কুরবানী : ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি


ক্বামারুয্যামান বিন আব্দুল বারী

উপক্রমণিকা :
আল্লাহর নৈকট্য, আত্মত্যাগ, আত্মোৎসর্গ, ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্য, সাম্য, মৈত্রী, সম্প্রীতির সুমহান মহিমায় ভাস্বর কুরবানী। কুরবানী আমাদের আদি পিতা আদম (আঃ) ও তদীয় পুত্র হাবিল-কাবীল এবং মুসলিম জাতির পিতা ইবরাহীম (আঃ) ও তদীয় পুত্র ইসমাঈল (আঃ)-এর সুমহান আত্মত্যাগ এবং আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা-ভরসা ও জীবনের সর্বস্ব সমর্পণের মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য লাভের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সমন্বয়।
কুরবানীর আভিধানিক অর্থ :
আরবী قرب বা قربان শব্দটি উর্দূ ও ফার্সীতে قربانى (কুরবানী) রূপে রূপান্তরিত হয়েছে। যার অর্থ, নৈকট্য, সান্নিধ্য। পবিত্র কুরআন ও হাদীছে এর কয়েকটি সমার্থক শব্দ পরিলক্ষিত হয়। যেমন-
(১) نحر অর্থে। যেমন- আল্লাহ রাববুল আলামীনের বাণী فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ ‘সুতরাং আপনি আপনার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে ছালাত আদায় করুন এবং কুরবানী করুন’ (কাওছার ২)। এই অর্থে কুরবানীর দিনকে يوم النحر বলা হয়।
(২) نسك অর্থে। যেমন- মহান আল্লাহর বাণী- قُلْ إِنَّ صَلاَتِيْ وَنُسُكِيْ وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِيْ لِلّهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ- ‘আপনি বলুন, আমার ছালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন, আমার মরণ সবই বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য নিবেদিত’ (আন‘আম ১৬২)
(৩) منسك অর্থে। যেমন আল্লাহর বাণী- لِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنْسَكاً ‘আমি প্রত্যেক উম্মাতের জন্য কুরবানীর বিধান রেখেছি’ (হজ্জ ৩৪)
(৪) الاضحى অর্থে। হাদীছে এসেছে- এই অর্থে কুরবানীর ঈদকে عيد الاضحى বলা হয়।
কুরবানীর ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি :
বিশ্বের সকল জাতিই তাদের আনন্দ উৎসব প্রকাশের জন্য নির্দিষ্ট দিবস পালন করে থাকে। এ সকল দিবস স্ব স্ব ধর্মের কোন উল্লেখযোগ্য ঘটনা অথবা কারো জন্ম বা মৃত্যু দিন অথবা কোন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে নির্ধারিত হয়েছে। এসব দিবসে প্রত্যেক জাতি তাদের ধর্মীয় ঐতিহ্য-সংস্কৃতি (Culture) ও বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটায়।
সারা বিশ্বের প্রায় দুই কোটি খৃষ্টান যীশুখৃষ্টের জন্মদিন উপলক্ষে ২৫ ডিসেম্বরকে তাদের উৎসবের (Xmas day) ‘বড় দিন’ হিসাবে পালন করে। প্রায় সত্তর পঁচাত্তর লাখ বৌদ্ধ গৌতম বুদ্ধের জন্মদিন উপলক্ষে ২২ মে কে তাদের উৎসবের দিন ‘শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমা’ হিসাবে পালন করে থাকে। সবচেয়ে বেশী উৎসবের দিন হ’ল হিন্দু জাতির। তারা ১২ মাসে ১৩টি উৎসব পালন করে থাকে। তবে এর মধ্যে লক্ষ্মীপূজা ও দুর্গাপূজা অত্যন্ত জাঁকজমকভাবে পালন করা হয়। সারা বিশ্বের প্রায় দেড়শ’ কোটি মুসলমান মাহে রামাযানের শেষে শাওয়ালের প্রথম তারিখে ঈদুল ফিতর এবং যিলহজ্জ মাসের ১০ তারিখকে ঈদুল আযহা বা কুরবানীর ঈদ হিসাবে পালন করে থাকে। মুসলমানদের এ কুরবানীর ঈদের রয়েছে একটি সুদীর্ঘ ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি।
