পুঁজিবাদের চূড়ায় ধ্বস


(১) পুঁজিবাদের চূড়ায় ধ্বস
Occupy Wall Street বা ‘ওয়াল স্ট্রীট দখল করো’ শ্লোগান দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু শিক্ষার্থী ও সদ্য পাস করা বেকার যুবক গত ১৭ই সেপ্টেম্বর ’১১ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক রাজধানী নিউইয়র্কের রাস্তায় যে আন্দোলন শুরু করেছিল, তা মাত্র এক মাসের ব্যবধানে গত ১৫ই অক্টোবর বিশ্বের ৮২টি দেশের ৯৫১টি শহরে বিক্ষোভ আকারে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে লন্ডনের ধনীরা এখন দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা করছে। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, জাপান সর্বত্র হাযার হাযার মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে। তাদের একটাই ক্ষোভ ৯৯ শতাংশ মানুষের রূযী মাত্র ১ শতাংশ মানুষ ভোগ করছে। মুনাফালোভী ব্যাংকার ও ধনী রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে সারা পৃথিবী যেন একসাথে ফুঁসে উঠেছে। বিশ্ব পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে  এটি এখন টাইম বোমায় রূপ নিয়েছে।
এটা কি একদিনে হয়েছে? এটা কি কোন সাময়িক ইস্যু? না, বরং এটি শত বছরের ধূমায়িত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী ও বিশ্বজনীন ইস্যু। যেখানেই পুঁজিবাদ, সেখানেই এ ক্ষোভ অবশ্যই থাকবে। পুঁজিবাদী ধনিক শ্রেণী বিভিন্ন নিয়ম-কানূন তৈরী করে দু’হাতে অপরের ধন লুট করছে। আর একে আইনসম্মত ও নিরাপদ করার জন্য তাদের অর্থে ও তাদের স্বার্থে গড়ে উঠেছে দেশে দেশে বিভিন্ন নামে শোষণবাদী রাজনৈতিক ব্যবস্থা সমূহ। মানুষ কেবল ক্ষোভ প্রকাশ করতে পারে। কিন্তু এ থেকে মুক্তির পথ তারা জানে না। তাই দেখা যায় নানা মুণির নানা মত। হাঁ মানুষের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ এ থেকে মুক্তির পথ বাৎলে দিয়েছেন। যেটি হ’ল ছিরাতে মুস্তাক্বীম বা সরল পথ। মানুষকে অবশ্যই সে পথে ফিরে যেতে হবে, যদি তারা শান্তি চায়। আসুন একবার ফিরে তাকাই সেদিকে।
ভোগ ও ত্যাগ দু’টিই মানুষের স্বভাবসিদ্ধ বিষয়। দু’টির সুষ্ঠু সমন্বয়ে মানুষের জীবন শান্তিময় হয়। কিন্তু কোন একটিকে বেছে নিলে জীবন হুমড়ি খেয়ে পড়ে। ব্যক্তির সীমাহীন ভোগবাদিতা ও লাগামহীন ধনলিপ্সাকে নিরংকুশ করা ও সম্পদ এক হাতে কুক্ষিগত করাই হ’ল পুঁজিবাদী অর্থনীতির মূলকথা। এর বিপরীতে ব্যক্তিকে মালিকানাহীন ও সম্পদহীন করে আয়-উপাদানের সকল উৎস সমাজ বা রাষ্ট্রের হাতে তুলে দেওয়াই হ’ল সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির মূলকথা। বুঝাই