মধ্যম পন্থা এবং শত্রুদের পরিকল্পনা


আমরা যখন ইসলামের যেকোন দিক নিয়ে কথা বলি, তখন আমাদের মনে প্রাণে এই বিশ্বাস রাখা উচিত যে এই দ্বীনের বিষয়াবলী সর্বশক্তিমান মহাপরাক্রমশীল আল্লাহ্ সুবহানাওয়াতা’আলা কর্তৃক নির্ধারিত। এইসব বিষয়াবলী নিয়ে আলোচনা, ব্যবহার এবং গবেষণা করার সময় ঐ সচেতনতার একটি সরাসরি প্রভাব রয়েছে, কারণ সম্পূর্ণ ইসলাম কোন ভিত্তিহীন তত্ত্ব নয় যা সম্বন্ধে আমরা কোন ধরনের বিধিনিষেধ ছাড়াই অসীমিত আলোচনায় যেতে পারি বরঞ্চ, এটি একটি গ্রন্থ, যা আপনার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে, যাতে করে আপনি এর মাধ্যমে ভীতি-প্রদর্শন করেন। অতএব, এটি পৌছে দিতে আপনার মনে কোনরূপ সংকীর্ণতা থাকা উচিত নয়। আর এটিই বিশ্বাসীদের জন্যে উপদেশ। তোমরা অনুসরণ কর, যা তোমাদের প্রতি পালকের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য সাথীদের অনুসরণ করো না।(সূরা আরাফঃ২-৩)

যেহেতু এই দ্বীন আল্লাহর পক্ষ হতে মনোনীত, সেহেতু এর মধ্যে কোন

  • নিজস্ব অভিলাষ,
  • তত্ত্ব বা মতামত,
  • দোষারোপ,
  • বুদ্ধিমত্তার বিশ্লেষণ,
  • আত্মাকে সন্তুষ্টির ব্যাগ্রতা,
  • যুগের হাওয়ার সাথে গা-ভাসানো কিংবা
  • জাতিগত প্রবৃত্তির সাথে তাল মেলানোর জন্য ঐকতান তৈরির কোন স্থান নেই।
  • তাই, আল্লাহর এই দ্বীন সব কিছুকে চালনা করবে, কারো কর্তৃক চালিত হওয়ার নয়,
  • এটা আত্মাকে আনুগত্যের জন্য দাখিল করে ও এটা আত্মা কর্তৃক পরাভূত হবার নয়,
  • এটা জাতিকে শাসন করে ও জাতি কর্তৃক শাসিত হয় না,
  • এটা আপন মনের খেয়াল-খুশির ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে এবং এগুলো কর্তৃক সীমাবদ্ধ হয় না।
  • এটা যুগের বিষয়াবলী নিয়ন্ত্রণ করে ও এগুলোর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না, এটা জীবনের ওপর সম্পূর্ণভাবে কর্তৃত্ব স্থাপন করে
  • এবং এটা জীবন কর্তৃক অধীনস্থ হওয়ার নয়।

সুতরাং, যারা এই ধরিত্রীকে দুর্নীতির করালগ্রাস হতে রক্ষা করতে চায় ও বিভ্রান্তির অমানিশা থেকে বের করে আনতে চায় শুধুমাত্র নিজেদের মর্মস্পর্শী স্লোগান, স্পৃহা ও চিন্তাভাবনার মাধ্যমে, বস্তুতপক্ষে সেটা হল ফাঁকা আওয়াজের মত, পথনির্দেশনা ও সত্যের পথ থেকে অনেক দূরে; আর তারা তাদের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের বদৌলতে কিছুই পাবে না স্বাস্থ্যহানি এবং বুদ্ধিভ্রংশ ছাড়া ঠিক যেমনটি আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন বলেছেন, সত্য যদি তাদের কাছে কামনা-বাসনার অনুসারী হত, তবে নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল এবং এগুলোর মধ্যবর্তসবকিছুই বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ত। বরং আমি তাদেরকে দান করেছি উপদেশ, কিন্তু তারা তাদের উপদেশ অনুধাবন করে না।(সূরা মুমিনুনঃ৭১)

