সাদাকাতুল ফিতর – কি করা উচিৎ আর আমরা কি করছি। শেষ পর্ব।


সদকাতুল ফিতরের পরিমাণ :

সদকাতুল ফিতরের পরিমাণ : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগের এক সা’। যার ওজন চার শত আশি মিসকাল গম। ইংরেজী ওজনে যা দুই কেজি ৪০ গ্রাম গম। যেহেতু এক মিসকাল সমান চার গ্রাম ও এক চতুর্থাংশ হয়। সুতরাং ৪৮০ মিসকাল সমান ২০৪০ গ্রাম হয়। অতএব রাসূলের যুগের সা’ জানতে ইচ্ছা করলে, তাকে দুই কেজি চল্লিশ গ্রাম গম ওজন করে এমন পাত্রে রাখতে হবে, যা মুখ পর্যন্ত ভরে যাবে। অতঃপর তা পরিমাপ করতে হবে।

সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব হওয়ায় সময় :

ঈদের রাতে সূর্যাস্তের সময় জীবিত থাকলে তার উপর সদকাতুল ফিতর আদায় করা আবশ্যক, নতুবা নয়। সুতরাং কেউ সূর্যাস্তের এক মিনিট পূর্বে মারা গেলে তার উপর ওয়াজিব হবে না। এক মিনিট পরে মারা গেলে অবশ্যই তার পক্ষ থেকে আদায় করতে হবে। যদি কোন শিশু সূর্যাস্তের কয়েক মিনিট পর ভূমিষ্ট হয়, তার উপরও আবশ্যক হবে না, তবে আদায় করা সুন্নত। যার আলোচনা পূর্বে অতিবাহিত হয়েছে। আর সূর্যাস্তের কয়েক মিনিট পূর্বে ভুমিষ্ট হলে তার পক্ষ থেকে আদায় করতে হবে।

সদকাতুল ফিতর আবশ্যক হওয়ার ওয়াক্ত রমজানের শেষ দিনের সূর্যাস্তের পরবর্তী সময় নির্ধারণ করার কারণ হচ্ছে, তখন থেকে ফিতর তথা খাওয়ার মাধ্যমে রমজানের সিয়াম সমাপ্ত হয়। এ কারণেই একে রমজনের সদকাতুল ফিতর বা সিয়াম খোলার ফিতর বলা হয়। বুঝা গেল, ফিতর তথা সিয়াম শেষ হওয়ার সময়টাই সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব হওয়ার সময়।

সদকাতুল ফিতর আদায়ের সময় দু’ধরণের : ১. ফজিলতপূর্ণ সময় ও ২. ওয়াক্ত জাওয়াজ বা সাধারণ সময়
১. ফজিলতপূর্ণ সময় : ঈদের দিন সকালে ঈদের সালাতের পূর্বে। বুখারীতে বর্ণিত, আবূ সাঈদ খুদরী রাদিআল্লাহ আনহু বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে সদকাতুল ফিতর হিসেবে ঈদুল ফিতরের দিন এক সা’ পরিমাণ খাদ্য আদায় করতাম। ইবনে ওমর রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের ঈদের সালাত পড়তে যাওয়ার পূর্বে সদকাতুল ফিতর আদায় করার আদেশ দিয়েছে।
ইবনে উয়াইনা স্বীয় তাফসীর গ্রন্থে আমর বিন দীনারের সূত্রে ইকরামা রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, মানুষ ঈদের দিন সদকাতুল ফিতর ঈদের সালাতের পূর্বে আদায় করবে।

আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন :
‘নিশ্চয় সাফল্য লাভ করবে সে, যে শুদ্ধ হয় এবং তার পালনকর্তার নাম স্বরণ করে, অতঃপর সালাত আদায় করে।’ [ সূরা আলা ১৪-১৫]

সুতরাং ঈদুল ফিতরের সালাত একটু বিলম্বে আদায় করা উত্তম। যাতে মানুষ সদকাতুল ফিতর আদায় করতে পারে।

