ফিলিস্তীন : এক অন্তহীন কান্নার প্রস্রবণ


-আব্দু্ল্লাহ বিন আব্দুর রাযযাক

শুরুকথা : ভূমধ্যসাগর ও জর্ডান নদীর মধ্যবর্তী ভূখন্ড ফিলিস্তীন বা প্যালেস্টাইন মুসলিম, খৃষ্টান ও ইহুদী তথা সকল ধর্মাবলম্বীর নিকট একটি পবিত্র ভূমি। সুদীর্ঘ ইতিহাস বিজড়িত ফিলিস্তীন মধ্যপ্রাচ্য তথা বিশ্ব মানচিত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অঞ্চল। অথচ জর্ডান, লেবানন ও সিরিয়া বেষ্টিত এ ভূখন্ডের প্রতিটি বালুকণার সাথে মিশে আছে ছোপ ছোপ রক্ত। ক্রসেড যুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এই ছোট্ট অঞ্চলটি আজ ইসরাঈল নামক এক আস্ত হায়েনার করতলগত। গত ৬০ বছর থেকে ফিলিস্তীনীদের রক্ত নিয়ে হোলি খেলছে আমেরিকার অনৈতিক সমর্থনপুষ্ট ইসরাঈল। অন্যদিকে সারা বিশ্বের মোড়লরা কেউবা এ অন্যায়ের সহযোগিতা করছে, কেউবা কাপুরুষের ন্যায় চোখ বুজে সহ্য করছে এই হোলি খেলা। এ বছরের ৩১ মে সারা বিশ্বকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে এ ইহুদী রাষ্ট্রটি তার আসল চেহারা আরেকবার উন্মোচন করল। গাজার ক্ষুধার্ত-তৃষ্ণার্ত, ভুখা-নাঙ্গা মানুষের মুখে এক মুঠো আহার তুলে দেওয়ার জন্য রওয়ানা হয় তুর্কী ত্রাণবাহী জাহাজ ফ্রিডম ফ্লোটিলা মাভি মারমারা। গাজার উপকণ্ঠে পৌঁছার পূর্বেই ইসরাঈলী সন্ত্রাসীরা এই জাহাজে বর্বর হামলা চালিয়ে ৯ জন তুর্কী মানবাধিকার কর্মীকে হত্যা করে। এই গণহত্যা সারা বিশ্বের মানুষকে আরো একবার ইসরাঈল সম্পর্কে ভাবাতে শুরু করে।
ইহুদী জাতির পরিচয় :
ইসরাঈল রাষ্ট্র প্রসঙ্গে আলোচনার শুরুতেই ইহুদীদের সম্পর্কে বলা প্রয়োজন। কেননা ইহুদী রাষ্ট্র হিসাবেই ইসরাঈলের জন্ম। ইহুদীদের প্রধান নবী হলেন মূসা (আঃ), যার কিতাব হল তাওরাত। ইহুদীরা আল্লাহকে বিশ্বাস করে, যার নাম তাদের কাছে জেহোভা। এখান থেকেই ইহুদী নামের উৎপত্তি। কারো মতে, ইহুদীদের অপর নাম বনী ইসরাঈল। ইসরাঈল মূলত ইয়াকুব (আঃ)-এর অপর নাম। তাঁর মোট ১২ জন সন্তান ছিল। ১২ ভাইয়ের বড় ইয়াহুদার নামানুসারেই বনী ইসরাঈলকে ‘ইহুদী’ বলা হয়। বনু ইসরাঈলরা পথভ্রষ্ট হয়ে গেলে আল্লাহ তাদের হেদায়াতের জন্য মূসা (আঃ)-কে তাওরাত সহ প্রেরণ করেন। বনী ইসরাঈলের উপর আল্লাহ্র ছিল অগণিত নিয়ামত, অফুরন্ত অনুগ্রহ। পবিত্র কুরআনে প্রায় ৪৩টি স্থানে বনী ইসরাঈলের আলোচনা রয়েছে। তন্মধ্যে প্রায় ১৬টি স্থানে বনু ইসরাঈলের উপর আল্লাহ প্রদত্ত নে‘আমতরাজির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আর যখন আমি সমুদ্রকে পৃথক করে দিলাম অতঃপর তাদেরকে রক্ষা করলাম এবং ফেরাঊনকে ডুবিয়ে দিলাম’ (বাক্বারাহ ৫০)। তাদেরকে প্রদত্ত আরো নে‘আমতসমূহ যেমন- রাজাধিপতির মর্যাদা প্রদান (মায়েদাহ ৬০),  রিযিক প্রদান  (জাছিয়া ১৬), তীহ প্রান্তরে ছায়া ও খাবারের ব্যবস্থা (বাক্বারাহ ৫৭), পানির ব্যবস্থা (বাক্বারাহ ৬০)
এছাড়াও আল্লাহ তা‘আলা তাদের উপর আরো অনেক অনুগ্রহ করেছেন। যেমন- গো-বৎসের পূজা করার পরও আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দেন’ (বাক্বারাহ ৫১-৫২)। বজ্রপাতে মৃত্যু ঘটানোর পর তাদেরকে আবার পুনর্জীবন দান করেন’ (বাক্বারাহ ৫৫)। এ রকম আরো অভাবনীয়, আশাতীত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নে‘আমতরাজি দিয়ে আল্লাহ ইহুদীদের মান-মর্যাদা, প্রভাব-প্রতিপত্তি, শান-শওকত বৃদ্ধি করেছেন।