কুরবানী ঈদের প্রাক ইতিহাস :
আমরা যেভাবে কুরবানীর ঈদ উদযাপন করি তার শুরু বস্ত্তত হিজরতের অব্যবহতি পরে। মুসলিম জাহানে এ পবিত্র উৎসবটি পালন কিভাবে শুরু হয় তার একটি বিস্তারিত বর্ণনা প্রদান আবশ্যক। কারণ ঈদুল-আযহা তথা কুরবানী দিবসের মাহাত্ম্য ও সুমহান তাৎপর্য যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে হ’লে এ ইতিহাস জানা একান্তভাবেই প্রয়োজন। মুহাম্মাদ (ছাঃ) মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করলেন। মদীনায় এসে তিনি জানতে পারলেন যে, সেখানকার অধিবাসীগণ শরতের পূর্ণিমায় ‘নওরোজ’ ও বসন্তের পূর্ণিমায় ‘মিহিরজান’ নামে দু’টি উৎসব প্রতিবছর উদযাপন করে থাকে। কিন্তু এ দু’টি উৎসবের চালচলন, রীতিনীতি ছিল  ইসলামের  সুমহান  আদর্শ ও ঐতিহ্য-সংস্কৃতির পরিপন্থি। শ্রেণী-বৈষম্য, ধনী-দরিদ্রের মধ্যে ব্যবধান, ঐশ্বর্য-অহমিকার পূর্ণ স্বীকৃতি প্রদান করত এ দু’টি উৎসব। দু’টি উৎসব ছিল ছয়দিন ব্যাপী এবং এই বারোটি দিন ভাগ করে দেয়া হ’ত বিভিন্ন শ্রেণীর লোকজনদের মধ্যে। কোন একটি দিনকে চিহ্নিত করা হ’ত ‘নওরোজ-এর হাসা, বা ‘নওরোজ-এ বুযুর্গ’ হিসাবে শুধুমাত্র বিত্তবানদের জন্য নির্ধারিত। সেদিন কোন হতদরিদ্র বা নিঃস্বের অধিকার থাকত না। নওরোজ উৎসব উদযাপনে শালীনতা-বিবর্জিত নর্তকী ও চরিত্রহীনা ‘কিয়ানদের’ জন্যও একটি দিবস বিশেষভাবে পরিচিত হ’ত। সাধারণ মানুষের জন্য নওরোজ আম্মা হিসাবে চিহ্নিত করা হ’ত শুধুমাত্র একটি দিনকে। অন্য পাঁচটি দিনের উৎসবে অংশগ্রহণের বিন্দুমাত্র কোন সুযোগ ছিল না বিত্তহীন সহায়-সম্বলহীন সাধারণ মানুষের। এই ‘নওরোজ-এ আম্মা’ দিবসটিকে অবজ্ঞা ও ঘৃণার চোখে দেখত আমীর-ওমারাহ ও বিত্তশালী ব্যক্তিগণ। সাধারণ, দরিদ্র অসহায় মানুষ কোনক্রমে এ দিবসটি উদযাপন করত ব্যথা-বেদনা ও লাঞ্ছনার মাধ্যমে।
কিন্তু ইসলাম হচ্ছে শান্তি ও মিলনের ধর্ম। সাম্য, মৈত্রী, প্রেম-প্রীতির ধর্ম। ইসলাম তো শ্রেণীবৈষম্যের স্বীকৃতি দেয় না। তাই শ্রেণীবৈষম্য নির্ভর শালীনতা-বিবর্জিত উৎসব দু’টির বিলুপ্তি ঘটিয়ে মনুষ্য সৃষ্ট কৃত্রিম পার্থক্য দূরীকরণের লক্ষ্যে ধনী-দরিদ্রের মহামিলনের প্রয়াসে মহানবী (ছাঃ) প্রবর্তন করলেন দু’টি উৎসব তথা ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা বা কুরবানীর ঈদ।
আনাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) মদীনায় আগমনের পর দেখলেন মদীনাবাসীদের দু’টি উৎসবের দিন রয়েছে, এ দিনে তারা খেলাধুলা, আনন্দ ও চিত্তবিনোদন করে। তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, এ দু’টি দিন কি? তারা বলল, জাহেলী যুগে আমরা এইদিনে আনন্দ উৎসব, খেলাধুলা করতাম। রাসূল (ছাঃ) তখন বললেন, আল্লাহ তা‘আলা এই দুই দিনের পরিবর্তে এর চেয়ে উত্তম দুইটি দিন তোমাদেরকে দান করেছেন। একটি হ’ল ঈদুল ফিতর অপরটি হ’ল ঈদুল আযহা তথা কুরবানীর ঈদ (নাসাঈ হা/১৫৩৮; মিশকাত হা/১৪৩৯; সিলসিলা ছহীহাহ হা/২০২১)। এতে চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল ‘নওরোজ’ ও ‘মিহিরজান’ উৎসব উদযাপন। শ্রেণী বৈষম্য-বিবর্জিত, পঙ্কিলতা ও অশালীনতামুক্ত সুনির্মল আনন্দ উপভোগ শুরু হ’ল ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা তথা কুরবানীর ঈদ উদযাপনের মাধ্যমে। জন্ম নিল সুসিণগ্ধ, প্রীতিঘন সাম্য, ত্যাগ ও মিলনের উৎসব।
