সমাজে প্রচলিত কতিপয় ভুল ধারণা


আমাদের সমাজে প্রচলিত ধর্ম বিশ্বাসের কিছু বিষয় আছে যা, ইসলামী আকিদার পরিপন্থী, সেরকম কিছু বিষয় আলোচনা করা হল-

মিলাদে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) গায়েব জানেন বলে বিশ্বাস করা :

একদল মানুষ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নামে মিলাদ নামক বিদ’আত অনুষ্ঠানে চেয়ার খালি রাখে এবং ধারণা রাখে যে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এসে চেয়ারে বসেন। আবার তারা হঠাৎ করে মিলাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়ে এবং ধারণা করে যে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর রুহ মোবারক মিলাদ মাহফিলে উপস্থিত হয়ে থাকে- তাই দাঁড়াতে হয়। একই দিনে একই সাথে হাজার স্থানে মিলাদ হয়ে থাকে, এরূপ ক্ষমতা আল্লাহ ছাড়া আর কারো নেই। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন-

“নিশ্চয়ই আল্লাহ সকল বিষয়ে ক্ষমতা রাখেন। (সূরা বাকারা ২:১০৯)

আর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তো মৃত্যুবরণ করেছেন, যাঁর মৃত্যুকে উমার (রা) অতিরিক্ত ভালবাসার কারণে প্রথমে মেনে নিতে পারছিলেন না। তিনি খোলা তরবারী নিয়ে ঘোষনা করেছিলেন- যে বলবে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মারা গেছেন তার গর্দান উড়িয়ে দেয়া হবে। অতঃপর আবু বকর (রা) এসে রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর মৃত্যুর স্বপক্ষে কুরআনের এ আয়াত পাঠ করলেন-

“মুহাম্মদ একজন রাসুল ছাড়া কিছু নয়, তাঁর পূর্বে বহু রাসুল গত হয়েছেন। যদি তিনি মারা যান কিংবা নিহত হন তবে কি তোমরা পশ্চাতবরণ করবে ? এবং কেউ পিছটান হলে কখনো সে আল্লাহর সামান্য ক্ষতি করতেও সক্ষম হবে না; আল্লাহ কৃতজ্ঞদের সত্বরই পুরষ্কার দিবেন”। (সূরা আলে ইমরান ৩:১৪৪)

অতঃপর উমার (রা) এ আয়াত শ্রবন করে নিস্তেজ হয়ে যান এবং তার হাত থেকে তরবারী পড়ে যায়। অতএব যারা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে মিলাদে উপস্থিত হন বলে মনে করবে তারা উক্ত আয়াতকে অস্বীকার করল। রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে আল্লাহর মত সকল স্থানে উপস্থিত হতে পারে বলে মনে করলে শিরক হবে। আর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তো জানেন না কোথায় কোথায় মিলাদ হচ্ছে। কেননা তিনি গায়েব জানেন না। মহান আল্লাহ কুরআন মাজীদে রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দ্বারা ঘোষনা করান-

“বলুন! আমি নিজের কল্যাণ-অকল্যাণ সাধনের মালিক নই। কিন্তু আল্লাহ যা চান। আমি যদি গায়েব জানতাম, তাহলে আমি অধিক কল্যান অর্জন করে নিতাম এবং অকল্যান আমাকে স্পর্শ করত না”। (সূরা আল-আ’রাফ ৭:১৮৮)

“(হে নবী) বলুন! আসমান ও জমীনে আল্লাহ ব্যতীত কেউ গায়েবের ব্যাপারে জানে না”। (সূরা নামল ২৭:৬৫)

অতএব গায়েবের ঈলম একমাত্র আল্লাহই জানেন। এ ইলম নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সাথে সম্পৃক্ত করলে আল্লাহর সাথে শিরক্ হবে। এমনিভাবে কেউ যদি রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মিলাদে উপস্থিত হন এ আকিদাহ পোষণ করে তবে আল্লাহর আয়াত অস্বীকারকারী হয়ে যাবে।

 

পীর-দরবেশ, ওলী-আউলিয়া এবং কবরে শায়িতদের নিকট দোয়া করা :

