশ প্রদান মানদুব তথা নফল। যেহেতু তা ভাল কাজের পথ প্রদর্শনের অন্তর্গত।
فَشَمِّتْهُ কোন কোন বর্ণনায় الشين এর স্থলে السين দ্বারা বলা হয়েছে। অর্থাৎ হাঁচি দেয়া ব্যক্তির জন্য আল¬াহর নিকট দোয়া করা।
فَعُدْهُ অর্থাৎ অসুস্থ মুসলমানের সাথে সাক্ষাত করে খোঁজ খবর গ্রহণ কর।
وَ إذَا مَاتَ فَاتَّبِعْهُ মুসলমানের মৃত্যুর সংবাদ পেলে তার নামাজে জানাজায় অংশগ্রহণ কর। এখানে আল¬াহর রাসূল উম্মতকে নামাজে জানাজায় অংশগ্রহণের প্রতি উৎসাহিত করেছেন।

Continue reading