কুরবানীর প্রথম পটভূমি :
মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্রথম কুরবানীর ঘটনা ঘটে আদম (আঃ)-এর দুই পুত্র হাবিল-কাবীলের মাধ্যমে। কুরআনুল কারীমে হাবিল-কাবীলের কুরবানীর ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে-
وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ ابْنَيْ آدَمَ بِالْحَقِّ إِذْ قَرَّبَا قُرْبَاناً فَتُقُبِّلَ مِنْ أَحَدِهِمَا وَلَمْ يُتَقَبَّلْ مِنَ الآخَرِ قَالَ لَأَقْتُلَنَّكَ قَالَ إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللهُ مِنَ الْمُتَّقِيْنَ- لَئِنْ بَسَطتَ إِلَيَّ يَدَكَ لِتَقْتُلَنِيْ مَا أَنَاْ بِبَاسِطٍ يَدِيَ إِلَيْكَ لَأَقْتُلَكَ إِنِّيْ أَخَافُ اللهَ رَبَّ الْعَالَمِيْنَ-
‘হে রাসূল! আপনি তাদেরকে আদমের পুত্রদ্বয়ের বৃত্তান্ত যথাযথভাবে পাঠ করে শুনান। যখন তারা উভয়েই কুরবানী করেছিল, তখন একজনের কুরবানী কবুল হ’ল এবং অন্যজনের কুরবানী কবুল হ’ল না। সে (কাবীল) বলল, আমি তোমাকে অবশ্যই হত্যা করব। অপরজন (হাবিল) বলল, অবশ্যই আল্লাহ মুত্তাকীদের কুরবানী কবুল করেন। সে (হাবিল) বলল, যদি তুমি আমাকে হত্যা করতে আমার দিকে হস্ত প্রসারিত কর, তবুও আমি তোমাকে হত্যা করতে তোমার প্রতি হস্ত প্রসারিত করব না। কেননা আমি বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করি’ (মায়েদা ২৭-২৮)
তৎকালীন সময়ে কুরবানী গৃহীত হওয়ার একটি সুস্পষ্ট নিদর্শন ছিল এই যে, আকাশ থেকে একটি অগ্নিশিখা এসে কুরবানীকে ভস্মিভূত করে আবার অন্তর্হিত হয়ে যেত। যে কুরবানী অগ্নি এসে ভস্মিভূত করত না তাকে প্রত্যাখ্যাত মনে করা হ’ত।
হাবিল ভেড়া, দুম্বা ইত্যাদি পশু পালন করত। সে একটি মোটা তাজা উৎকৃষ্ট দুম্বা কুরবানী করল। কাবীল কৃষি কাজ করত সে কিছু শস্য, গম ইত্যাদি কুরবানীর জন্য পেশ করল। অতঃপর নিয়ম অনুযায়ী আকাশ থেকে অগ্নিশিখা অবতরণ করে হাবিলের কুরবানিটি ভস্মিভূত করে দিল এবং কাবীলের কুরবানী যেমনি ছিল তেমনি পড়ে রইল। এ অকৃতকার্যতায় কাবীলের দুঃখ ও ক্ষোভ আরও বেড়ে গেল। সে আত্মসংবরণ করতে পারল না এবং প্রকাশ্যে হাবিলকে বলে দিল لاقتلنك ‘অবশ্যই আমি তোমাকে হত্যা করব’। হাবিল তখন ক্রোধের জবাবে ক্রোধ প্রদর্শন না করে একটি মার্জিত নীতিবাক্য উচ্চারণ করল। এতে কাবীলের প্রতি তাঁর সহানুভূতি ও শুভেচ্ছা ফুটে উঠেছিল। সে (হাবিল) বলল, انما يتقبل الله من المتقين ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা মত্তাকী ব্যক্তিদের কুরবানী কবুল করেন’।
কুরবানীর দ্বিতীয় পটভূমি :
কুরবানীর প্রচলন আদি পিতা আদম (আঃ)-এর সময় থেকে শুরু হ’লেও মুসলিম জাতির কুরবানী মূলতঃ ইবরাহীম খলীলুল্লাহ (আঃ) এবং তদীয় পুত্র ইসমাঈল যবীহুল্লাহ (আঃ)-এর কুরবানীর স্মৃতি রোমন্থন, অনুকরণ অনুসরণে চালু হয়েছে।
আল্লাহ তা‘আলা মানব জাতির হেদায়াতের জন্য যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে  কঠিন অগ্নি পরীক্ষা নিয়েছিলেন ইবরাহীম (আঃ)-এর নিকট থেকে। তিনি প্রতিটি পরীক্ষায় হিমাদ্রীসম ধৈর্য ও ত্যাগের মাধ্যমে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বাণী, وَإِذِ ابْتَلَى إِبْرَاهِيْمَ رَبُّهُ بِكَلِمَاتٍ فَأَتَمَّهُنَّ قَالَ إِنِّيْ جَاعِلُكَ لِلنَّاسِ إِمَاماً ‘যখন ইবরাহীম (আঃ)-কে তাঁর পালনকর্তা কয়েকটি বিষয়ে পরীক্ষা করলেন, অতঃপর তিনি তা পূর্ণ করলেন, তখন তিনি বললেন, আমি তোমাকে মাবনজাতির নেতা বানিয়ে দিলাম’ (বাক্বারাহ ১২৪)