আমরা এমন একটি সময়ে বাস করছি যখন আপন প্রবৃত্তির আরাধনা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে
যেটা কিনা আগে কখনো হয় নি,
সংগৃহীত সৈন্য যারা এর পক্ষে দাঁড়ানো, প্রচার ও দৃঢ়করণের জন্য নিযুক্ত হয়েছে, তাদেরকে এটা শোষণ করছে। ইসলামিক সুউচ্চ ইমারত ধূলিস্মাৎ করা ও এর মৌলিক নীতিমালার সমাপ্তি টানার লক্ষে ইসলামের বিরুদ্ধে এটি অগণিত যুদ্ধক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে। সেই কারণেই আমাদের এখন খাঁটি প্রয়োজন একটি আন্তরিক প্রচেষ্টার যার মাধ্যমে আমরা দৃঢ়তার সাথে রুখে দাঁড়াতে পারি সেই সকল আত্মআরাধনাকারী সৈনিকদের বিরুদ্ধে যারা নানারূপে আত্মপ্রকাশ করেছে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এবং অনেক লোক এর পদতলে নিজেদের লুটিয়ে দিয়েছে, হাঁটু গেড়ে বসেছে, সিজদাবনত হয়েছে ও এটার স্তুতিবাদ করছে, এবং জেনে কিংবা না জেনে এটাকে সৃষ্টিকর্তার আসনে সমাসীন করেছে।

সুতরাং, কুচকাওয়াজ করার লক্ষে, দ্বীন সম্বন্ধে সম্যক উপলব্ধি লাভের লক্ষে, আমাদের মৌলিক নীতিমালা, আক্বীদাহ্ ও বিশ্বাস রক্ষার জন্য উঠে দাঁড়াতে, সেগুলোকে অপবিত্রীকরণ ও লঙ্ঘন হতে সংরক্ষণ করতে আমাদের প্রয়োজন নিম্নোক্ত আয়াতের অনুসরণঃ এরপর আমি আপনাকে রেখেছি ধর্মের এক বিশেষ শরীয়তের উপর। অতএব, আপনি এর অনুসরণ করুন এবং অজ্ঞানদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না। আল্লাহর সামনে তারা আপনার কোন উপকারে আসবে না। যালেমরা একে অপরের বন্ধু। আর আল্লাহ পরহেযগারদের বন্ধু। এটা মানুষের জন্যে জ্ঞানের কথা এবং বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য হেদায়েত ও রহমত। (সূরা জাছিয়াঃ১৮-২০)

ও মুসলিম জাতিঃ জেনে রাখো, মানুষ এবং জ্বিন জাতির মধ্য হতে শয়তানের সহযোগীরা রয়েছে, এই অংশীদারীত্বের নিজস্ব জনবল, শক্তি, সম্পদ, প্রতিষ্ঠান, ব্যয় সংকলন, পরিকল্পনা এবং কর্মসূচী রয়েছে।
মানুষদেরকে তাদের দ্বীন হতে বিচ্যুত করা,
নিজ দ্বীনের স্বকীয় আক্বীদাহ্ সম্বন্ধে সন্দেহের বীজ বপন করা ও
এই দ্বীনের বিরুদ্ধে মিথ্যা রচনাকারীকে তার ইচ্ছামাফিক সাহায্য করার সবধরনের প্রচেষ্টাই হচ্ছে এটি প্রতিষ্ঠার ভিত্তি।

আর এর সবগুলোই
ইজতিহাদ, চিন্তাভাবনা, বিতর্ক, আলোকীকরণ,
বিশ্লেষণ, রাষ্ট্রে পরিচালিত কার্যাবলীর গবেষণা, মুক্তচিন্তা এবং বোধগম্যতা
ইত্যাদির নামে চলছে।
আর যে ব্যক্তি এগুলো জোর গলায় চালাচ্ছে সে কোন ধরনের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছে না কিংবা কোনো ধরনের নীতিমালা সম্পর্কে শঙ্কিত হতে তাকে দেখা যায় না। তার দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, সে সবাইকে দেখে তার আক্রমণের সুযোগ্য অনুমিত, উর্বর লক্ষ হিসেবে। সে নির্লজ্জতার সাথে সত্য হতে মুখ ঘুরিয়ে নেয় কোনো ধরনের চেতনাবোধ ছাড়াই।