যাচ্ছে যে, দু’টিই মানুষের স্বভাব বিরোধী ও চরমপন্থী মতবাদ এবং কোনটিই সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষের কল্যাণবহ নয়। ফলে যা হবার তাই হচ্ছে। পুঁজিবাদী বিশ্বের মানুষ যেমন ফুঁসে উঠেছে, কম্যুনিষ্ট চীনের লৌহশৃংখলে আবদ্ধ মানুষ তেমনি কোন পথ না পেয়ে এখন আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। ফলে আত্মহত্যা প্রবণ দেশসমূহের তালিকায় চীন পৃথিবীতে শীর্ষে অবস্থান করছে। অন্যদিকে সমাজবাদী রাশিয়ায় ভিক্ষুকের সংখ্যা দুনিয়ায় সবচাইতে বেশী।
উপরোক্ত দুই চরমপন্থী অর্থনীতির বাইরে সুষম অর্থনীতি এই যে, মানুষ তার মেধা ও যোগ্যতা অনুযায়ী সম্পদ উপার্জন করবে এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত বণ্টন করবে। এর ফলে সমাজে অর্থের প্রবাহ সৃষ্টি হবে। ধনী ও গরীবের বৈষম্য হরাস পাবে। প্রতিটি পরিবার সচ্ছল হবে। সমাজে কোন বেকার ও বিত্তহীন থাকবে না। সর্বত্র সুখ ও শান্তি বিরাজ করবে। এই আয় ও ব্যয়ের নীতিমালা মানুষ নিজে তৈরী করবে না। বরং আল্লাহ প্রেরিত অভ্রান্ত ও অপরিবর্তনীয় বিধান সমূহ সে মেনে চলবে। আল্লাহর বিধান সকল মানুষের জন্য সমান। তাই তা অনুসরণে সমাজে সৃষ্টি হবে বৈষম্যহীন ও সকলের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং সত্যিকার অর্থে একটি মানবিক অর্থ ব্যবস্থা। যেখানে ধনী তার বিপদগ্রস্ত ভাইয়ের জন্য নিঃস্বার্থভাবে অর্থ ব্যয় করবে। গরীব তার ধনী উপকারী ভাইয়ের জন্য জীবন দিতে প্রস্ত্তত থাকবে। সকলে হবে সকলের তরে। কেউ হবেনা কেবল নিজের তরে। এই অর্থনীতিই হ’ল ইসলামী অর্থনীতি। যা যথাযথভাবে অনুসরণের ফলে সূদী শোষণে জর্জরিত আরবীয় সমাজ খেলাফতে রাশেদাহর প্রথম দশ বছরের মধ্যেই এমনভাবে দারিদ্র্যমুক্ত হয় যে, যাকাত নেওয়ার মত কোন লোক খুঁজে পাওয়া যেত না। আজও তা সম্ভব, যদি না মুসলিম রাষ্ট্রগুলি তা সঠিকভাবে বাস্তবায়নে আন্তরিক হয়।

রূযী হালাল না হলে ইবাদত  কবুল হয় না। এর দ্বারা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, অর্থব্যবস্থার সঙ্গে রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা ওৎপ্রোতভাবে জড়িত। সেকারণ পুঁজিবাদ কেবল অর্থনীতির নাম নয়, বরং একটি সমাজ ব্যবস্থার নাম। একই অবস্থা সমাজতন্ত্রের। উভয় সমাজ ব্যবস্থা স্ব স্ব আক্বীদা-বিশ্বাস অনুযায়ী পরিচালিত। ঐ দুই সমাজ ব্যবস্থায় মুনাফালোভী ব্যাংকার, মওজূদদার ব্যবসায়ী ও সূদী মহাজনদের প্রধান সহযোগী হ’ল শোষণবাদী ও ক্ষমতালোভী রাজনীতিকরা। এরা তাদের বশংবদ একদল বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষিত শ্রেণী গড়ে তোলে। যারা বিভিন্ন