ইসমাঈল (আঃ) যখন চলাফেরা করার মত বয়সে উপনীত হ’লেন, তখন ইবরাহীম (আঃ) তাঁর প্রাণ প্রতীম পুত্রকে কুরবানী করার জন্য স্বপ্নাদিষ্ট হ’লেন। একথা সর্বজন স্বীকৃত যে, নবীগণের স্বপ্নও ‘অহি’। তাই এ স্বপ্নের অর্থ ছিল, আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রতি স্বীয় পুত্র ইসমাঈল (আঃ)-কে কুরবানী করার নির্দেশ। এ নির্দেশটি সরাসরি কোন ফেরেশতার মাধ্যমেও নাযিল হ’তে পারত। কিন্তু স্বপ্ন দেখানোর তাৎপর্য হ’ল, ইবরাহীম (আঃ)-এর আনুগত্য পূর্ণমাত্রায় প্রকাশ পাওয়া। স্বপ্নে প্রদত্ত আদেশের ভিন্ন অর্থ করার যথেষ্ট অবকাশ ছিল। কিন্তু ইবরাহীম (আঃ) ভিন্ন অর্থের পথ অবলম্বন করার পরিবর্তে আল্লাহর আদেশের সামনে মাথা নত করে দেন। আত্মসমর্পণকারী ইবরাহীম (আঃ) এই কঠোর পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হন। তিনি পুত্র ইসমাঈলকে জিজ্ঞেস করলেন, يَا بُنَيَّ إِنِّيْ أَرَى فِي الْمَنَامِ أَنِّيْ أَذْبَحُكَ فَانْظُرْ مَاذَا تَرَى ‘হে বৎস! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, তোমাকে যবেহ করছি। এ বিষয়ে তোমার অভিমত কি’?
নবী-রাসূলগণের স্বপ্ন নিদ্রাপুরীর কল্পনা বিলাস নয়। এ আদেশ অহি-র অন্তর্ভুক্ত। পুত্র ইসমাঈল (আঃ) পিতার এ প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে বলতে পারতেন এটি একটি নিছক স্বপ্ন বৈ কিছুই নয়। কিন্তু তিনি তা না বলে অত্যন্ত বিনয় ও আনুগত্যের সাথে স্বীয় পিতাকে সম্বোধন করে বলেছিলেন, يَا أَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ سَتَجِدُنِيْ إِنْ شَاءَ اللهُ مِنَ الصَّابِرِيْنَ ‘পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে আপনি তা পালন করুন। আল্লাহ চাহে তো আপনি আমাকে ছবরকারীদের মধ্যে পাবেন’ (ছাফফাত ১০২)
আত্ম নিবেদনের এ কি চমৎকার দৃশ্য! জনমানবহীন মিনা প্রান্তরে ৯৯ বছরের বৃদ্ধ ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় প্রাণাধিক প্রিয় পুত্র ইসমাঈলকে কুরবানী করার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্ত্তত। আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে এবং তাঁরই অনুরাগ ও প্রেমলাভ করার দুর্ণিবার আগ্রহে পুত্রকে কুরবানীর মেষের মতই উপুড় করে শুইয়ে দিলেন। আর কণ্ঠনালীকে কাটার জন্য বার্ধক্যের শেষ শক্তি একত্রিত করে শাণিত ছুরি তুলে ধরলেন। পুত্র ইসমাঈলও শাহাদতের উদগ্র বাসনা নিয়ে নিজের কণ্ঠকে বৃদ্ধ পিতার সুতীক্ষ্ণ ছুরির নিচে স্বেচ্ছায় সঁপে দিলেন। এ এক অভাবনীয় দৃশ্য! পৃথিবীর জন্ম থেকে এমন দৃশ্য কেউ অবলোকন করেনি। এ দৃশ্য দেখে পৃথিবী যেন থমকে দাঁড়ায়। পৃথিবীর সকল সৃষ্টি যেন অপলক নেত্রে চেয়ে থাকে এ চরম পরীক্ষার দিকে। সকল সৃষ্টিই যেন নিথর নিস্তব্ধ হয়ে যায় এ দৃশ্য অবলোকনে। কিন্তু না চরম আত্মত্যাগী ইবরাহীম (আঃ)ও চরম আত্মোৎসর্গকারী ইসমাঈল (আঃ) এ কঠিন ও চূড়ান্ত পরীক্ষায়ও কৃতকার্য হ’লেন। মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ঘোষণা হ’ল- وَنَادَيْنَاهُ أَنْ يَا إِبْرَاهِيْمُ- قَدْ صَدَّقْتَ الرُّؤْيَا إِنَّا كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِيْنَ- إِنَّ هَذَا لَهُوَ الْبَلاَءُ الْمُبِيْنُ- وَفَدَيْنَاهُ بِذِبْحٍ عَظِيْمٍ- ‘তখন আমি তাঁকে ডেকে বললাম, হে ইবরাহীম! তুমি স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করেছ। আমি এভাবেই সৎকর্মশীলদের প্রতিদান দিয়ে থাকি। নিশ্চয়ই এটা একটি সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি এর পরিবর্তে যবেহ করার জন্য দিলাম এক মহান পশু’ (ছাফফাত ১০৪-১০৭)
বিশ্ব নিয়ন্তা আল্লাহ তা‘আলা ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রতি সদয় হ’লেন। ইসমাঈলের রক্তের পরিবর্তে তিনি পশুর রক্ত কবুল করলেন। আর ইবরাহীম (আঃ)-এর পরবর্তী সন্তানদের জন্য কুরবানীর সুন্নাতকে জারি রাখলেন।
আত্মত্যাগ ও আত্মসমর্পণের এই মহান স্মৃতিকে চির জাগ্রত করার জন্যই ১০ যিলহজ্জকে আল্লাহ চির স্মরণীয় ও বরণীয় করেছেন। জন্ম থেকে জীবনের ৯৯টি বছর ধরে একের পর এক পরীক্ষা করে যখন আল্লাহ তা‘আলা ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রতি সন্তুষ্ট হ’লেন, তখন তাঁর এই সুমহান কীর্তি পৃথিবীর সকল মুসলমানের জন্য ক্বিয়ামত পর্যন্ত অবিস্মরণীয় ও স্থায়ী করে দিলেন। নিম্নোক্ত আয়াতের মাধ্যমে। وَتَرَكْنَا عَلَيْهِ فِي الْآخِرِيْنَ ‘আমি তাঁর জন্য এ বিষয়টি পরবর্তীদের জন্য পালনীয় করে রেখেছি’ (ছাফফাত ১০৮)
আজও আমরা সেই ইবরাহীমী সুন্নাতের অনুসরণেই প্রতি বছর যিলহজ্জ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখে পশু কুরবানী করে থাকি। এটি মুসলিম মিল্লাতের অন্যতম একটি ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। ক্বিয়ামত উষার উদয়কাল পর্যন্ত এই মহান আত্মত্যাগের ধারাবাহিকতা চলমান থাকবে ইনশাআল্লাহ।
মুসলিম ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে কুরবানী :
মুসলিম জাতি যেহেতু শেষ নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর উম্মাত, সেহেতু তাঁর সুন্নাত বা ঐতিহ্য সংস্কৃতি ছাড়া অন্য কোন নবীর ঐতিহ্য-সংস্কৃতি লালন-পালন করে না, একমাত্র ইবরাহীম (আঃ)-এর ঐতিহ্য-সংস্কৃতি ব্যতীত। কেননা তিনি মুসলিম জাতির জনক। তাই ইবরাহীম (আঃ) স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে প্রাণপ্রিয় পুত্রকে কুরবানী করার অবিস্মরণীয় আত্মত্যাগ ও আত্মোৎসর্গের প্রয়াসকে আমরা চির অম্লান করে রাখার লক্ষ্যে প্রতি বছর ১০ই যিলহজ্জ তারিখে কুরবানী করে থাকি। কেননা এ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে জাগরুক রাখতে আল্লাহ তা‘আলা নিম্নোক্ত আয়াতে নির্দেশ দিয়েছেন- فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ ‘আপনি আপনার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে ছালাত আদায় করুন এবং কুরবানী করুন’ (কাওছার ২)