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন-

“আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে ডাকবে না, যে তোমার উপকার করতে পারবে না ও অপকারও করতে পারবে না। যদি তুমি অন্যকে ডাক তাহলে তুমি যালিমদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যাবে”। (সূরা ইউনুস ১০:১০৬)

“অতএব আপনি আল্লাহর সাথে অন্য উপাস্যকে ডাকবেন না। ডাকলে আযাব প্রাপ্তদের অন্তরর্ভূক্ত হয়ে যাবেন”। (সূরা শুয়ারা ২৬:২১৩)

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আরও বলেন-

“যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত এমন বস্তুকে ডাকে যে কেয়ামত পর্যন্ত তার ডাকে সাড়া দিবে না, তার চেয়ে অধিক পথভ্রষ্ট আর কে হতে পারে? তারা তাদেও ডাকা সম্পর্কে খবরও রাখে না। যখন মানুষকে হাশরের ময়দানে একত্রিত করা হবে, তখন তারা তাদেও শত্রু হবে এবং তাদের ইবাদতের কথা অস্বীকার করবে”। (সূরা আহকাফ ৪৬: ৫-৬)

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা অন্যত্র বলেন-

“আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদেরকে ডাক, তারা তুচ্ছ খেজুর আঁটির মালিকও নয়। তোমরা তাদেরকে ডাকলে তারা তোমাদের সে ডাক শুনে না। শুনলেও তোমাদেও ডাকে সাড়া দেয় না। কিয়ামতের দিন তারা তোমদের শিরকের কথা অস্বীকার করবে। বস্তুত আল্লাহর ন্যায় তোমাদেরকে কেউ অবহিত করতে পারবে না”। (সূরা ফাতিরঃ১৩-১৪)

আবদুলাহ ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্নিত নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত অন্যকে ডাকে,আর এ অবস্থায় মারা যায় সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। (বুখারী)

কবরবাসীরা জীবিতদের ডাকে সাড়া দিতে অক্ষম

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন-

“আপনি মৃতদেরকে শোনাতে পারবেন না, বধিরকেও আহ্বান শোনাতে পারবেন না, যখন তারা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে চলে যায়”। (সূরা নামল ২৭: ৮০)

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা অন্যত্র বলেন-

“আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদেরকে ডাক, তারা তুচ্ছ খেজুর আঁটির মালিকও নয়। তোমরা তাদেরকে ডাকলে তারা তোমাদের সে ডাক শুনে না। শুনলেও তোমাদেও ডাকে সাড়া দেয় না”। (সূরা ফাতিরঃ১৩-১৪)

যারা কথা শুনে না তারা কিভাবে অপরকে সাহায্য করবে? অপরকে সান্ত্বনা দিবে, অপরের মাকসুদ পূর্ন করবে? বরং তারা নিজেরা নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত।

পীর-দরবেশ, ওলী- আউলিয়ার কথা অন্ধ অনুসরন করা :

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন-

“তেমাদের রবের পক্ষ থেকে যা অবতীর্ন হয়েছে তোমরা তার অনুসরণ করো এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে অলী-আউলিয়াদেরও অনুসরণ করো না। তোমরা অল্প সংখ্যকই তা স্মরণ রাখো”। (সূরা আল-আরাফ ৭:৩ )

অতএব নাজিলকৃত বিষয়কে বাদ দিয়ে পীর, অলীদের অনুসরণ করলে আল্লাহর সাথে শরীক্ করা হলো। আর যারা আল্লাহরসাথে শরীক করেছে এবং তারা ওদেরকে রব সাব্যস্ত করার মাধ্যমে মুশরিক হয়ে যাবে। আদী বিন হাতিম থেকে বর্ণিত, তিনি রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে পড়তে শুনেনঃ