চটকদার মতবাদ তৈরী ও প্রচার করে সাধারণ মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুৎ করে। তারা তাদের সৃষ্ট ও পরিচালিত ব্যাংক-বীমা-ইনস্যুরেন্স ও নানাবিধ উপায়ে ব্যক্তিগতভাবে ও সমিতি করে কর্পোরেট বাণিজ্যের মাধ্যমে সমাজকে শোষণ করে এবং যাবতীয় আর্থিক উপায়-উপাদানকে নিজেদের করায়ত্ত করে। বর্তমানে বিশ্বায়নের ধুয়া তুলে তারা বিশ্ব শাসন ও শোষণে নেমেছে এবং একে একে বিভিন্ন দেশে তারা হামলা ও লুট করছে। এতে এক শতাংশ লোক সম্পদের পাহাড় গড়ছে। বাকীদের নাভিশ্বাস উঠছে। আজ তারই ফলশ্রুতিতে আমেরিকায় প্রতি ৬ জনে ১ জন ও ভারতে শতকরা ৭৭ জন দারিদ্র্যসীমার নীচে বসবাস করছে। ইংল্যান্ডে শতকরা মাত্র ৫ জন ব্যতীত বাকী সবাই অসুখী জীবন যাপন করছে। অথচ এইসব দেশেই বাস করে বিশ্বের সেরা ধনী ব্যক্তিরা।
আজ থেকে অর্ধশতাব্দীকাল পূর্বে পাশ্চাত্য অর্থনীতিবিদ কোলিন ক্লার্ক বলেছিলেন, বর্তমান পুঁজিবাদী সমাজে সর্বাপেক্ষা কম ও সর্বাপেক্ষা বেশী আয়ের শতকরা অনুপাত হ’ল গড়ে ১ : ২০ লক্ষ। এই আকাশ ছোঁয়া অর্থনৈতিক বৈষম্যের মধ্যে মানুষ কিভাবে বসবাস করে, ভাবতেও গা শিউরে ওঠে। পুঁজিবাদী শোষণের বিরুদ্ধে বহু রক্তের বিনিময়ে রাশিয়া ও চীনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তথাকথিত শোষণহীন সমাজবাদী অর্থনীতি। কিন্তু মাত্র কিছু দিনের মধ্যেই এর তিক্ত ফল সেদেশের মানুষ হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করে। একদিকে তারা মানুষের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা হরণ করে, অন্যদিকে তাদেরকে আয়-রোজগারহীন করে কার্যত: কারাবন্দীর অবস্থায় নিয়ে ফেলে। এর পরিণতিতে তাদের অর্থনৈতিক বৈষম্যের হার দাঁড়ায় অর্ধশতাব্দীকাল পূর্বের রাশিয়ার সরকারী রিপোর্ট অনুযায়ী ১ : ৩ লক্ষ। তাই বর্তমানে পুনরায় পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে যে বিশ্বজাগরণ দেখা যাচ্ছে, তা যদি ইসলামের দিকে ফিরে না এসে অন্যদিকে মোড় নেয়, তাহ’লে তার পরিণতি আরও ভয়াবহ হবে। তা মানুষকে তার কাংখিত সুখ কখনোই এনে দিতে পারবে না।
পুঁজিবাদী সমাজে বসবাস করে পূর্ণাঙ্গভাবে ইসলামী অর্থনীতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। তাই মুসলিম রাষ্ট্রগুলি এ ব্যাপারে আন্তরিক হ’লে তারাই বিশ্ব অর্থনীতির নিয়ামক হ’তে পারত। কিন্তু তাদের মধ্যে ছালাত-ছিয়াম-হজ্জ প্রভৃতি বিষয়ে যত না আগ্রহ আছে, নিজেদের রূযী হালাল করার ও দেশ থেকে দারিদ্র্য দূর করার ব্যাপারে সে তুলনায় বিন্দুমাত্র আন্তরিকতা নেই। বরং এ বিষয়ে তারা পুঁজিবাদী বিশ্বের শতভাগ অনুসারী। ফলে সারা জীবন ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে পাশ্চাত্যের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হচ্ছে। উন্নতির কোন লক্ষণ নেই।