আমাদের সাহিত্য অঙ্গনে এমন আত্মত্যাগ বিজড়িত ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় বেশ কয়েক শতাব্দী পূর্ব থেকেই। কুরবানীর মহান আদর্শে আমাদের সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়েছে। ইবরাহীম (আঃ) ও ইসমাঈল (আঃ)-এর সুমহান আত্মত্যাগ অনন্য আদর্শরূপে মহিমা অর্জন করছে। কবি আলাওল, ইসমাঈল হোসেন সিরাজী, গোলাম মোস্তফা, শাহাদত হোসেন, ফররুখ আহমেদ, কাযী নযরুল ইসলাম প্রমুখ সাহিত্যরথীকে ত্যাগ-তিতিক্ষা তথা মহামানবতার আদর্শ উচ্চারণে উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করেছে। কিন্তু এ ভূ-খন্ডের সাহিত্য ক্ষেত্রে কুরবানীর মহোত্তম প্রভাব যার রচনায় সত্যিকার অর্থে প্রত্যক্ষভাবে একান্ত নিষ্ঠায় উচ্চারিত হয়েছে, তিনি আমাদের জাতীয় কবি কাযী নযরুল ইসলাম। কুরবানীর কাহিনী তার মনে এক অভাবনীয় চেতনা ও আদর্শবাদিতার সৃজন ঘটিয়েছে। এই চেতনা ও বোধ-বোধির অন্তরাল থেকেই তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘কুরবানীর’ সৃষ্টি। কুরবানী আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে যে অনন্ত, নির্বিবোধ শক্তির উদ্বোধন, তারই জয়গীতি। সত্যের পথে, ন্যায়ের পথে আত্মবিসর্জনের যে পরম শান্তি, তা লাভের জন্য প্রেরণাদান করেছেন, উদ্বুদ্ধ করেছেন কবি। এ শান্তি মানুষকে এক অনির্বচনীয় আনন্দলোকে উত্তরণ ঘটায়। এ স্বপ্ন পরিসরে কবি কাযী নযরুল ইসলামের কবিতার গুটিকয়েক চরণ উদ্বৃতির মাধ্যমে কুরবানী সম্পর্কে তাঁর ধ্যান-ধারণা, পরিচয়-পরিচিতি ও মুসলিম ঐতিহ্য-সংস্কৃতির স্বরূপ অবলোকন করা যায়। কবির ভাষায়-

ওরে হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন
ওরে শক্তি-হস্তে মুক্তি, শক্তি রক্তে সুপ্ত শোন।
এই ইবরাহীম আজ কুরবানী কর শ্রেষ্ঠ পুত্র ধন!
খুন এ যে, এতে গোর্দা ঢের রে, ত্যাগে বুদ্ধ মন।
এতে মা রাখে পুত্র পণ!
তাই জননী হাজেরা বেটারে পরালো বলির পূত বসন।
ওরে মুক্তি স্বাধীনতা দেবে এই সে খুন-মোচন!
আজ আল্লাহর নামে জান কুরবানে ঈদের পূত বোধন।
ওরে হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন

মুসলিম বিশ্বের প্রতিটি দেশ ও জনপদে কুরবানীর ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বিশেষ গুরুত্ব ও মর্যাদার সাথে উদযাপন করা হয়। কুরবানীর দিনগুলোতে সরকারী ছুটি ঘোষিত হয়, দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক ও ত্রৈমাসিক প্রায় প্রতিটি সংবাদপত্র ও ম্যাগাজিনে কুরবানী ঈদের বিশেষ ক্রোড়পত্র ছাপানো হয়। কোন কোন সংবাদপত্র ও ম্যাগাজিন কর্তৃপক্ষ বহু পৃষ্ঠাব্যাপী কুরবানীর ঈদ সংখ্যা ছাপেন। ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়ায় বিশেষ অনুষ্ঠান মালা পরিবেশিত হয়। ব্যবসা-বাণিজ্য, লেখা-পড়া ও চাকুরীর জন্য বাড়ী থেকে দূর-দূরান্তে চলে যাওয়া মানুষগুলো পরিবার-পরিজনের সাথে কুরবানীতে অংশগ্রহণের জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হ’লেও বাড়ীতে চলে আসেন। শহরে-বন্দরে, গ্রামে-গঞ্জে সর্বত্রই সাজ-সাজ রব পরিলক্ষিত হয়। ধনী-দরিদ্র, ইতর-ভদ্র, রাজা-প্রজা সকল ভেদাভেদ ভুলে সকলেই খোলা আকাশের নীচে এক কাতারে দাঁড়িয়ে ঈদের ছালাত আদায় করে। ছালাতের পর সকলে একসাথে কুরবানী করে কুরবানীর গোশত গরীব-দুঃখী, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনদের মাঝে বিতরণের যে ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি তা সত্যিই অবিস্মরণীয়।
আরব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে কুরবানী :