  • বাতিল করে প্রথম ও পরের প্রজন্মের শিক্ষাঃ সম্পূর্ণ ধৃষ্টতার সাথে সে শব্দমালাকে(মানে তাদের ভাবার্থ) তাদের যথোপযুক্ত স্থান হতে বিকৃত করে এবং আল্লাহর আইনের সাথে এমন কিছুর শরীক করে যেগুলো মরুভূমির আবাল-বৃদ্ধরাও জানে যে তা ধর্ম বহির্ভূত। সে বাতিল করে প্রথম ও পরের প্রজন্মের শিক্ষা যার প্রতি তাঁরা আত্মসমর্পিত ছিল; এমনকি তাকে এমনও দেখা যায় তাঁদের প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ করতে, হীন করতে এবং উপহাস করতে।
  • শয়তানি সংগঠনের মনোরম বক্তব্যঃ আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এই শয়তানি সংগঠন যেটা কিনা সর্বদাই মানুষদের সঠিক পথ হতে বিচ্যুত করতে সদা উদ্যত, এর বাস্তবতা প্রকাশ করে গিয়েছেন। তিনি (সাঃ) তা করেছিলেন এই কারণে যাতে করে আমরা সতর্ক ও হুশিয়ার থাকতে পারি এর ধোঁকাবাজিপূর্ণ মতবাদ ও আপাত মনোরম বক্তব্য থেকে।

আব্দুল্লাহ ইবনে মাস’উদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যেঃ রাসূল (সাঃ) একবার একটি সরলরেখা আঁকলেন আমাদের সামনে ও অতঃপর বললেন, “এটা হল আল্লাহর রাস্তা”, এরপর তিনি ঐ সরলরেখার ডান ও বাম পাশে আরো কতগুলো রেখা টেনে বললেন, এই রাস্তাগুলোর প্রতিটিতে একটা করে শয়তান নিযুক্ত রয়েছে যারা এই রাস্তার দিকে আহ্বান করছে তারপর তিনি (সাঃ) তিলাওয়াত করলেনঃ এমনিভাবে আমি প্রত্যেক নবীর জন্যে শত্রু করেছি শয়তান, মানব ও জিনকে। তারা ধোঁকা দেয়ার জন্যে একে অপরকে কারুকার্যখচিত কথাবার্তা শিক্ষা দেয়। যদি আপনার পালনকর্তা চাইতেন, তবে তারা এ কাজ করত না।(সূরা আনআমঃ১১২)

আল্লাহ্ পাক বলেন, হে বনী-আদম শয়তান যেন তোমাদেরকে বিভ্রান্ত না করে; যেমন সে তোমাদের পিতামাতাকে জান্নাত থেকে বের করে দিয়েছে এমতাবস্থায় যে, তাদের পোশাক তাদের থেকে খুলিয়ে দিয়েছি-যাতে তাদেরকে লজ্জাস্থান দেখিয়ে দেয়। সে এবং তার দলবল তোমাদেরকে দেখে, যেখান থেকে তোমরা তাদেরকে দেখ না। আমি শয়তানদেরকে তাদের বন্ধু করে দিয়েছি,যারা বিশ্বাস স্থাপন করে না।(সূরা আরাফঃ২৭)

সন্ত্রাস দমন নামক যুদ্ধঃ তাই আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ হতে আদেশ হল যে মধ্যম পথে থাকতে চায় সত্যকে পাথেয় করে, সে যেন তাদের ব্যাপারে চিন্তিত না হয় যাদের সাথে তার মতৈক্য রয়েছে। সন্ত্রাস দমন নামক এই যুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালেই একদল চিন্তাশীল স্কলার বলেছিলেন যে এই যুদ্ধ হল নব ক্রুসেড, যেটাকে ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে ডাকা হয়েছে। এই প্রচেষ্টা কোন গন্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ইসলামের সুরক্ষিত ব্যাপারগুলোকে আঘাত করাই এর মূল লক্ষ। এটা ভূখন্ড, ঘরবাড়ি এমনকি মেধাসম্পন্নদেরকেও হানা দেয়।