ইসলামী অর্থনীতিতে সম্পদের প্রকৃত মালিক হলেন আল্লাহ। মানুষ হ’ল তার যামিনদার। তাই মানুষ তার ইচ্ছামত আয় ও ব্যয় করতে পারে না। এ অর্থনীতিতে হালাল ও হারামের বাধ্যবাধকতা রয়েছে এবং রয়েছে আবশ্যিক ও ঐচ্ছিক ধন বণ্টনের নীতিমালা। এ অর্থনীতি মানুষকে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী আনন্দের বিপরীতে আখেরাতের চিরস্থায়ী শান্তির প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। এ অর্থনীতি মানুষকে মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল বানায়। ফলে এ সমাজে কোন আর্থিক হানাহানি বা বাণিজ্য যুদ্ধ কিংবা কোনরূপ অসুস্থ প্রতিযোগিতা থাকে না। এ সমাজের মানুষ ভোগে নয়, বরং ত্যাগে তৃপ্তি পায়। দেশের শাসক ও ধনিক শ্রেণী কি এ ব্যাপারে আন্তরিক হতে পারেন? যদি না পারেন তাহ’লে ওয়াল স্ট্রীট দখলের ঢেউ এদেশে আছড়ে পড়বে না, তার নিশ্চয়তা কে দিবে? আল্লাহ আমাদের সহায় হৌন- আমীন!! [স.স.]

(২) চলে গেলেন আফ্রিকার সিংহ
সাদ্দাম, বিন লাদেন অতঃপর গাদ্দাফীকে হত্যা করল আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ। ওবামা হুমকি দিলেন পূর্বের ন্যায় এই বলে যে, আবারও প্রমাণিত হ’ল, ‘আমেরিকা যা চায় তাই করে’। শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ব্যক্তির এই দম্ভোক্তি আল্লাহ শুনেছেন ও দেখেছেন। নিশ্চয়ই আসমানী ফায়ছালা নেমে আসবে এ যুগের ফেরাঊনদের বিরুদ্ধে। তবে চলুন আমরা অতীত নিয়ে কিছু কথা বলি। (১) ১৯৬৭ সালের জুনে ইংল্যান্ডে সামরিক প্রশিক্ষণরত তরুণ ক্যাডেট মু‘আম্মার আল-ক্বাযযাফী (গাদ্দাফী) তার তিনজন সাথীকে নিয়ে লন্ডনের লেসাম্বাডর রেস্টুরেন্টের জুয়ার আড্ডায় দেখতে পান তার দেশের বাদশাহ ইদ্রীসের তৈল উপদেষ্টাকে এক ঘণ্টার মধ্যে দেড় লাখ পাউন্ড হারতে। আর তাকে অর্থের যোগান দিচ্ছে পাশে বসা গ্রীক জাহায কোম্পানীর এক মালিক। যিনি লিবিয়া থেকে তৈল নিয়ে তার জাহাযে করে ইউরোপে পেঁŠছে দিয়ে কোটি কোটি পাউন্ড শুষে নেন (২) ১৯৬৯ সালে তার নিজ জন্মস্থান সিরত বন্দর থেকে পাইপ লাইন বসিয়ে তৈল পরিবহনের শুরুতে বিদেশী অক্সিডেন্টাল কোম্পানীর আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বয়োবৃদ্ধ বাদশাহকে গার্ড অব অনার দেওয়ার অনুষ্ঠানে তিনি দেখতে পান দেশের মন্ত্রী ও সরকারী লোকদের চরম বিলাসিতা ও বিদেশী তোয়াজের মহড়া। অথচ তখন ত্রিপোলীর রাস্তায় চলত ছিন্ন পোষাক পরিহিত নগ্নপদ হাযার হাযার মানুষ। যখন ছিল না