হজ্জের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা


হজ্জ মানুষের বিশৃংখল মন, বিশৃংখল ব্যক্তিত্ব এবং বিশৃংখল জীবনের জন্য মহব্বতের এক সুশৃখংল কেন্দ্র রচনা করে যেখানে একত্রিত হয়ে মানুষ হতে পারে একে অপরের প্রাণ। এটা যে কত বড় মূল্যবান, কত শক্তিশালী একক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী তা অনুমান করা কঠিন। আরো অগ্রসর হয়ে বলা যায় হজ্জ মানুষের জীবনকে শুধু সম্মিলিত ও তৎপরই করে না। বরং তাতে ইতিহাসের একটা জীবন্তধারা বানিয়ে আপনাদেরকে তার অংশ সাব্যস্ত করে দেয়। আপনাদের মনে হবে ইতিহাসের দীর্ঘ সফরে আপনারা কোন তাৎপর্যহীন একক নন যা বিচ্ছিন্ন কোন বিন্দুতে একাকী দণ্ডায়মান। বরং আপনারা এক বিশাল এবং আলোকোজ্জ্বল কাফেলার অংশ হয়ে গেছেন যার শুরুটা ও শেষটা রয়েছে আপনাদের সঙ্গে। আপনারা শুধু খানায়ে কা’বার ও আরাফাতে অনুষ্ঠিত সম্মেলন থেকেই শক্তি পাচ্ছেন না বরং এ পথের সকল পথিককেও সাথে পাচ্ছেন এবং ইতিহাসের এ মহান আলোকধারার অংশ হয়ে শক্তি ও সামর্থ্যের এক চিরস্থায়ী ভাণ্ডার লাভে সক্ষম হচ্ছেন।
যখন কা’বাকে নিজের সামনে পাবেন তখন ভাববেন

এটাই সেই “আল বায়তুল আতীক” অর্থাৎ পবিত্র ঘর-যা পৃথিবীর প্রথম মানুষটি তার একক মা’বুদের ইবাদাতের জন্য পৃথিবীর গোলকে প্রথম টুকরোটা ওয়াকফ করেছিলেন। বিভিন্ন বিবরণ থেকে জানা যায় এটা প্রথম তৈরী করেন হযরত আদম (আ.) এবং নতুন করে এর ভিত্তি স্থাপন করেন হযরত ইবরাহীম (আ.)। পাথর অবশ্য পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু বুনিয়াদ সেটাই রয়ে গেছে এবং হাজরে আসওয়াদও তখন থেকেই আছে। চিন্তা করে দেখুন, খানায়ে কা’বা আপনাদেরকে মানবেতিহাসের সূচনার অংশীদার বানিয়ে দিয়েছে।


হযরত ইবরাহীম (আ)-এর আহ্বানের পর থেকে মানুষ এখানে আসতে শুরু করেছে এটা আপনারা সবাই জানেন। বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জানা যায় সমস্ত নবী খানায় কা’বায় হজ্জ পালন করেছেন। যে ঘরের চারিদিকে আপনারা ঘুরবেন এটাই ছিল সকলের আলস্নাহ প্রেমের কেন্দ্র। তাওয়াফের যে জায়গা দিয়ে আপনারা চলবেন সেখানে কত লক্ষ কোটি পায়ের সিল পড়েছে। প্রথম দিন থেকে হাজীদের লক্ষ-কোটি কাফেলা এখানে এসেছে। কল্পনার চোখে তাকিয়ে দেখুন, হযরত আদম (আ.) থেকে হযরত মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত এবং তারপর থেকে এ পর্যন্ত আলস্নাহর কত নেকবান্দাহ মাতাফের (তাওয়াফের জায়গা) এ সফরে আপনাদের সঙ্গী। যেন আপনাদের আগে আগে অবিচ্ছিন্নভাবে বয়ে চলেছে তারা। হাজরে আসওয়াদকে চুম্বন করবেন। এ কথায় কি কোন সন্দেহ আছে যেখানে আপনারা ঠোঁট লাগাবেন সেখানে ঠোঁট লাগিয়েছিলেন নবীগণ, নবীদের সরদার তার সাহাবাগণ এবং তার উম্মতের সব নেককার ব্যক্তিগণ। মুলতাজামে নিজের সীনা লাগাবেন এবং মনে করবেন তাঁদের সকলের সীনা সেখানে লেগেছে, সাফা ও মারওয়ায় উঠে তার মাঝখানে দৌড়াবার সময় কল্পনার নজরে পড়বে হযরত হাজেরা, নজরে পড়বে ঐ পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে দাওয়াতের প্রথম সাধারণ ঘোষণা প্রচার করেছেন সাইয়েদুনা মুহাম্মদ (সা.)। আপনারা যখন আরাফাতের ময়দানে গিয়ে দাঁড়াবেন তখন মনে হবে যেন এই কাফেলা হযরত আদম (আ.)-এর যুগ থেকে এভাবেই এখানে দাঁড়িয়ে আছে।