২. জায়েজ সময় : ঈদের একদিন দু’দিন পূর্বে সদকাতুল ফিতর আদায় করা।

বুখারীতে আছে, নাফে রাদিআল্লাহু আনহু বলেন, ইবনে ওমর রাদিআল্লাহু আনহু নিজের এবং ছোট-বড় সন্তানদের পক্ষ থেকে সদকাতুল ফিতর আদায় করতেন, এমনকি আমার সন্তানদের পক্ষ হতেও। তিনি জাকাতের হকদারদের ঈদের একদিন বা দুদিন পূর্বে সদকাতুল ফিতর দিতেন। ঈদের সালাতের পর আদায় করা জায়েজ নেই। অতএব, বিনা কারণে সালাতের পর বিলম্ব করলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। কারণ, তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিদের্শের পরিপন্থী। পূর্বে ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু এর হাদিস উদ্ধৃত হয়েছে, যে ব্যক্তি সদকাতুল ফিতর ঈদের সালাতের পূর্বে আদায় করবে, তার দান সদকাতুল ফিতর হিসেবে গণ্য হবে। আর যে ঈদের সালাতের পর আদায় করবে, তা অন্যান্য সাধারণ দানের মত একটি দান হিসেবে গণ্য হবে। যদি কোন কারণ বশত বিলম্ব করে, তাহলে কোন অসুবিধা নেই। যেমন সে এমন স্থানে আছে যে, তার নিকট আদায় করার মত কোন বস্তু নেই বা এমন কোন ব্যক্তিও নেই, যে এর হকদার হবে। অথবা হঠাৎ তার নিকট ঈদের সালাতের সংবাদ পৌঁছল, যে কারণে সে সালাতের পূর্বে আদায় করার সুযোগ পেল না। অথবা সে কোন ব্যক্তিকে দায়িত্ব দিয়েছিল, যে তা আদায় করতে ভুলে গেছে। এমতাবস্থায় সালাতের পর আদায় করলে কোন অসুবিধা নেই। কারণ সে অপারগ।

ওয়াজিব হচ্ছে, সদকাতুল ফিতর তার প্রাপকের হাতে সরাসরি বা উকিলের মাধ্যমে যথাসময়ে সালাতের পূর্বে পৌঁছানো। যদি নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তিকে প্রদানের নিয়ত করে, অথচ তার সঙ্গে বা তার নিকট পৌঁছতে পারে এমন কারো সঙ্গে সাক্ষাত না হয়, তাহলে অন্য কোন উপযুক্ত ব্যক্তিকে প্রদান করবে, বিলম্ব করবে না।

সদকাতুল ফিতর প্রদানের স্থান :

সদকাতুল ফিতর প্রদানের সময় যে এলাকায় সে অবস্থান করছে ঐ এলাকার গরীবরাই বেশী হকদার। উক্ত এলাকায় সে স্থায়ী হোক বা অস্থায়ী। কিন্তু যদি তার বসতি এলাকায় কোন হকদার না থাকে বা হকদার চেনা অসম্ভব হয়, তাহলে তার পক্ষে উকিল নিযুক্ত করবে। সে উপযুক্ত ব্যক্তি খুঁজে তার সদকাতুল ফিতর আদায় করে দিবে ।

সদকাতুল ফিতরের হকদার :

সদকাতুল ফিতর হকদার হচেছ (১) দরিদ্র (২) ঋণ আদায়ে অক্ষম (৩) ঋণগ্রস্ত, তাকে প্রয়োজন পরিমাণ দেয়া যাবে। এক সদকাতুল ফিতর অনেক ফকীরকে দেয়া যাবে এবং অনেক সদকাতুল ফিতর এক মিসকিনকেও দেয়া যাবে। যেহেতু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সদকাতুল ফিতরের পরিমাণ নির্ধারণ করেছেন, কিন্তু হকদারকে কি পরিমাণ দিতে হবে তা নির্ধারণ করেননি। সুতরাং যদি অনেক ব্যক্তি তাদের সদকাতুল ফিতর ওজন করার পর একটি পাত্রে জমা করে এবং সেখান থেকে তা পুনরায় পরিমাপ ছাড়া বণ্টন করে, তবে তা বৈধ হবে। কিন্তু ফকীরকে জানিয়ে দেয়া উচিৎ। তাকে তারা যা দিচ্ছে তার পরিমাণ তারা জানে না। ফকীরের জন্য বৈধ, কারো থেকে সদকাতুল ফিতর গ্রহণের পর নিজের পক্ষ থেকে বা পরিবারের অন্য সদস্যের পক্ষ থেকে দাতার কথায় বিশ্বাস করে পরিমাপ ছাড়াই কাউকে কিছু দেয়া।

হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে আপনার সন্তুষ্টি অনুযায়ী আনুগত্য করার তওফিক দিন। আমাদের আত্মা, কথা ও কাজ শুদ্ধ করে দিন। আমাদেরকে বিশ্বাস, কথা ও কাজের ভ্রষ্টতা থেকে পবিত্র করুন। নিশ্চয়ই আপনি উত্তম দানশীল ও করুনাময়। হে আল্লাহ! আখেরী নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর এবং তার সকল পরিবার ও সাহাবাগণের উপর দরূদ ও সালাম বর্ষণ করুন। আমীন

***************************

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s