কোন উচ্চ শিক্ষার ব্যবস্থা, ছিল না যথেষ্টসংখ্যক হাসপাতাল। অথচ মন্ত্রীরা ঘন ঘন বিদেশে গিয়ে জুয়ার আসর মাত করত, আর দেশের টাকা লুট করে সুইস ব্যাংকে জমা করত (৩) ১লা সেপ্টেম্বর ’৬৯ বাদশাহ ইদ্রীস তখন রাষ্ট্রীয় সফরে তুরষ্কে। সুযোগ নিলেন গাদ্দাফী। কয়েকজন তরুণ সৈনিক বন্ধু মিলে এক রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করলেন। তখন তার বয়স মাত্র ২৭। ক্ষমতায় বসার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি আটক করলেন বাদশাহর সেই জুয়াড়ী তৈল উপদেষ্টাকে এবং অন্যান্য লুটেরা মন্ত্রী ও আমলাকে। (৪) কয়েকদিন পরে রাতের বেলায় ছদ্মবেশে ঢুকলেন রাজধানী ত্রিপোলীর এক নামকরা নৈশ ক্লাবে। মদে চুর নর্তকী ও তাদের ভোগকারীদের মাঝে দঁড়িয়ে হঠাৎ ছদ্মবেশ ফেলে বাঁশিতে ফুঁক দিলেন গাদ্দাফী। সাথে সাথে অপেক্ষারত সৈনিকেরা এসে দেড়শ’ নারী-পুরুষকে বন্দী করে নিয়ে গেল। ঐদিনের পর থেকে রাজধানীর সকল মদ্যশালা আপনা থেকেই বন্ধ হয়ে গেল যা গত ৪২ বছরে আর কখনো খোলা হয়নি (৫) কয়দিন পরে ছদ্মবেশে গেলেন এক হাসপাতালে। কোন ডাক্তার নেই। তার বারবার কাকুতি-মিনতিতে দয়াপরবশ হয়ে অবশেষে গল্পরত জনৈক নার্স বলল, তুমি কাল এসো’। ক্ষুব্ধ ব্যাঘ্র হুংকার দিয়ে বলে উঠলেন, আমি কালকে যখন আসব, তখন তোমরা কেউ আর এখানে থাকবে না, থাকবে জেলে’।
লিবীয় বিপ্লবের এই তরুণ ব্যাঘ্রের দুর্নীতি বিরোধী অভিযানের কথা বিদ্যুদ্বেগে ছড়িয়ে পড়ল সর্বত্র। মযলূম মানবতা তাকে ত্রাণকর্তা হিসাবে বরণ করে নিল। অফিস-আদালত ঘুষমুক্ত হ’ল, দেশ থেকে মদ দূর হ’ল, দুর্নীতি উঠে গেল। এবারে নযর দিলেন বিদেশী আমেরিকান ও বৃটিশদের দিকে। প্রথমে তিনি আমেরিকার ‘হুইলাস’ বিমান ঘাঁটি গুটিয়ে নেবার নির্দেশ জারি করলেন। রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে রইল সারা আরব জাহান। কিন্তু না। সে নির্দেশ যথাযথভাবে পালিত হ’ল। এরপর বৃটিশদের পালা। নির্দেশ পেয়ে তারাও বেনগাজীর সামরিক ঘাঁটি ছেড়ে গেল। এবারে পশ্চিমা প্রভাব দূরীকরণের দিকে মন দিলেন। সিনেমা-টিভিতে নগ্ন ছবি প্রদর্শন ও রাস্তায় নগ্ন মেয়েদের চলাফেরা বন্ধ হয়ে গেল। লিবিয়াকে তার নিজস্ব ইসলামী সংস্কৃতি অনুযায়ী গড়ে তোলার দৃঢ় পদক্ষেপ শুরু হয়ে গেল সর্বত্র। মনোযোগ দিলেন দেশের অর্থনীতির দিকে। আল্লাহর দেওয়া নে‘মত ভূগর্ভের তৈলভান্ডার যা এতদিন বিদেশীরা নামমাত্র মূল্যে লুট করছিল, তিনি তার মূল্য বাড়িয়ে দিলেন। ফলে দ্রুত লিবিয়ার চেহারা পরিবর্তন হয়ে গেল। ফলে গাদ্দাফী শাসনের প্রথমার্ধেই লিবিয়া পৃথিবীর অন্যতম ধনী দেশে পরিণত হ’ল।