যারা এই অভিযানের পরিচালনাকারী, তারা তাদের চিন্তাচেতনা, ভাবধারা, বিশ্বাস এবং তত্ত্ব প্রচারের লক্ষ্যে এই উম্মাহর মধ্য থেকেই দালাল তৈরি করে তাদের নিযুক্ত করেছে। এর সাথে সাথে, তারা তাদের শর্তাবলী, অনুভূতির প্রচার এবং মুসলিমদেরকে তাদের বীভৎসতা ও পাপাচার সম্বন্ধে কম বোধসম্পন্ন (অনুভূতিহীন) করে তুলতে সমর্থ হয়েছে।

  • ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তিদের প্রতি ব্যক্তিগত আক্রমণঃ আর তাই, কিছুকালের অবকাশে এই ধারণাগুলো সমসাময়িকভাবে অনুমোদিত হয়ে গিয়েছে। তারা ভালোভাবেই জানত যে, তাদের পরিকল্পনার সফলতা নির্ভর করে মানুষদের জিহাদ ও মুজাহিদীন থেকে বিরত করার পাশাপাশি তাদেরকে সামরিকভাবে পরাস্ত করা এবং বুদ্ধিবৃত্তির প্রতি আক্রমণ করা; যার ফলশ্রুতিতে যখনই কোনো অপরিচিত ব্যক্তি এই মুজাহিদীনদের সম্পর্কে সমালোচনা করার জন্য মিনমিন করে, তখনই তারা তাদের গণমাধ্যমের দ্বারা সতর্কতা জারি করে। তারা সেই ব্যক্তিকে আমজনতার সামনে ঢালাওভাবে উপস্থাপন করে, তাকে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে তুলে ধরে ও ক্রমাগত তার সাক্ষাৎকার ও আলোচনা উপস্থাপন করে যার মাধ্যমে তারা লোকজনকে ঐ ব্যক্তির মতামতের দিকে পরিচালিত করে যেটা কিনা এক অপরিচিত জড়ধী ব্যক্তির মস্তিষ্কপ্রসূত।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে হলেও আমরা দেখি যে তাদের মধ্যে অনেকেই রয়েছেন যারা ইসলামিক দলগুলোর নেতৃত্বের সাথে সম্পৃক্ত অথবা দাওয়াতকারীদের সাথে সম্পৃক্ত, চিন্তাবিদ যারা সম্মেলন করেন একটার পরে আরেকটা, সভা-সমাবেশ করেন একটার পর আরেকটা। তারা এক দেশ থেকে আরেক দেশে ভ্রমণ করেন, এমন কিছু বিভ্রান্তিমূলক ভাবধারাকে সুদৃঢ়করণে যেগুলোর সাথে ইসলামের কোনো সম্পর্কই নেই; বরঞ্চ বাস্তবে সেগুলো ইসলামের একটার পর আরেকটা বিধান ধ্বংস করে। তারা তাদের শঠতাপূর্ণ ভ্রান্তি ও ভিন্নমুখীকরণ আল্লাহ্ মনোনীত দ্বীনে আরোপ করেন, মন্দের উপর মন্দ যুক্ত করেন। আর আল্লাহর বাণী তাদের উপর প্রযুক্ত হয় যেমনটি আল্লাহ্ বলেন, আর তাদের মধ্যে একদল রয়েছে, যারা বিকৃত উচ্চারণে মুখ বাঁকিয়ে কিতাব পাঠ করে, যাতে তোমরা মনে কর যে, তার কিতাব থেকেই পাঠ করছে। অথচ তারা যা আবৃত্তি করছে তা আদৌ কিতাব নয়। এবং তারা বলে যে, এসব কথা আল্লাহর তরফ থেকে আগত। অথচ এসব আল্লাহর তরফ থেকে প্রেরিত নয়। তারা বলে যে, এটি আল্লাহর কথা অথচ এসব আল্লাহর কথা নয়। আর তারা জেনে শুনে আল্লাহরই প্রতি মিথ্যারোপ করে।(সূরা আল-ইমরানঃ৭৮)