‘‘তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাদের আলেম এবং দরবেশদেরকে রব হিসেবে গ্রহন করেছে”। (আদী বললেন) আমি তাঁকে বললাম, আমরা তো তাদের ইবাদত করতাম না। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ আল্লাহ যা হালাল করেছেন তারা কি তা হারাম করে না? অতঃপর তোমরা তা হারাম মেনে নাও।অপরদিকে আল্লাহ যা হারাম করেছেন তারা তা হালাল করে না? অতঃপর তোমরা তা মেনে নাও। অতঃপর আমি বললাম- হ্যাঁ। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ এটাই তাদের ইবাদত। অর্থাৎ এভাবেই তারা তাদেরকে রবরূপে গ্রহন করেছে”। (তিরমিজি, মুসনাদে আহমাদ)

কবর-মাযার-দগায় দান বা ভোগ দেয়া :

তরীক বিন শিহাব হতে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ একটি মাছির কারণে এক ব্যাক্তি জান্নাতে গিয়েছে এবং একটি মাছির কারণে এক ব্যক্তি জাহান্নামে গিয়েছে। সাহাবাগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! এটা কিভাবে? রাসুলুল্লাহ(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ

“দু’ব্যক্তি এক গোত্রের নিকট দিয়ে যাচ্ছিল, আর তাদের একটি মূর্তি ছিল, সে মূর্তিকে কিছু না দিয়ে কেউ অতিক্রম করতে পারতনা। অতঃপর তারা (মাজারের খাদেমরা) দু’জনের একজনকে বলল , কিছু দিয়ে যাও।সে বলল, আমার নিকট কিছুই নেই যা আমি পেশ করব। তারা তাকে বললঃ একটি মাছি হলেও দিয়ে যাও। অতঃপর সে একটি মাছি দান করল; আর তারা তার রাস্তা ছেড়ে দিল। অতঃপর সে জাহান্নামে প্রবেম করল। তারা মাযারের খাদেমকে বললঃ কিছু দিয়ে যাও। লোকটি বলল, আমি মহান আল্লাহ ব্যতীত কাউকে কিছু দান করি না। তারা লোকটিকে হত্যা করল। অতঃপর লোকটি জান্নাতে প্রবেশ করল। (মুসনাদে আহমাদ, কিতাবুত তাওহীদ ৫২ পৃঃ)

তাবারুক হাসিলের জন্য গাছের নিকট ভোগ দেয়া :

আবু ওয়াকেদ লাইসী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সাথে হুনাইনে যাচ্ছিলাম আর আমরা তখনো নতুন মুসলিম ছিলাম। মুশরিকদের জন্য একটি বরই গাছ ছিল তারা গাছটির নিকট অবস্থান করত এবং তাতে অস্ত্র ঝুলিয়ে রাখত। তাকে যাতে আনওয়াত বলা হতো। আমরা একটি বরই গাছের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলাম। আমরা বললামঃ হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের জন্য যাতে আনওয়াত বানিয়ে দিন যেমনভাবে তাদের জন্য যাতে আনওয়াত রয়েছে। অতঃপর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ আলাহু আকবার ঐ সত্বার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ! এটা এমন একটি নীতি যা তোমরা বললে যেমন বলেছিল বনী ইসরাঈলরা মুসা (আ) কে- “আমাদের জন্য আপনি মা’বুদ বানিয়ে দিন যেমন তাদের মা’বুদ রয়েছে। তিনি বললেনঃ তোমরা বড়ই নির্বোধ সম্প্রদায়। তোমরা এমন নীতির অনুকরণ করবে যে নীতির উপর তোমদের পূর্ববর্তীরাও ছিল। (তিরমিজি ২য় খন্ড ৪১পৃঃ, আহমাদ, মুসনাদে আবদুর রাজ্জাক, ইবনু জারীর, ইবনু মুনযির, ইবনু আবি হাতিম, তাবারানী)

আল্লাহ ব্যতীত বাপ-দাদা, মাতা, পীর-দরবেশ কিংবা অন্যকিছুর নামে কসম করা –

আবদুর রহমান বিন সামুরাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ রাসুলুলাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ “তোমরা তাগুতের নামে ও বাপ-দাদার নামে কসম করো না”। (মুসলিম ২য় খন্ড ৪৬ পৃঃ)

আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুলাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ

“তোমরা তোমাদেও বাপ-দাদার নামে,মা-নানীর নামে এবং প্রতিমার নামে কসম করো না এবং আল্লাহর নামে সত্য কসম ব্যতীত কসম করো না”। (আবু দাউদ ২য় খন্ড)