(১) ইতিপূর্বে লিবিয়ার সাধারণ মানুষের কোন ঘর-বাড়ি ছিল না। তারা তাঁবুতে যাযাবর জীবন যাপন করত। গাদ্দাফী নিজেও সেভাবে থাকতেন। তেলের টাকা হাতে পেয়ে এবার তিনি লিবীয়দের জন্য গৃহনির্মাণ শুরু করলেন। একসময় তার পিতা তাকে নিজের জন্য একটি বাড়ী নির্মাণ করতে বললে তিনি বলেন, একজন লিবীয়র গৃহনির্মাণ বাকী থাকতে আপনার ছেলে নিজের জন্য কোন বাড়ী বানাবে না (২) দেশে শিক্ষিতের হার ২৫ শতাংশ থেকে তিনি ৮৩ শতাংশে উন্নীত করেন (৩) তৈল ভান্ডার হওয়া সত্ত্বেও বড় বড় শহরগুলির বাইরে লিবীয়রা যেখানে বিদ্যুতের দেখা পেত না, সেখানে সর্বত্র ফ্রি বিদ্যুতের আলো ছড়িয়ে দেওয়া হয় এবং লিবীয় নাগরিকদের ভাষ্যমতে গত ৪২ বছরে কখনো বিদ্যুৎ চলে গেছে বলে তাদের জানা নেই (৪) তৈল বিক্রির টাকা ব্যাংকে জমা হ’লেই তার একটা অংশ প্রত্যেক লিবীয় নাগরিকের ব্যাংক একাউন্টে চলে যেত (৫) বিবাহ উপলক্ষে নবদম্পতির জন্য এককালীন ৫০ হাযার ডলার এবং সন্তান হ’লে ৫০০০ ডলার পাঠিয়ে দিতেন (৬) চিকিৎসা বা পড়াশুনার জন্য বিদেশ গেলে মাসিক ২৩০০ ডলার (৭) কোন কারণে কেউ বেকার হয়ে পড়লে তার একাউন্টে চলে যেত নির্দিষ্ট হারে বেকার ভাতা (৮) কেউ ব্যবসা করতে চাইলে বিনা সূদে ব্যাংক ঋণ দেওয়া হত এবং (৯) গাড়ি কিনতে চাইলে গাড়ির মূল্যের অর্ধেক সরকার বহন করত (১০) এতদ্ব্যতীত লিবীয় নাগরিকদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, বাসস্থান বাবদ যাবতীয় খরচ সরকার বহন করত (১১) কৃষকদের জমি, বীজ, খামারবাড়ী ও অন্যান্য সরঞ্জামাদি বিনামূল্যে দেওয়া হ’ত (১২) ১৯৮৩ হ’তে ৯০ সালের মধ্যে কোনরূপ বিদেশী ঋণ ছাড়াই ২৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত সারা লিবিয়া ব্যাপী ২৮৪০ কিঃ মিঃ দীর্ঘ ভূগর্ভস্থ পানির পাইপ লাইন ছিল বিশ্বের ৮ম আশ্চর্য। যা আজও লিবিয়াবাসীকে দৈনিক ৬৫ হাযার ঘন লিটার বিশুদ্ধ পানি নিয়মিতভাবে পৌঁছে দিচ্ছে। যাকে বলা হয় বিশ্বের বৃহত্তম মনুষ্য নির্মিত ভূগর্ভ নদী। এভাবে লিবীয় নাগরিকরা গাদ্দাফীযুগে বেদুঈন জীবন থেকে উত্তরণ করে রাজার হালে বাস করত (১৩) তার সময়ে তার দেশের কোন বৈদেশিক ঋণ তো ছিলই না। বরং তাঁর মৃত্যুকালে লিবিয়ার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ১৫০ বিলিয়ন ডলার।
অনেকেই তাকে স্বৈরাচারী বলে সস্তা গালি দিয়ে থাকেন। কিন্তু তাঁরা বুঝেন না যে, যিনি শূন্য থেকে দেশটিকে তুঙ্গে এনেছেন, তিনি কিভাবে তার জীবদ্দশায় তাকে আবার শূন্যে নিক্ষেপ করবেন? লিবীয় বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য এখানে এই যে, (১) বিপ্লবের সাথী অনেককে বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োগ করার পর