Continue reading

ডা. জাকির নায়েক : এক নবদিগন্তের অভিযাত্রী


-আহমাদ আব্দুল্লাহ নাজীব

ডা. জাকির আব্দুল করীম নায়েক ইসলাম ও তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের উপর বর্তমান বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম গবেষক ও বাগ্মীদের অন্যতম। অনন্যসাধারণ প্রতিভাধর ‘দাঈ ইলাল্লাহ’ হিসাবে তিনি সারাবিশ্বে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেছেন। গত শতকের মধ্যভাগে ভারতীয় বংশোদ্ভূত দক্ষিণ আফ্রিকান নাগরিক শায়খ আহমাদ দীদাত (১৯১৮-২০০৫) বিভিন্ন ধর্ম ও বস্ত্তগত বিজ্ঞানের সাথে তুলনামূলক আলোচনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে ইসলাম প্রচারের এক নতুন ধারার প্রয়াস শুরু করেন। ডা. জাকির নায়েক এই ধারার সফল পরিণতিই কেবল দান করেননি; বরং মুসলিম সমাজে প্রচলিত নানাবিধ কুসংস্কার ও নবাবিষ্কৃত আচার-আচরণ তথা শিরক-বিদ‘আতের বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ গড়ে তোলার সুন্দর ও কার্যকর একটি ধারার সূচনা করেছেন। অতি অল্প সময়ে তিনি ‘পীস টিভি’র মত আন্তর্জাতিক স্যাটেলাইট প্রচারমাধ্যম ও একদল দক্ষ, নিষ্ঠাবান আলিম ও        চিন্তাবিদের সমন্বয়ে ইন্ডিয়ার বুকে যে বহুমুখী ইসলামী দা‘ওয়াহ সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেছেন তা এককথায় অভূতপূর্ব। নিম্নে তাঁর পরিচিতি ও দা‘ওয়াতী কার্যক্রম সম্পর্কে আলোকপাত করা হল-
১৮ অক্টোবর ১৯৬৫ সালে ভারতের মুম্বাই শহরে এক কনকানি১ মুসলিম পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন একজন মেডিকেল ডাক্তার। সেই সুবাদে মুম্বাইয়ের সেন্ট পিটারস স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা ও কিষাণচাঁদ কলেজে মাধ্যমিক শিক্ষা লাভের পর চিকিৎসাবিদ্যা অধ্যয়নের জন্য টপিওয়ালা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। অতঃপর  ১৯৯১ সালে এম.বি.বি.এস ডিগ্রী লাভ করে ডাক্তার হিসাবে কর্ণাটকে কর্মজীবন শুরু করেন। ছাত্রজীবনে তিনি বিখ্যাত শৈল্যবিদ ক্রিস বার্নাডের মত সার্জন হবার স্বপ্ন দেখতেন। শৈশব থেকে তোতলামিতে (stammering) আক্রান্ত থাকায় মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার কোন পরিকল্পনা তাঁর মোটেই ছিল না। কিন্তু ১৯৮৭ সালে ২২ বছর বয়সে একটি কনফারেন্সে তৎকালীন শ্রেষ্ঠ তুলনামূলক ধর্মতাত্ত্বিক আলোচক আহমাদ দীদাতের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হলে তিনি গভীরভাবে প্রভাবিত হন। ফলে তাঁর মাঝে ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের প্রবল স্পৃহা জাগ্রত হয়। এক নাগাড়ে তিনি পবিত্র কুরআনসহ বর্তমান বিশ্বের প্রধান প্রধান ধর্মের পবিত্র গ্রন্থসমূহ যেমন- খৃষ্টধর্মের কয়েক প্রকার বাইবেল, ইহুদী ধর্মের তাওরাত ও তালমূদ, হিন্দু ধর্মের মহাভারত, বেদ, উপনিষদ, ভগবতগীতাসহ অন্যান্য ধর্মগ্রন্থ গভীর মনোযোগ সহকারে পাঠ করা শুরু করেন এবং কয়েক বছরের মধ্যেই সেগুলো আয়ত্ব করে ফেলেন। অতঃপর ১৯৯১ সাল থেকে তিনি দাওয়াতী কর্মকান্ডে মনোনিবেশ করেন। পরবর্তীতে ডাক্তারী পেশা ছেড়ে দিয়ে একজন ফুলটাইম ধর্মপ্রচারক হিসাবে মুম্বাইসহ ইন্ডিয়ার বিভিন্ন প্রদেশে বক্তব্য প্রদান করতে শুরু করেন। আল্লাহ্র অশেষ রহমতে তাঁর মুখের জড়তা অর্থাৎ তোতলামীর ভাবও দিনে দিনে কেটে যায়। অতি দ্রুতই তিনি জনমনে বিপুল প্রভাব    বিস্তারে সক্ষম হন। ইন্ডিয়ার বাইরে বিভিন্ন দেশ থেকে তাঁর ডাক আসতে থাকে। আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে তাঁর দাওয়াতী কার্যক্রম বিস্তৃত করার লক্ষ্যে বক্তৃতার ভাষা হিসাবে ইংরেজী বেছে নেন। ইতিমধ্যে আমেরিকা, ইংল্যান্ড, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ইতালী, সঊদী আরব, আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, ওমান, দক্ষিণ আফ্রিকা, বোতসোয়ানা, মৌরিশাস, গায়ানা, ত্রিনিদাদ, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, শ্রীলংকা, মালদ্বীপসহ বিশ্বের অনেকগুলো দেশে ১৩০০-এরও অধিক লেকচার প্রদান করেছেন। ২০০টিরও বেশী দেশের টিভি চ্যানেলে তাঁর বক্তব্যসমূহ প্রচারিত হয়েছে। এ দিক দিয়ে বর্তমান বিশ্বে ইসলামী আলোচকদের মধ্যে তাঁর অবস্থান প্রশ্নাতীতভাবে শীর্ষে। ২০০৯ সালে ইন্ডিয়ার সর্বাধিক প্রভাবশালীদের তালিকায় তার নাম ছিল ৮২তম স্থানে ও ১০ জন শীর্ষ ধর্মবেত্তাদের তালিকায় বাবা রামদেব ও শ্রী শ্রী রবিশংকরের পরই ছিল তার অবস্থান।