আরব দেশে প্রাচীনকালে ‘আতিয়া’ ও ‘ফারা’ নামক দু’ধরনের বলিদান অনুষ্ঠান বা এক বিশেষ ধরনের কুরবানী প্রথা চালু ছিল। রজব মাসে অনুষ্ঠিত হ’ত বলে এ কুরবানীকে রাজাবিয়াহও বলা হ’ত। যে দেবতার নামে এই বলিদান অনুষ্ঠিত হ’ত বলিদানের পর নিহত পশুর রক্ত তার উপর নিক্ষেপ বা লেপন করা হ’ত। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এসব অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ করেন (বুখারী হা/৫০৫১; মুসলিম হা/৩৬৫২)
জাহেলী যুগে আরববাসীগণ লাত, উযযা, হুবল এবং বিভিন্ন গোত্রের সাথে সম্পৃক্ত এমনি ধরনের অজস্র বুত-প্রতিমা তথা গায়রুল্লাহর উদ্দেশ্যে কুরবানী করত। স্বীয় পুত্রের প্রাণ বলি দিয়ে প্রতিমার উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা নিবেদন করত। অনেকেই মূর্তির নামে নিজ নিজ সন্তানদেরকে গলা কেটে বা সমুদ্রে ডুবিয়ে অথবা আগুনে জ্বালিয়ে হত্যা করাকে পরম পূণ্যের কাজ বলে বিশ্বাস করত। এমনিভাবে তারা পশু যবেহ করে মূর্তির উপর চড়িয়ে দিত। কখনও বা এইরূপ করত যে, মৃত ব্যক্তির কবরের উপর কোন জানোয়ার বেঁধে রেখে আসত এবং তাকে ঘাস-পানি অথবা কোন প্রকার খাদ্য-দ্রব্য না দিয়ে এমনিই ফেলে রাখত। অবশেষে ক্ষুধা ও পিপাসার যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে জানোয়ারটি সেখানেই মরে যেত। এহেন নিষ্ঠুর মানবতাহীন কাজটিকেও তারা কুরবানী ও পূণ্যের কাজ বলে মনে করত।
প্রত্যেক উম্মাতের কুরবানীর সংস্কৃতি ছিল :
কুরবানীর এ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি শুধু মুসলমান, হিন্দু, ইহুদী, নাছারা ও জাহেলী যুগের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল না বরং প্রত্যেক নবী-রাসূলের উম্মাতের উপর কুরবানীর বিধান ছিল। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,وَلِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنْسَكاً لِيَذْكُرُوا اسْمَ اللهِ عَلَى مَا رَزَقَهُمْ مِّنْ بَهِيْمَةِ الْأَنْعَامِ ‘প্রত্যেক উম্মাতের জন্য আমি কুরবানীর বিধান রেখেছি, যাতে তারা গৃহপালিত চতুষ্পদ জন্তুগুলো যবাহের সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে। যা তিনি তাদেরকে রিযিক হিসাবে দান করেছেন’ (হজ্জ ৩৪)
কুরবানীর ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বিলুপ্তির অপচেষ্টা এবং তা প্রতিহত করণ :
সকল ধর্মেই কুরবানীর ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রয়েছে। কেউ কোন দিন এ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধাচরণ করেছে এমনটি জানা যায় না। একমাত্র এডভোকেট তরিকুল আলম নামক জনৈক নরকের কীট ব্যতীত। বিংশ শতাব্দীর ত্রিশ শতকে উক্ত এডভোকেট এই মর্মে নিবন্ধ লিখেছিল যে, ঈদুল আযহার পশু কুরবানী দেয়া নিছক পশু হত্যা বৈ অন্য কিছু নয়! বাংলাদেশের মত কৃষি নির্ভর দেশে এ সংস্কৃতি বন্ধ করা উচিত’। এই বলে সে কুরবানীর বিরুদ্ধে আন্দোলনের ডাক দিয়েছিল এবং তার সাথে আরও কতিপয় নাস্তিক সুর মিলিয়েছিল। তৎকালীন আলেম-ওলামা, কবি-সাহিত্যিকগণ এর দাঁতভাঙ্গা জবাবও দিয়েছিলেন।
বিদ্রোহী কবির কবিতার ধমকেই সেদিন কুরবানীর বিরুদ্ধবাদীগণ হটে গিয়েছিল। এ ছাড়াও প্রখ্যাত সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদের ‘আয়না’ পুস্তকের সুবিখ্যাত ‘গো-দেওতা কা দেশ’ রচনাটিও বিরোদ্ধবাদীদের বিরুদ্ধে বিশেষ অবদান রেখেছিল।
কুরবানীর শিক্ষা :