এরপর আপনারা দেখতে পাবেন, আলস্নাহ তাআলার ঘর এবং এই নিরাপদ শহর, ঐ সকল উজ্জ্বল ও অতুলনীয় বিবরণের বাহক যা মুহাম্মদ (সা) এর নবুওয়াত, কুরআনের অবতরণ, আসলামের দাওয়াত। হিজরতের অধ্যায়ে সংরক্ষিত আছে ঐ ঘরের একটা পাথরও এমন নেই, তার নিকটের কোন ময়দান ও ঘটনা এমন নয় যেখানে হেদায়াত, দাওয়াত, হিজরত ও জেহাদের সেই ঐতিহাসিক নকশা কোন না কোনভাবে অংকিত হয়নি এবং যা লাভ করতে পারে না কোন অনুসন্ধানী মানুষ। এ মহামূল্যবান সম্পদ দুনিয়ার অন্য কোথাও আপনাদের হস্তগত হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

আজ আমাদের একটা কথা ভাবতে হবে। ভাবতে হবে হজ্জের সময় এবং তারপরেও যে এই অফুরন্ত ভাণ্ডার থেকে আমরা কতটুকু নিতে পারব, কতটুকু রক্ষা করতে পারবো এবং মুসলিম উম্মাহর ভবিষ্যৎ পুঁজি হিসাবে এর কতটুকু কাজে লাগাতে পারবো।

বর্তমানে আমাদের অবস্থাটা কোথায়? পূর্ব হতে পশ্চিম পর্যন্ত এক নজর তাকিয়ে দেখুন। মুসলিম উম্মাহর মধ্যে হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর কোন রং আছে কী? এমন রং নজরে পড়ে কি যা দেখে মুসলিম এবং মুশরিকের মধ্যে পার্থক্য করা যায়? নিজের অন্তরের দিকে তাকান। তা তাদের মতই অসংখ্য টুকরায় বিভক্ত এবং প্রত্যেক টুকরায় বসে আছে একেকজন উপাস্য এবং যা আলস্নাহর নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় তার স্থান সবচেয়ে কম। নামাজের মধ্যে আমাদের মুখ কেবলা ছাড়া আর কোন দিকে থাকে না। অথচ জীবন-যাপনের ক্ষেত্রে তাদের মতই আমাদের সামনে থাকে অসংখ্য কেবলা যা আমাদের আবেগ-অনুভূতির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। আমাদের মুখে থাকে লাব্বায়িক ধ্বনি কিন্তু না আমরা নিজেদেরকে অথবা আমাদের প্রিয় কোন কিছুকে তার জন্য উৎসর্গ করতে প্রস্তুত। প্রত্যেকটি হুকুম পালন করার ক্ষেত্রে আমাদের মনের কোন না কোন ইচ্ছা, আমাদের পছন্দ ও অপছন্দ এবং প্রিয় ও অপ্রিয় বস্তুর কুরবানী প্রতিরুদ্ধ হয়ে যায় অথবা হাজারো আশংকা ও ভীতি চারদিক থেকে ঘিরে ধরে আমাদের চলার পথ রুদ্ধ করে দেয়। হজ্জ অথবা কেবলামুখী হওয়া প্রাণহীন প্রথাগত উপাসনায় পরিণত হয়েছে। তা আজ না আমাদের অন্তর জাগ্রত করতে পারে, না আমাদের দৃষ্টিতে পবিত্রতা ও একাগ্রতা আনতে পারে, না পারে আমাদের আমল উপযুক্ত বানাতে। আমাদের চিন্তা, ব্যক্তিত্ব ও জিন্দেগীকেও পারে না পরিবর্তন করতে।