তাদের দুর্নীতি ও বিশ্বাসঘাতকতা তাকে দারুণভাবে ব্যথিত করে (২) পরবর্তী যোগ্য ও দেশপ্রেমিক নেতা তিনি কাউকে পাননি (৩) কঠোর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণ বল্গাহীন চরিত্রের কিছু লোককে তার বিরোধী করে তোলে (৪) অবাধ লুটপাটে ব্যর্থ হয়ে আমেরিকা তার গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ-কে দিয়ে সর্বদা একদল লোককে গাদ্দাফীর বিরুদ্ধে তৈরী করতে থাকে। সম্প্রতি উইকিলিক্সের ফাঁস করা তথ্য অনুযায়ী গাদ্দাফী হত্যার পুরা ষড়যন্ত্র সিআইএ-র পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটেছে। যা তারা বহুদিন থেকে করে আসছিল। গাদ্দাফী সেটা বুঝতে পেরেই রাষ্ট্রক্ষমতা ছাড়তে চাননি। ২০০৯ সালে গাদ্দাফী জাতিসংঘে ভাষণ দেবার সময়সীমা ১৫ মিনিটের স্থলে দেড় ঘণ্টা বক্তৃতা করেন। এই সময় তিনি জাতিসংঘ সনদ ছিঁড়ে ফেলেন ও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে ‘সর্ববৃহৎ সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসাবে আখ্যায়িত করেন। এছাড়াও আফ্রিকান ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হিসাবে তিনি ঔপনিবেশিক শাসনামলে অবাধ লুণ্ঠন ও শোষণের অভিযোগে ইউরোপের বিভিন্ন রাষ্ট্রের কাছে ৭ লাখ ৭০ হাযার কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করেন। পাশ্চাত্যের লুটেরা শক্তির বিরুদ্ধে তার এই আপোষহীন দৃঢ়তাই তার জন্য কাল হয়। শুরু থেকেই আমেরিকা তাকে হত্যার চেষ্টা চালাচ্ছিল। ১৯৮৬ সালে ত্রিপোলীতে তার বাড়ীতে বিমান হামলা চালানো হয়। ভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে যান। কিন্তু তাঁর শিশু কন্যা নিহত হয়। অতঃপর গত আগষ্টে তার বাড়ীর উপর কয়েকবার বিমান হামলা করা হয়, যাতে তাঁর পরিবারের অনেকেই নিহত হন। ভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে গেলেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে জীবন দিতে হয়।
নিহত হওয়ার কিছুদিন আগে তিনি বলেন, আমি দেশ ছেড়ে যাব না। ইহুদী-খৃষ্টান হায়েনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে করতে দেশের মাটিতেই জীবন দেব। আল্লাহ তাঁর এই প্রার্থনা কবুল করেছেন। তিনি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার্থে নিজ জন্মস্থানেই নিজ পুত্র ও সহকর্মীদের সাথে বিদেশী হামলায় মৃত্যুবরণ করেছেন। মানুষ হিসাবে তাঁর অনেক ভুল ছিল। আল্লাহ তাঁর ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করুন ও তাঁকে জান্নাত নছীব করুন। আমীন!

************************

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s