মুসলিম মিল্লাতের পিতা ইবরাহীম (আঃ) তাঁর প্রাণপ্রিয় পুত্র ইসমাঈল (আঃ)-কে আল্লাহর রাহে কুরবানী দেয়ার সুমহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করে যেভাবে ঈমানী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মানবজাতিকে ত্যাগের শিক্ষা দিয়ে গেছেন, সে আদর্শ ও প্রেরণায় আমরা আমাদের জীবনকে ঈমানী আলোয় উজ্জীবিত করব, এটাই কুরবানীর মৌলিক শিক্ষা। ত্যাগ ছাড়া কখনোই কল্যাণকর কিছুই অর্জন করা যায় না। মহান ত্যাগের মধ্যেই রয়েছে অফুরন্ত প্রশান্তি। কুরবানী আমাদেরকে আরও শিক্ষা দেয় যে, দুনিয়াবী সকল মিথ্যা, অনাচার, অবিচার, অত্যাচার, যুলুম, হানাহানি, স্বার্থপরতা, দাম্ভিকতা, অহমিকা, লোভ-লালসা ত্যাগ করে পৃথিবীতে শান্তি ও সাম্যের পতাকা সমুন্নত রাখতে।
পশু কুরবানী মূলত নিজের নফস তথা কুপ্রবৃত্তিকে কুরবানী করার প্রতীক। কুরবানী আমাদেরকে সকল প্রকার লোভ-লালসা, পার্থিব স্বার্থপরতা ও ইন্দ্রিয় কামনা-বাসনার জৈবিক আবিলতা হ’তে মুক্ত ও পবিত্র হয়ে মহান স্রষ্টার প্রতি নিবেদিত বান্দা হওয়ার প্রেরণা যোগায় এবং সত্য ও হকের পক্ষে আত্মোৎসর্গ করতে অনুপ্রাণিত করে। কুরবানীর স্বার্থকতা এখানেই। তাই পশুর গলায় ছুরি চালানোর সঙ্গে সঙ্গে যাবতীয় পাপ-পঙ্কিলতা, কুফর, শিরক, হিংসা-বিদ্বেষ, ক্রোধ, রিয়া, পরচর্চা-পরনিন্দা, পরশ্রীকাতরতা, আত্মগর্ব, আত্মঅহংকার, কৃপণতা, ধনলিপ্সা, দুনিয়ার মায়া-মুহাববত কলুষতার মত যেসব জঘণ্য পশুসুলভ আচরণ সযত্নে লালিত হচ্ছে তারও কেন্দ্রমূলে ছুরি চালাতে হবে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে, প্রতিটি পদক্ষেপে প্রতিটি মুহূর্তে প্রভুর আনুগত্য, আজ্ঞাপালন ও তাক্বওয়ার দ্বিধাহীন শপথ গ্রহণ করতে হবে।

উপসংহার :

পরিশেষে আমরা বলতে পারি, কুরবানীর ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি শুধু মুসলিম মিল্লাতের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। যুগ-যুগান্তরের প্রতিটি ধর্মে কুরবানীর ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু অন্যান্য ধর্মের কুরবানীর পদ্ধতি ও মুসলিম মিল্লাতের কুরবানীর পদ্ধতির মাঝে বহু বৈসাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। মুসলমানদের কুরবানী নিছক কোন আনন্দ-উল্লাসের উৎসব নয়, বরং এটি আত্মত্যাগ, আত্মোৎসর্গ, আত্মসমর্পণের একটি সমুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এটি কোন কপোল-কল্পিত উপাখ্যান বা কল্পনা ফানুসের ফলশ্রুতি নয়। বরং এ কুরবানীর সংস্কৃতির প্রবর্তক স্বয়ং মহান আল্লাহ। মুসলিম জাতির পিতা ইবরাহীম (আঃ) ও তদীয় পুত্র ইসমাঈল (আঃ) যে অবিস্মরণীয় ত্যাগ, আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা ও আনুগত্যের চরম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন সেই স্মৃতিকে চিরস্মরণীয় ও পালনীয় কল্পে কুরবানীর ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি আবহমানকাল যাবৎ চলে আসছে। শুধু পশুর গলায় ছুরি চালানোতে কোন সার্থকতা নেই, বরং কাম-রিপু, লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ, অহমিকা-দাম্ভিকতা, অবৈধ অর্থ লিপ্সা, পরচর্চা-পরনিন্দা, পরশ্রীকাতরতাসহ যাবতীয় মানবীয় পশুত্বের গলায় ছুরি চালাতে পারলেই কুরবানী সার্থকতা বয়ে আনবে। আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন- আমীন!!

**************

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s