Continue reading

মিসকীন ওবামা, ভিকটিম ওসামা, সাবধান বাংলাদেশ


(১) মিসকীন ওবামা, ভিকটিম ওসামা, সাবধান বাংলাদেশ


জনগণের আশা-আকাংখার প্রতীক হয়ে আমেরিকার ক্ষমতায় এলেন বরাক হোসায়েন ওবামা। তাঁর কথায় ও আচরণে মুগ্ধ হয়ে আন্তর্জাতিক নোবেল কমিটি তাঁকে অল্প দিনের মধ্যেই শান্তিতে ‘নোবেল’ পুরস্কারে ভূষিত করলেন। কিন্তু ব্যক্তি হিসাবে তিনি যত ভাল মানুষই হন না কেন, আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি ও তার শোষণবাদী পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক পলিসির কোন পরিবর্তন হয়নি। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘সূদের চূড়ান্ত পরিণতি হ’ল নিঃস্বতা’ (ইবনু মাজাহ, মিশকাত হা/২৮২৭)। আমেরিকা এখন সেই পরিণতিতে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। ইতিমধ্যে তাদের ৩৩১টি ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে গেছে। হাযার হাযার কর্মচারী-কর্মকর্তা চাকুরী হারিয়েছেন। এমনকি এ মাসেই খোদ নিউইয়র্ক সিটিতে ছয় হাযার শিক্ষক চাকুরী হারাতে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যেই সেদেশে প্রতি ৭ জনের মধ্যে ১ জন হতদরিদ্র। আমেরিকার এখন নাভিশ্বাস উঠে গেছে। তাই চিরবৈরী গণচীনের কাছে তাকে হাত পাততে হয়েছে। তাদের কাছে সে এখন তিন হাযার বিলিয়ন ডলারের বিশাল অংকের ঋণের জালে আবদ্ধ। ইরাক ও আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার, গুয়ান্তানামো বে কারাগার বন্ধ, দেশের অর্থনৈতিক মন্দা দূরীকরণ প্রভৃতি কোন নির্বাচনী ওয়াদাই ওবামা পূরণ করতে পারেননি। এদিকে চার বছরের মেয়াদও শেষের পথে। ঐতিহ্য অনুযায়ী আগামী ২০১২ সালের নির্বাচনে তাঁকে দ্বিতীয় মেয়াদে জিততে হবে। নইলে বড়ই লজ্জার কারণ হবে। কেননা এটাই সেদেশের ভাল প্রেসিডেন্টদের নিদর্শন। ওবামা তাই এখন বড়ই মিসকীন।
একদিকে অর্থনীতি উদ্ধার অন্যদিকে ক্ষমতা উদ্ধার। দু’দিকেই সামাল দেবার জন্য তিনি তাঁর পূর্বের প্রেসিডেন্ট বুশের পথ ধরেছেন। তিনি তাঁর সময়ে অর্থনীতি ও রাজনীতি উদ্ধারের জন্য দু’টি নোংরা পলিসি গ্রহণ করেছিলেন। এক- মুসলিম বিশ্বের তৈল সম্পদ লুট করা এবং দুই- মুসলিম সংস্কারবাদী আন্দোলনগুলিকে সন্ত্রাসী ও জঙ্গীবাদী আন্দোলন হিসাবে বদনাম করা ও তাদেরকে উৎখাত করা।