আমরা হজ্জও করি, উমরাহও করতে যাই। মুখ কা’বার দিকে রেখে নামাজও আদায় করি। কিন্তু আমাদের উপর সেই রং দেখা যায় না যা ছিল হযরত ইবরাহীম (আ:)-এর রং। এরচেয়ে বড় বদনসীবী আর কি হতে পারে? যে ভাগ্য বিড়ম্বনা আমাদের জন্য নির্ধারিত হয়েছে তার কারণে উক্ত রং থেকে বঞ্চিত থাকাটাই স্বাভাবিক, আমাদের জন্য দুনিয়ার জীবনে খেলাফত প্রদানের ওয়াদা, দীনের বিজয় ও ভীতি থেকে নিরাপত্তা দানের অঙ্গীকার পূরণের শর্ত কি এই নয় যে, আমরা আলস্নাহর বান্দাহ হবো এবং আমাদের বন্দেগী তিনি ছাড়া আর কারও জন্য হবে না।

ভেবে দেখুন, মুসলিম উম্মাহর কিশতী আজ যে বাঁকে পড়ে আছে হযরত ইবরাহীম (আ:) ও হাজেরা (আ:)-এর মত আলস্নাহর উপর ভরসা, তার আনুগত্য ও তার জন্য সবকিছু উৎসর্গ করা এবং তাঁর পথে জান-মাল দিয়ে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়া ছাড়া সেখান থেকে উদ্ধার পাওয়ার কোন রাস্তা মিলবে কি? যার চোখের সামনে প্রতিদিন পাঁচবার আলস্নাহর ঘরের সুস্পষ্ট নিদর্শনগুলো উপস্থিত করার ব্যবস্থা করা হয়েছে তার মনের মধ্যে এ হতাশা আসতে পারে কি যে, এমন ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতির সংশোধন কি করে হবে, এমন অাঁধার কালো অবস্থা কিভাবে বদলাবে, এমন অনুর্বর ও কঠিন হূদয় মানুষের মাঝে সৎকর্মের ঝর্ণা কেমনে বেরুবে, এমন ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে কোত্থেকে এবং কিভাবে আলোর উদয় ঘটবে, জুলুম ও শোষণের শিলাভূমিতে কিভাবে রাস্তা তৈরী হবে, সামান্য প্রচেষ্টা কেমনে রং পাবে, জবরদস্ত বিরোধী শক্তির মোকাবেলা কি দিয়ে হবে? “তাহলে আলস্নাহ আমাদের ধ্বংস করবে না।” “আমি আলস্নাহর উপর সন্তুষ্ট” অবলা নারীর এ বিশ্বাস ও ঘোষণা এবং সাফা-মারওয়ার মাঝে তার ছুটাছুটির ফলে যদি আলস্নাহতাআলা পাথরের একটা সাধারণ ঘরকে এতবড় মর্যাদা ও কঠিন শিলাভূমিতে জমজমের ঝরনা প্রবাহিত করে থাকেন তাহলে বর্তমান দুনিয়ায় ইসলামের প্রসার কেন হবে না এবং জুলম ও ফাসাদে ভরপুর জগতে সৎকর্মের ঝরনা কেন প্রবাহিত হবে না? দাতা অপারগ ও অক্ষম নন, তিনি তন্দ্রা ও নিদ্রার শিকার নন। গ্রহীতাই নিতে অপারগ ও অক্ষম। সে আজ নিজের উদ্দেশ্য শক্তি ও মাথা তুলে দাঁড়াবার আসল সম্পদ সম্পর্কে উদাসীনতা ও নিদ্রায় বেহুঁশ। দুনিয়া তাদের নিকট যে চেস্টা, কর্ম, আন্তরিকতা ও বিশ্বস্ততা দাবী করে তারা আজ তাকে তাদের ইচ্ছা ও অধিকার বহিভর্ূতই মনে করে। হেদায়াতের জন্য মানুষের প্রাণও ওষ্ঠাগত অশান্তির ভূমিতে যমিনের তলায় নিরাপত্তার ঝরনাও মওজুদ। বর্তমান যুগ কেবল সেই ঝর্না ধারার প্রতীক্ষায় আছে।

আপনারা কি সেই ঝরনাধারায় অবগাহন করতে প্রস্তুত আছেন? আলস্নাহ আপনাদেরকে হজ্জের নেয়ামত ও বরকত দিয়ে কামিয়াব করুন, আমীন!

খুররম মুরাদ (রহ)
গ্রন্থনা :
মাওলানা জাকির হোসাইন আজাদী

*************************

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s