আবদুলাহ বিন উমার (রা) থেকে বর্ণিত,তিনি বলেনঃ আমি রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নমে কসম করল সে শিরকই করল। (তিরমিজি, আবু দাউদ ২য় খন্ড ৪৬৩ পৃঃ)

নবী (সাঃ) কে নূরের তৈরী মনে করা

এক শ্রেনীর মানুষ বলে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে তৈরী না করলে আল্লাহ কিছুই সৃষ্টি করতেন না। আল্লাহ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে তাঁর নিজের নূর দিয়ে তৈরী করেছেন, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নূরের তৈরী। আর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নূরে সমস্ত জগত তৈরী। সর্ব প্রথম আল্লাহ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে তাঁর নূর দ্বারা সৃষ্টি করেছেন, এভাবে তারা আল্লাহর সাথে শিরক্ করে থাকে। অথচ সহীহ হাদীসে রয়েছে আল্লাহ সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করে তাকে লিখতে বলেন। আবদুলাহ বিন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত; তিনি বলেনঃ রাসুলুলাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ

“আল্লাহ সর্বপ্রথম কলম ও মাছ সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর কলমকে বলেছেনঃ লিখ,কলম বলল কি লিখব? আল্লাহ বললেন, কিয়ামত পর্যন্ত যা সংঘটিত হবে সব লিখ”। (তাবারানী, ইবনু জারীর, ইবনু আসাকির, ইবনু আবি হাতিম, আহমাদ, তিরমিজি)

আর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে আল্লাহ মাটির তৈরী আদমের থেকে স্বাভাবিক মানুষের যে নিয়ম আল্লাহ করেছেন সে পদ্ধতিতেই আবদুল্লাহর ওরসে মা আমিনার গর্ভে এ পৃথিবীতে আগমন ঘটিয়েছেন। আল্লাহর নূরে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পয়দা হলে মাতৃগর্ভে অপবিত্র রক্তের সাথে ভুমিষ্ট হতেন না। তিনি মাটির তৈরী বলেই অন্যান্য মানুষের মত ভুমিষ্ট হয়েছেন। তবে চল্লিশ বছর বয়সে আল্লাহ তাঁকে রিসালাত দিয়েছেন। তাঁর নিকট আল্লাহর ওয়াহী আসত,কুরআন মাজীদ তাঁর প্রতি নাজল হয়েছিল। তারপরও তিনি একজন মানুষ ছিলেন এবং আল্লাহর একজন বান্দা ছিলেন। যার স্বীকৃতি আমরা সর্বদা দিয়ে থাকি- ‘আবদুহু ওয়া রাসুলুহ’ বলে অর্থাৎ তিনি আল্লাহর বান্দা এবং রাসুল। মহান আল্লাহ বলেনঃ

“বলুন! আমি তোমাদের মতই একজন মানুষ। আমার নিকট ওয়াহী আসে, তোমাদের ইলাহই একমাত্র ইলাহ”। (সূরা কাহফ ১৮: ১১০)

আলোচ্য আয়াতে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উদাত্ত কন্ঠে ঘোষনা করেছেনঃ আমি মানুষ, তোমাদের মতই একজন মানুষ। তবে পার্থক্য এই যে, আমার নিকট ওয়াহী আসে। এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আকরাম খাঁ লিখেছেনঃ “মানুষের মধ্যে এসেছেন মানুষ মোস্তফা, মাটির মানুষ মোস্তফা, মানুষের দুঃখ-দরদের সংগী মোস্তফা, সব মানুষের অভাব অনুভবে সমভাগী মোস্তফা। তিনি দেবতা নন,ফেরেশতা নন, অবতার নন-তিনি হচ্ছেন আমেনা মায়ের ইয়াতীম পুত্র মোস্তফা, আবদুল মুত্তালিবের পৌত্র মোস্তফা, কোরেশের রাখাল বালক মোস্তফা”। (তাফসিরুল কুরআন, ৩য় খন্ড ৫৬৮পৃঃ)