ইংরেজরা ইতিপূর্বে বিশ্ব শোষণ করেছে। ইংল্যান্ড ও আমেরিকা তাদেরই দেশ। ভারতবর্ষ ছিল তাদের এককালের শোষণভূমি। তাই সে তার প্রতিদ্বন্দ্বী রাশিয়াকে আফগানিস্তানে দেখে ঝাঁপিয়ে পড়ল এখানে। আফগানীদের ইসলামী জোশকে কাজে লাগালো অর্থ দিয়ে অস্ত্র দিয়ে। সঊদী আরবের বিখ্যাত নির্মাণ প্রতিষ্ঠান বিন লাদেন কোম্পানী-র অন্যতম উত্তরসুরী প্রকৌশলী উসামাকে একাজে লাগানো হ’ল। প্রায় দশ বছরের (১৯৭৯-৮৯) রক্তক্ষয়ী লড়াই শেষে রাশিয়া বিতাড়িত হ’ল। তালেবান নেতাদের হোয়াইট হাউজে ডেকে নিয়ে উষ্ণ অভ্যর্থনা দেওয়া হ’ল। কিন্তু বাগে ফিরলো না তালেবানের ইসলামী সরকার। তারা আফগানিস্তানের সম্পদ অন্যকে দেবে না। নিজেদের সম্পদ নিজেদের বিধ্বস্ত দেশকে গড়ে তোলার কাজে ব্যয় করবে। স্বার্থে আঘাত লাগলো। অতএব এবার তালেবান সরকার উৎখাতের পালা। গণতন্ত্রের সুড়সুড়ি দিয়ে বিরোধী দলগুলির মাধ্যমে সে কাজ সারা হ’ল। পুতুল সরকার ক্ষমতায় এলো। এবার রাতারাতি তালেবান হ’ল সন্ত্রাসী দল। ওসামা ও মোল্লা ওমর হ’লেন বিশ্বের সেরা জঙ্গী। অতঃপর সরাসরি হামলার অজুহাত সৃষ্টি করা হ’ল। ৯/১১-এর নাটক মঞ্চস্থ হ’ল। তিন হাযার লোক মারা গেল। কিন্তু ১৩০০ ইহুদী কর্মকর্তা-কর্মচারীর কেউ ঐদিন কাজে গেল না। এমনকি ইসরাঈলী প্রধানমন্ত্রীর আগের দিনের সফর বাতিল করা হ’ল। ঘটনার সাথে সাথে ওসামা বিন লাদেনকে দায়ী করে প্রেসিডেন্ট বুশ বিবৃতি দিলেন। অথচ ওসামার ওয়েব সাইটে ১১-২৪ সেপ্টেম্বর ১৩ দিনের মধ্যে ৪ বার ঘোষণা এল যে, তিনি বা তার সংগঠন এতে জড়িত নয়। এই মর্মান্তিক ট্রাজেডীর তদন্ত রিপোর্ট আজও প্রকাশিত হয়নি। অথচ ঘটনার মাত্র ২৮ দিনের মাথায় ২০০১ সালের ৭ই অক্টোবর আফগানিস্তানে সরাসরি হামলা করল আমেরিকা ও ন্যাটো জোট। আফগানিস্তানকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হ’ল। কিন্তু ওসামাকে পাওয়া গেল না। শোষণ-শাসন দু’টিই চলতে থাকল। ৩ বছর ৯ মাস পর ২০০৫ সালের ১৯ জুন বুশ-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি বললেন, ওসামা বিন লাদেনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কার্যকলাপের কোন অকাট্ট প্রমাণ মার্কিন প্রশাসনের কাছে নেই। সে জন্যই তিনি কোন এলাকায় আছেন, সে সম্পর্কে একটা প্রাথমিক ধারণা থাকা সত্ত্বেও তারা তাকে গ্রেফতার করতে পারছেন না। কারণ গ্রেফতার করলে তার বিরুদ্ধে মামলা করতে হবে। সেই মামলায় সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারলে তাকে মুক্তি দিতে হবে’। প্রশ্ন হ’ল, সন্ত্রাসের সাথে যুক্ত থাকার কোন প্রমাণ না থাকলে কিসের ভিত্তিতে তারা আফগানিস্তানের মত একটা স্বাধীন দেশের উপর হামলা চালালো? জবাব রয়েছে তাদের কাছেই। ২০০৫ সালের ২৮শে অক্টোবর ভার্জিনিয়ার সেনা সদরে দেয়া ভাষণে প্রেসিডেন্ট বুশ বলেছিলেন, বিগত শতাব্দীর পতিত সমাজতন্ত্রের মতোই বর্তমান শতকে ইসলামী মৌলবাদ বিশ্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। … একে অবশ্যই নিশ্চিহ্ন করতে হবে’।