বিভ্রান্ত ছড়ানোর সর্বোত্তম উপায় ও মধ্যম পন্থা অবলম্বনের দাবি করাঃ
তাদের ভিন্নমুখীকরণ প্রচেষ্টা লুকানো ও বিভ্রান্ত ছড়ানোর সর্বোত্তম উপায় হিসেবে তারা যেটা অনুসরণ করে তা হল মধ্যম পন্থা অবলম্বন, মিথ্যাচার ও এর উপর অটুট থাকার সাথে তাদের সম্পৃক্ততার দাবি করা। তারা এইসব শব্দাবলীর ভাবার্থ তাদের সন্তুষ্টি মোতাবেক পাল্টিয়ে দিয়েছে। সেগুলোর অর্থের উৎস হল তাদের বিকৃত চিন্তাধারা। এর উদ্দেশ্যই হল পশ্চিমাদের খুশি করা

  • সুতরাং, কোনটা সেই মধ্যম পন্থা যেটার প্রতি তারা দিনে-রাতে আহ্বান জানায় ও গুঞ্জন করে?
  • আর কোনটাই বা সেই মধ্যম পন্থা যেটা আল্লাহর দ্বীন নিয়ে এসেছে?
  • আমাদেরকে রাসূল (সাঃ) এর উম্মত হিসেবে অংশীদার করেছে ও প্রশংসিত করেছে?

অতঃপর আল্লাহ্ তা’আলা বলেন, এমনিভাবে আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থী সম্প্রদায় করেছি যাতে করে তোমরা সাক্ষ্যদাতা হও মানবমন্ডলীর জন্যে এবং যাতে রসূল সাক্ষ্যদাতা হন তোমাদের জন্য। আপনি যে কেবলার উপর ছিলেন, তাকে আমি এজন্যই কেবলা করেছিলাম, যাতে একথা প্রতীয়মান হয় যে, কে রসূলের অনুসারী থাকে আর কে পিঠটান দেয়। নিশ্চিতই এটা কঠোরতর বিষয়, কিন্তু তাদের জন্যে নয়, যাদেরকে আল্লাহ পথপ্রদর্শন করেছেন। আল্লাহ এমন নন যে, তোমাদের ঈমান নষ্ট করে দেবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ, মানুষের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল, করুনাময়।(সূরা বাকারাঃ১৪৩)

বৈধ বিধানসমূহের সংজ্ঞায়ন হতে হবে অবশ্যই কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে। কারণ,

  • বু্দ্ধিমত্তা অসমতাপূর্ণ;
  • মতামতে পার্থক্য রয়েছে
  • এবং অর্থকরণের ক্ষেত্রে প্রবৃত্তির প্রভাব রয়েছে।


কিন্তু যদি মহান আল্লাহ্ কোন কিছু বলেন, তবে সেটা শ্বাশ্বত সত্য।
যদি শাসন হয় আল্লাহর, তবে তা সর্বোচ্চ ন্যায়নিষ্ঠ; আল্লাহ্ বলেনঃ সত্য যদি তাদের কাছে কামনা-বাসনার অনুসারী হত, তবে নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল এবং এগুলোর মধ্যবর্তসবকিছুই বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ত। বরং আমি তাদেরকে দান করেছি উপদেশ, কিন্তু তারা তাদের উপদেশ অনুধাবন করে না।(সূরা মুমিনুনঃ৭১)

  • (১) মধ্যম পন্থা এমন একটি শব্দগুচ্ছ, যেটাকে মানুষ এর প্রকৃত অর্থ অনুধাবন না করে অন্য অর্থে গ্রহণ করেছে।এটার মানে হল আল্লাহর পক্ষ হতে মনোনীত দ্বীন যেটাকে তিনি আমাদের জন্য পথনির্দেশিকা হিসেবে নির্ধারণ করেছেন, তার সাথে পরিপূর্ণভাবে একাত্মতা ঘোষণা করা। এমনকি যদি এটা কারো পছন্দনীয় না হয়, তবুও এটাকে প্রচার করতে হবে কোনো ধরনের বিকৃতি, মিথ্যারোপ কিংবা চালবাজি ছাড়া। বরং, এটাকে উপস্থাপন করতে হবে সম্পূর্ণ অবিকৃত অবস্থায়।

 