আল্লাহর রাসুল মাটির তৈরী মানুষ ছিলেন তার কিছু প্রমান আমরা তুলে ধরছি।

প্রথম প্রমাণ-

মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অন্যান্য মানুষের মতই আদম সন্তান ছিলেন। মানুষ যেমন পানাহার করে, তেমনি মুহাম্দ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও পানাহার করতেন। অন্যান্য মানুষের যেমন সন্তানাদি ছিল, তেমনি রাসুদেরও সন্তানাদি ছিল,স্ত্রীও ছিল। মানুষের মত ভূল রাসুলেরও হত।

তিনি বলেছেনঃ “আমি মানুষ,তোমাদের মত ভূলে যাই। ভূলে গেলে অবশ্যই স্মরণ করিয়ে দেবে”।

দ্বিতীয় প্রমাণ-

অন্যান্য মানষের মত রাসুলেরও বংশ তালিকা ছিল। মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর পিতার নাম আবদুল্লাহ,মাতার নাম আমেনা, দাদার নাম আবদুল মুত্তালিব। একথা সবকলেই জানেন। রাসুল যে মানুস নবী ছিলেন কোরাইশ বংশে জন্ম গ্রহন তার বিরাট প্রমান।

তৃতীয় প্রমাণ

মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অন্যান্য মানুষের মত পানাহার করতেন। রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পানাহার করতেন এজন্য কাফেররা বলত- ‘মুহাম্মদ কেমন রাসুল যে পানাহার করে’ এ কথাটি মক্কাবাসী পৌত্তলিকদের। এ প্রশ্নের উত্তর দানে আল্লাহ ওহী পাঠালেন

“আমরা যত রাসুল পাঠিয়েছি,তাঁরা সকলেই খাদ্য গ্রহন করত। আমরা তাদের এমন দেহ গঠন করিনি যে,তারা খাদ্য গ্রহন করবে না এবং চিরস্থায়ী বসবাস করবে”।

অর্থাৎ মানষের গঠন প্রণালী অনুযায়ী বিনা আহারে বাঁচতেও পারবেনা এবং মানুষ হিসেবে তাদের কেউই চিরস্থায়ী বসবাস করতে পারবে না। যেহেতু সমস্ত নবী খাদ্য গ্রহন করতেন, সেহেতু মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও একজন খাদ্য ভক্ষণকারী রাসুল ছিলেন।

এটা তাঁর মানুষ হবার অন্যতম প্রমাণ।

চতুর্থ প্রমাণ-

রাসুল অন্যান্য নবীদের মত মৃত্যু বরণ করেছেন। এরশাদ হচ্ছে-

“নিশ্চয়ই তুমি মৃত্যুবরণ করবে এবং তারা সকলে মৃত্যু বরণ করবে”। (সূরা যুমার ৩৯:৬)।

রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অতি মানব ছিলেন না যে তিনি মৃত্যু বরণ করবেন না। বরং তিনি ছিলেন মানুষ নবী,তাই তাঁর মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী ছিল।

উল্লেখিত প্রমাণাদি দ্বারা একথা সুস্পষ্ট হয়ে গিয়েছে যে, মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একজন মানুষ নবী ছিলেন। অন্যান্য মানুষের মতই তাঁর স্ত্রী-পুত্র-কন্যা ছিল। অন্যান্য মানুষের মত তিনিও পানাহার করতেন এবং পরলোক গমন করেছেন। আর একথা কিভাবে গ্রহণ করা যায় যে, তিনি নূরের তৈরী, অথচ যাকে মানব জাতির হেদায়েতের জন্য, অনুসরণীয় একমাত্র আদর্শ হিসেবে আল্লাহ পাঠালেন মাটির মানুষদের কাছে। নূরের তৈরী সৃষ্টির প্রকৃতি,চাল-চলন তো হবে ভিন্ন, তাকে কিভাবে মানুষ পুরোপুরি আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে তার যথাযথ অনুসরণ করবে। যাদের বিবেক বুদ্ধি আছে, তারা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন এ ব্যাপারে আর কোন সংশয়ের অবকাশ থাকে না।

**************************

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s