Continue reading

পুঁজিবাদের চূড়ায় ধ্বস


(১) পুঁজিবাদের চূড়ায় ধ্বস
Occupy Wall Street বা ‘ওয়াল স্ট্রীট দখল করো’ শ্লোগান দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু শিক্ষার্থী ও সদ্য পাস করা বেকার যুবক গত ১৭ই সেপ্টেম্বর ’১১ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক রাজধানী নিউইয়র্কের রাস্তায় যে আন্দোলন শুরু করেছিল, তা মাত্র এক মাসের ব্যবধানে গত ১৫ই অক্টোবর বিশ্বের ৮২টি দেশের ৯৫১টি শহরে বিক্ষোভ আকারে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে লন্ডনের ধনীরা এখন দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা করছে। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, জাপান সর্বত্র হাযার হাযার মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে। তাদের একটাই ক্ষোভ ৯৯ শতাংশ মানুষের রূযী মাত্র ১ শতাংশ মানুষ ভোগ করছে। মুনাফালোভী ব্যাংকার ও ধনী রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে সারা পৃথিবী যেন একসাথে ফুঁসে উঠেছে। বিশ্ব পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে  এটি এখন টাইম বোমায় রূপ নিয়েছে।
এটা কি একদিনে হয়েছে? এটা কি কোন সাময়িক ইস্যু? না, বরং এটি শত বছরের ধূমায়িত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী ও বিশ্বজনীন ইস্যু। যেখানেই পুঁজিবাদ, সেখানেই এ ক্ষোভ অবশ্যই থাকবে। পুঁজিবাদী ধনিক শ্রেণী বিভিন্ন নিয়ম-কানূন তৈরী করে দু’হাতে অপরের ধন লুট করছে। আর একে আইনসম্মত ও নিরাপদ করার জন্য তাদের অর্থে ও তাদের স্বার্থে গড়ে উঠেছে দেশে দেশে বিভিন্ন নামে শোষণবাদী রাজনৈতিক ব্যবস্থা সমূহ। মানুষ কেবল ক্ষোভ প্রকাশ করতে পারে। কিন্তু এ থেকে মুক্তির পথ তারা জানে না। তাই দেখা যায় নানা মুণির নানা মত। হাঁ মানুষের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ এ থেকে মুক্তির পথ বাৎলে দিয়েছেন। যেটি হ’ল ছিরাতে মুস্তাক্বীম বা সরল পথ। মানুষকে অবশ্যই সে পথে ফিরে যেতে হবে, যদি তারা শান্তি চায়। আসুন একবার ফিরে তাকাই সেদিকে।
ভোগ ও ত্যাগ দু’টিই মানুষের স্বভাবসিদ্ধ বিষয়। দু’টির সুষ্ঠু সমন্বয়ে মানুষের জীবন শান্তিময় হয়। কিন্তু কোন একটিকে বেছে নিলে জীবন হুমড়ি খেয়ে পড়ে। ব্যক্তির সীমাহীন ভোগবাদিতা ও লাগামহীন ধনলিপ্সাকে নিরংকুশ করা ও সম্পদ এক হাতে কুক্ষিগত করাই হ’ল পুঁজিবাদী অর্থনীতির মূলকথা। এর বিপরীতে ব্যক্তিকে মালিকানাহীন ও সম্পদহীন করে আয়-উপাদানের সকল উৎস সমাজ বা রাষ্ট্রের হাতে তুলে দেওয়াই হ’ল সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির মূলকথা। বুঝাই যাচ্ছে যে, দু’টিই মানুষের স্বভাব বিরোধী ও চরমপন্থী মতবাদ এবং কোনটিই সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষের কল্যাণবহ নয়। ফলে যা হবার তাই হচ্ছে। পুঁজিবাদী বিশ্বের মানুষ যেমন ফুঁসে উঠেছে, কম্যুনিষ্ট চীনের লৌহশৃংখলে আবদ্ধ মানুষ তেমনি কোন পথ না পেয়ে এখন আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। ফলে আত্মহত্যা প্রবণ দেশসমূহের তালিকায় চীন পৃথিবীতে শীর্ষে অবস্থান করছে। অন্যদিকে সমাজবাদী রাশিয়ায় ভিক্ষুকের সংখ্যা দুনিয়ায় সবচাইতে বেশী।
উপরোক্ত দুই চরমপন্থী অর্থনীতির বাইরে সুষম অর্থনীতি এই যে, মানুষ তার মেধা ও যোগ্যতা অনুযায়ী সম্পদ উপার্জন করবে এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত বণ্টন করবে। এর ফলে সমাজে অর্থের প্রবাহ সৃষ্টি হবে। ধনী ও গরীবের বৈষম্য হরাস পাবে। প্রতিটি পরিবার সচ্ছল হবে। সমাজে কোন বেকার ও বিত্তহীন থাকবে না। সর্বত্র সুখ ও শান্তি বিরাজ করবে। এই আয় ও ব্যয়ের নীতিমালা মানুষ নিজে তৈরী করবে না। বরং আল্লাহ প্রেরিত অভ্রান্ত ও অপরিবর্তনীয় বিধান সমূহ সে মেনে চলবে। আল্লাহর বিধান সকল মানুষের জন্য সমান। তাই তা অনুসরণে সমাজে সৃষ্টি হবে বৈষম্যহীন ও সকলের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং সত্যিকার অর্থে একটি মানবিক অর্থ ব্যবস্থা। যেখানে ধনী তার বিপদগ্রস্ত ভাইয়ের জন্য নিঃস্বার্থভাবে অর্থ ব্যয় করবে। গরীব তার ধনী উপকারী ভাইয়ের জন্য জীবন দিতে প্রস্ত্তত থাকবে। সকলে হবে সকলের তরে। কেউ হবেনা কেবল নিজের তরে। এই অর্থনীতিই হ’ল ইসলামী অর্থনীতি। যা যথাযথভাবে অনুসরণের ফলে সূদী শোষণে জর্জরিত আরবীয় সমাজ খেলাফতে রাশেদাহর প্রথম দশ বছরের মধ্যেই এমনভাবে দারিদ্র্যমুক্ত হয় যে, যাকাত নেওয়ার মত কোন লোক খুঁজে পাওয়া যেত না। আজও তা সম্ভব, যদি না মুসলিম রাষ্ট্রগুলি তা সঠিকভাবে বাস্তবায়নে আন্তরিক হয়।

Continue reading

প্যালেস্তাইন: রাষ্ট্র?