  • (২) মুসলিম জাতির লক্ষ্য হল অবিশ্বাসীদের সাথে বৈসাদৃশ্য বজায় রাখা। তাদের সাথে সমকেন্দ্রীকরণ বা সমঅস্তিত্ব বজায় রাখার উপাদান খোঁজা নয়। বাস্তবতার জন্য চেষ্টা করা কিংবা ব্যয় করা যাতে করে এর প্রতি সমর্পণ করা বা আনুগত্য প্রকাশ করার জন্য আল্লাহ্ আমাদের সৃষ্টি করেন নি এবং তিনি আমাদেরকে তা করার আদেশও দেননি।

পক্ষান্তরে, আল্লাহ্ আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন মানুষদেরকে নিজের ইচ্ছার দাসত্ব থেকে মুক্ত করে সৃষ্টির আরাধনা থেকে বের করে নিয়ে একমাত্র তাঁরই ইবাদাতে আত্মনিয়োগ করার জন্য। ধর্মের অত্যাচার থেকে ইসলামের ন্যায়বিচারে নিয়ে আসার জন্য। তাই, তিনি আমাদের উপর দায়িত্ব দিয়েছেন, তাঁর মনোনীত দ্বীন দ্বারা তাঁরই সৃষ্টিকে এই দ্বীনের প্রতি আহ্বান করার। যে এটা গ্রহণ করবে, আমরাও তাকে গ্রহণ করবে; আর যে এটা প্রত্যাখ্যান করবে, আমরা তার বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাবো আল্লাহর অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হওয়া পর্যন্ত। এভাবেই মুসলিম জাতির লক্ষ্যের সারাংশ বর্ণনা করেছেন রাসূল (সাঃ) এর সাহাবী রাবী ইবনে ’আমীর। এটাই হল সত্য সংবলিত মধ্যম পন্থা যেটা সাহাবীরা বুঝেছিলেন এবং অন্যদের আহ্বান করেছিলেন এর প্রতি।

নিজের ইচ্ছামাফিক আপন পছন্দ ও আকাঙ্খা অনুযায়ী আল্লাহর দ্বীন থেকে কোনো কিছু সংগ্রহ করার জন্য এটা নয়। নিজের আকাঙ্খা ও ভালোবাসা অনুযায়ী মানুষদের এই দ্বীনের প্রতি আহ্বান করা এবং আল্লাহর দ্বীনকে নিজের পছন্দ ও কামনা অনুযায়ী উপস্থাপন করার জন্যও এটি নয়। সর্বশক্তিমান আল্লাহ্ বলেনঃ বলে দিনঃ এই আমার পথ। আমি আল্লাহর দিকে বুঝে সুঝে দাওয়াত দেই আমি এবং আমার অনুসারীরা। আল্লাহ পবিত্র। আমি অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত নই।(সূরা ইউসূফঃ১০৮)

(৩)এক্ষেত্রে, এই আহ্বান হল আল্লাহর দিকে-যার মানে হল সম্পূর্ণ দ্বীনের প্রতি-শুধুমাত্র মতামতের ফলাফল ও চিন্তাধারার উপযুক্ত প্রবর্তনের প্রতি আহ্বান নয়। যে মধ্যম পন্থার দিকে আমরা আহ্বান জানাই তা বলে, যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, তাদেরকে আপনি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধাচরণকারীদের সাথে বন্ধুত্ব করতে দেখবেন না, যদিও তারা তাদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা অথবা জ্ঞাতি-গোষ্ঠী হয়। তাদের অন্তরে আল্লাহ ঈমান লিখে দিয়েছেন এবং তাদেরকে শক্তিশালী করেছেন তাঁর অদৃশ্য শক্তি দ্বারা। তিনি তাদেরকে জান্নাতে দাখিল করবেন, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত। তারা তথায় চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। তারাই আল্লাহর দল। জেনে রাখ, আল্লাহর দলই সফলকাম হবে।(সূরা ইউসূফঃ৫৮) এমন যদিও সেটা আপনার জন্য মাত্রাতিরিক্ত হয়।

  • (৪) আমাদের মধ্যম পন্থা যার উপর আমরা কুচকাওয়াজ করি তার ভিত্তি হল, হে ঈমানদারগণ! তোমরা স্বীয় পিতা ও ভাইদের অভিভাবকরূপে গ্রহণ করো না, যদি তারা ঈমান অপেক্ষা কুফরকে ভালবাসে। আর তোমাদের যারা তাদের অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে তারা সীমালংঘনকারী।(সূরা তাওবাঃ২৩)

(৫) আমাদের মধ্যম পন্থা হল সেটি যার উপর মৌলিক বিধিমালার ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত, যা আহ্বান জানায় এইভাবে, হে মুমিনগণ, আহলে কিতাবদের মধ্য থেকে যারা তোমাদের ধর্মকে উপহাস ও খেলা মনে করে, তাদেরকে এবং অন্যান্য কাফেরকে বন্ধু রূপে গ্রহণ করো না। আল্লাহকে ভয় কর, যদি তোমরা ঈমানদার হও।(সূরা মায়িদাহঃ৫৭)…এমনকি যদি আপনাকে বিরাগ ও ক্রোধের সাথে মুখোমুখি হতে হয়।

 

  • (৬) আমাদের মধ্যম পন্থা হল ইব্রাহিম (আঃ) এর পথ যার সম্বন্ধে আল্লাহ্ বলেন, তোমাদের জন্যে ইব্রাহীম ও তাঁর সঙ্গীগণের মধ্যে চমৎকার আদর্শ রয়েছে। তারা তাদের সম্প্রদায়কে বলেছিলঃ তোমাদের সাথে এবং তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যার এবাদত কর, তার সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। আমরা তোমাদের মানি না। তোমরা এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন না করলে তোমাদের মধ্যে ও আমাদের মধ্যে চিরশত্রুতা থাকবে। কিন্তু ইব্রাহীমের উক্তি তাঁর পিতার উদ্দেশে এই আদর্শের ব্যতিক্রম। তিনি বলেছিলেনঃ আমি অবশ্যই তোমার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করব। তোমার উপকারের জন্যে আল্লাহর কাছে আমার আর কিছু করার নেই। হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা তোমারই উপর ভরসা করেছি, তোমারই দিকে মুখ করেছি এবং তোমারই নিকট আমাদের প্রত্যাবর্তন।(সূরা মুমতাহিনাঃ৪)…এমনকি যদি আপনি মনে করেন এই আহ্বান প্রচন্ড ঘৃণা, অসহিষ্ঞুতার দিকে এবং শান্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধের শামিল।

 

  • (৭) আমাদের মধ্যম পন্থা হল যেটাকে আমরা আঁকড়ে ধরে থাকি এবং আল্লাহর আদেশ হতে বিচ্যুত না হই, হে মুমিণগণ! তোমরা ইহুদী ও খ্রীষ্টানদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করো না। তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ জালেমদেরকে পথ প্রদর্শন করেন না।(সূরা মায়িদাহ্ঃ৫১)… এমনকি যদি আপনি মনে করেন এটা চরমপন্থী ও আমূল সংস্কারগামী মতবাদ।

সুতরাং, এটাই হল ইসলাম ধর্মের মধ্যম পন্থা, সম্পূর্ণ ন্যায়নিষ্ঠ এবং পরিষ্কার আহ্বান। পরাজিত আত্মা, রোগাক্রান্ত হৃদয় ও প্রতারণাপূর্ণ মনের অধিকারীদের দ্বারা প্রচারিত কোন ভাবধারা নয় যদিও লক্ষ লক্ষ মানুষ তাদের প্রতি প্রশংসা জ্ঞাপন করে।

বলুনঃ সত্য তোমাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে আগত। অতএব, যার ইচ্ছা, বিশ্বাস স্থাপন করুক এবং যার ইচ্ছা অমান্য করুক। আমি জালেমদের জন্যে অগ্নি প্রস্তুত করে রেখেছি, যার বেষ্টনী তাদের কে পরিবেষ্টন করে থাকবে। যদি তারা পানীয় প্রার্থনা করে, তবে পুঁজের ন্যায় পানীয় দেয়া হবে যা তাদের মুখমন্ডল দগ্ধ করবে। কত নিকৃষ্ট পানীয় এবং খুবই মন্দ আশ্রয়।(সূরা কাহ্ফঃ২৯)

  • লেখকঃ শাইখ আবু ইয়াহইয়া

****************************

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s