তেষট্টি বৎসর কম সময় নহে। দীর্ঘ এই সময়-পরিসরে বিশ্ব-রাজনীতির যে সমস্যা সমাধানের কোনও রাস্তা বা চিহ্ন মিলে নাই, বরং প্রত্যহ গভীর হইতে গভীরতর হইয়াছে, তাহা প্যালেস্তাইন-ইজরায়েল সংঘর্ষ। পশ্চিম এশিয়া হইতে শুরু করিয়া সমগ্র এশিয়া, এমনকী ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা পর্যন্ত এই সংকটের আঁচ তীব্র দীপ্যমান। রক্তবীজের ন্যায় এই সংকট বিশ্ব জুড়িয়া আরও অসংখ্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমস্যা তৈরি করিয়া তুলিয়াছে। তেষট্টি বৎসর পরেও প্রত্যহ ইজরায়েল কিংবা প্যালেস্তাইনে নিরীহ নাগরিকরা প্রাণ হারাইতেছেন, এ দিকের বিদ্রোহী জঙ্গিবাহিনী কিংবা ও দিকের রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনীর অন্তহীন দাপটের সামনে। কোনও ভাবে এই প্রাণহানির স্রোত থামানোর প্রয়াস রাষ্ট্রপুঞ্জ কিংবা যে কোনও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মঞ্চের একটি প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত, সন্দেহ নাই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া কিংবা চিনের মতো শক্তিধর দেশগুলির কূটনৈতিক বৈঠকে অন্যতম প্রধান আলোচ্য হওয়া উচিত, সন্দেহ নাই। কিন্তু তেষট্টি বৎসরের এই ক্রমাগত মূল্য দিবার পরও বিশ্বের প্রধান দেশগুলির সেই বোধ যথেষ্ট পরিমাণে জাগ্রত হইয়াছে কি? উত্তর মিলে না।
প্রশ্নটি নূতন করিয়া উঠিতেছে সাম্প্রতিক একটি প্রয়াসের পরিপ্রেক্ষিতে। প্যালেস্তাইনের প্রতিনিধিগণ আপাতত ‘রাষ্ট্র’ পদমর্যাদা পাইবার লক্ষ্যে রাষ্ট্রপুঞ্জের দ্বারস্থ হইয়াছেন। গত মাসের শেষে নিউ ইয়র্কে রাষ্ট্রপুঞ্জের অধিবেশনে তাহা আলোচিত হইয়াছে। দেখা গিয়াছে, যেহেতু ইতিমধ্যেই শতাধিক দেশ প্যালেস্তাইনকে পৃথক রাষ্ট্র হিসাবে মানিয়া লইয়াছে, রাষ্ট্রপুঞ্জে এই প্রস্তাব পাশ হইয়া যাইবার সম্ভাবনা উজ্জ্বল। এমতাবস্থায় বাদ সাধিতেছে আমেরিকা। ইহুদি-প্রভাবিত এই দেশ জানাইয়াছে তাহারা প্রস্তাবের বিরোধী, প্রয়োজনে ‘ভেটো’ ক্ষমতার ব্যবহার করিয়া তাহারা প্রস্তাব আটকাইবে। জানা গিয়াছে যে সংঘর্ষ-অধ্যুষিত এই অঞ্চলে যে পরিমাণ ত্রাণসাহায্য পাঠানো হয়, প্রস্তাব না তুলিয়া লইলে সেই সব সাহায্য তৎক্ষণাৎ বন্ধ হইবে। ইজরায়েলি প্রেসিডেন্ট নেতানিয়াহু স্বয়ং প্রস্তাব আটকাইবার লক্ষ্যে নিউ ইয়র্ক আসিয়া তদ্বির করিয়াছেন যেন এই স্বীকৃতির দ্বারা এত দিনের একটি জটিল সমস্যাকে জটিলতর না করা হয়, যেন এই সুযোগে প্যালেস্তিনীয় জঙ্গিদের হাতে ইজরায়েলি শান্তি ও স্থিতি আরও ধ্বস্ত হইতে না দেওয়া হয়!
যুক্তিটি শুভবোধসম্পন্ন বলা যায় না। বহু রক্তক্ষয় ও ধ্বংসের পর আজ রাষ্ট্রপুঞ্জের কূটনৈতিক পথে যে মীমাংসার সন্ধান হইতে বসিয়াছিল, তাহা আটকাইয়া পশ্চিমি শক্তিগুলি ঠিক কী আশা করিতেছে, স্পষ্ট নহে। যে প্যালেস্তাইনকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইজরায়েল প্রতিষ্ঠার সময়ই রাষ্ট্রত্ব প্রদান করা সম্ভব ও উচিত ছিল, আজ তেষট্টি বৎসর পরেও সেই রাষ্ট্রত্বের সম্ভাবনা বিনষ্ট করিয়া কোন্ লাভ হইবে? পৃথিবীর অন্যতম ভয়াবহ উৎখাত-কাহিনি প্যালেস্তাইনেই ঘটিয়াছিল। সেখানকার উপযুর্পরি কয়েক প্রজন্মের উপর যে অবিচার সাধিত হয়, এ হেন সমাধান ভিন্ন আর কোনও ভাবেই কি সেই বিক্ষুব্ধ জনগোষ্ঠীর আস্থা অর্জন করিবার আশা রাখা সম্ভব? প্যালেস্তাইন অথরিটির ভারবাহক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস ঠিকই বলিয়াছেন, এই মুহূর্তে কূটনৈতিক পথের উপর আস্থা না রাখিতে পারিলে আবারও রক্তবন্যার ধারা অঝোরে খুলিয়া দিবার বন্দোবস্ত সম্পন্ন হইবে। প্রেসিডেন্ট ওবামার সদিচ্ছা লইয়াও সংশয় প্রকাশ করিয়াছেন প্রেসিডেন্ট আব্বাস। বিশ্বের অধিকাংশ দেশ যখন প্যালেস্তাইনকে স্বীকৃতি দিয়াছে, তখন তাহার রাষ্ট্র-অধিকার প্রাপ্তির পথে ভেটো প্রয়োগ করিলে ওবামার সদিচ্ছা বিষয়ে সেই সংশয় কিন্তু দুনিয়াময় প্রতিষ্ঠিত হইবে। ওবামার সামনে এখন দুইটি পথ: মার্কিন দেশের অভ্যন্তরীণ চাপের সামনে নতজানু হইয়া দুনিয়াময় এই সংশয় ছড়াইয়া দেওয়া, কিংবা কঠিন সিদ্ধান্ত লইয়া দীর্ঘদিনের বিশ্বরাজনীতির এই রক্তাক্ত ক্ষতের উপশমের প্রয়াস করা। কোন পথটি শ্রেয়?

আনন্দবাজার পত্রিকার ৮ অক্টবার’ ২০১১ এর সম্পাদকীয়।

******************

আপনি কি কখনো ইসলামের স্বার্থে ত্যাগ স্বীকার করেছেন?


DOWNLOAD THIS ARTICLE(414kb only)

আমি এই নিবন্ধটি শুরু করছি একটি প্রশ্ন দ্বারা,
আমরা কি ইসলামের স্বার্থে কখনো ত্যাগ স্বীকার করেছি?
আমাদের পছন্দনীয় কোন কিছু বিসর্জন দিয়েছি?
আমাদের ভালোবাসার কোন কিছু ছেড়ে দিয়েছি?
ইসলামের জন্য এমন কোন কিছু ত্যাগ করেছি যা আমরা সঞ্চিত করে রেখেছিলাম?

যাহোক, সরল ভাষায় বললে; ইসলামের কল্যাণের জন্য আমরা কি কখনো অর্থ খরচ করেছি যা আপেক্ষিকভাবে কম পরিমাণের না? ধরা যাক, শুক্রবার দিন জুমু’আর সালাত আদায়ের সময় যখন আমাদের সামনে একটি দান বাক্স চলে আসে, আমরা তখন কি করব? কি পরিমাণ অর্থ আমরা ঐ বাক্সে রাখব? ১০ ডলার? ৫ ডলার? ১ ডলার এমনটি ৫০ সেন্ট?

  • এমন অনেক জিনিসই আমাদের জীবনে রয়েছে যা আমরা মিস করেছি। আমাদের জীবন যা এখনো অনেক তরুণ, আমরা মনে করি যে আমাদের দ্বীনের জন্য ত্যাগ করার প্রয়োজন নেই। বরঞ্চ, আমরা এই দ্বীনের বাইরের জিনিসের ব্যাপারে ত্যাগ করার দিকে আগ্রহী। যেমনঃ বন্ধুত্বের জন্য ত্যাগ স্বীকার, দলের জন্য ত্যাগ স্বীকার, বন্ধুদের জন্য ত্যাগ স্বীকার, ভালোবাসার মানুষের জন্য ত্যাগ স্বীকার এমনকি এমন কোন কিছুর জন্য ত্যাগ স্বীকার যেটা কিনা নিতান্তই কৌতুকপূর্ণ। এইগুলোর জন্য ত্যাগ স্বীকার অনেক সহজ মনে হয়। কিন্তু ইসলামের স্বার্থে ত্যাগ স্বীকার করাটাকে অনেক ভারী মনে হয়।আমাদের এখনো মনে আছে যে হযরত ইবরাহীম (আঃ) কত উদার ব্যক্তি ছিলেন, তিনি আল্লাহর জন্য নিজের বৎসকেও জবেহ্ করার ইচ্ছা করেছিলেন। একটি সন্তানের জন্য আকুল এক পিতা, যিনি কিনা আল্লাহর উদ্দেশ্যে সেই পুত্রকে উৎসর্গ করতে ইচ্ছুক ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে, এটাই হল সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার।

নিশ্চয় ইব্রাহীম ছিলেন এক সম্প্রদায়ের প্রতীক, সবকিছু থেকে মুখ ফিরিয়ে এক আল্লাহরই অনুগত এবং তিনি শেরককারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।(সূরা নাহলঃ১২)

আরেকটি আয়াতে আল্লাহ্ বলেন, তোমরা যারা আল্লাহ ও পরকাল প্রত্যাশা কর, তোমাদের জন্য তাদের মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে। আর যে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার জানা উচিত যে, আল্লাহ বেপরওয়া, প্রশংসার মালিক।(সূরা মুমতাহিনাঃ৬)

হযরত ইবরাহীম (আঃ) আমাদের সামনে এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁর ত্যাগ স্বীকারের স্পৃহা তেমনই মহান ছিল যেমনটি ছিল ইসলামের প্রতি তাঁর ভালোবাসার স্পৃহা। সেই স্পৃহাটাই আজ আমাদের মধ্যে অনুপস্থিত।

Continue reading

কুরবানী : ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি


ক্বামারুয্যামান বিন আব্দুল বারী

উপক্রমণিকা :
আল্লাহর নৈকট্য, আত্মত্যাগ, আত্মোৎসর্গ, ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্য, সাম্য, মৈত্রী, সম্প্রীতির সুমহান মহিমায় ভাস্বর কুরবানী। কুরবানী আমাদের আদি পিতা আদম (আঃ) ও তদীয় পুত্র হাবিল-কাবীল এবং মুসলিম জাতির পিতা ইবরাহীম (আঃ) ও তদীয় পুত্র ইসমাঈল (আঃ)-এর সুমহান আত্মত্যাগ এবং আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা-ভরসা ও জীবনের সর্বস্ব সমর্পণের মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য লাভের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সমন্বয়।
কুরবানীর আভিধানিক অর্থ :
আরবী قرب বা قربان শব্দটি উর্দূ ও ফার্সীতে قربانى (কুরবানী) রূপে রূপান্তরিত হয়েছে। যার অর্থ, নৈকট্য, সান্নিধ্য। পবিত্র কুরআন ও হাদীছে এর কয়েকটি সমার্থক শব্দ পরিলক্ষিত হয়। যেমন-
(১) نحر অর্থে। যেমন- আল্লাহ রাববুল আলামীনের বাণী فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ ‘সুতরাং আপনি আপনার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে ছালাত আদায় করুন এবং কুরবানী করুন’ (কাওছার ২)। এই অর্থে কুরবানীর দিনকে يوم النحر বলা হয়।
(২) نسك অর্থে। যেমন- মহান আল্লাহর বাণী- قُلْ إِنَّ صَلاَتِيْ وَنُسُكِيْ وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِيْ لِلّهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ- ‘আপনি বলুন, আমার ছালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন, আমার মরণ সবই বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য নিবেদিত’ (আন‘আম ১৬২)
(৩) منسك অর্থে। যেমন আল্লাহর বাণী- لِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنْسَكاً ‘আমি প্রত্যেক উম্মাতের জন্য কুরবানীর বিধান রেখেছি’ (হজ্জ ৩৪)
(৪) الاضحى অর্থে। হাদীছে এসেছে- এই অর্থে কুরবানীর ঈদকে عيد الاضحى বলা হয়।
কুরবানীর ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি :
বিশ্বের সকল জাতিই তাদের আনন্দ উৎসব প্রকাশের জন্য নির্দিষ্ট দিবস পালন করে থাকে। এ সকল দিবস স্ব স্ব ধর্মের কোন উল্লেখযোগ্য ঘটনা অথবা কারো জন্ম বা মৃত্যু দিন অথবা কোন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে নির্ধারিত হয়েছে। এসব দিবসে প্রত্যেক জাতি তাদের ধর্মীয় ঐতিহ্য-সংস্কৃতি (Culture) ও বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটায়।
সারা বিশ্বের প্রায় দুই কোটি খৃষ্টান যীশুখৃষ্টের জন্মদিন উপলক্ষে ২৫ ডিসেম্বরকে তাদের উৎসবের (Xmas day) ‘বড় দিন’ হিসাবে পালন করে। প্রায় সত্তর পঁচাত্তর লাখ বৌদ্ধ গৌতম বুদ্ধের জন্মদিন উপলক্ষে ২২ মে কে তাদের উৎসবের দিন ‘শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমা’ হিসাবে পালন করে থাকে। সবচেয়ে বেশী উৎসবের দিন হ’ল হিন্দু জাতির। তারা ১২ মাসে ১৩টি উৎসব পালন করে থাকে। তবে এর মধ্যে লক্ষ্মীপূজা ও দুর্গাপূজা অত্যন্ত জাঁকজমকভাবে পালন করা হয়। সারা বিশ্বের প্রায় দেড়শ’ কোটি মুসলমান মাহে রামাযানের শেষে শাওয়ালের প্রথম তারিখে ঈদুল ফিতর এবং যিলহজ্জ মাসের ১০ তারিখকে ঈদুল আযহা বা কুরবানীর ঈদ হিসাবে পালন করে থাকে। মুসলমানদের এ কুরবানীর ঈদের রয়েছে একটি সুদীর্ঘ ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি।
Continue reading

রাসূল সাঃ-এর শেষ ভাষণ


দশম হিজরি। জিলহজ মাস। ২৩ বছর আগে হেরাগুহায় জ্বলে উঠেছিল সত্যের আলো। আজ তা পূর্ণতায় উপনীত। এক কঠিন দায়িত্ব নিয়ে তিনি প্রেরিত হয়েছিলেন এ পৃথিবীতে। ২৩ বছর কঠিন পরিশ্রম, সংগ্রাম, অপরীসীম কোরবানি ও ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছিল। তা আজ সমাপ্তির পথে। যে উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি প্রেরিত হয়েছিলেন মানুষের কাছে দূত হিসেবে তা আজ পূর্ণতার পথে। দীর্ঘ ২৩ বছর তিনি সাধনা করে একটি রাষ্ট্র গঠন করলেন। গঠন করলেন শোষণমুক্ত জুলুমহীন ন্যায়বিচারের সমাজ। গড়ে তুললেন তাওহিদভিত্তিক নব সভ্যতার এক নতুন জাতি­ মুসলিম উম্মাহ।

তাই নবী করীম সাঃ সঙ্গীসাথীসহ হজের উদ্দেশ্যে মক্কা নগরীতে গমন করেন এবং হজ সম্পাদন করেন। আজ লাখো কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক। আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে ইব্রাহীম আঃ ও ইসমাইল আঃ যেখানে দাঁড়িয়ে কাবার প্রাচীর নির্মাণ করেছিলেন সেখানে দাঁড়িয়ে এক মুসলিম উম্মাহ গঠনের জন্য মহান আল্লাহ তা’য়ালার দরবারে দোয়া করেছিলেন। মুসলমানরা আজ মাকামে ইবরাহীমে সমবেত। ৯ জিলহজ রাসূল সাঃ সব মানুষের সামনে দাঁড়ালেন। মহানবী সাঃ প্রথমে আল্লাহ তা’য়ালার প্রশংসা করলেন। এরপর তিনি তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ পেশ করলেন­ তিনি বললেন, সমবেত জনতা­
১. আজ সকল প্রকার কুসংস্কার অন্ধ বিশ্বাস এবং সকল প্রকার অনাচার আমার পদতলে দলিত-মথিত হয়ে গেল।

Continue reading