নক্ষত্রসমূহের প্রকৃতি,বিপরীত বস্তুর উপস্থিতি ও বিচার দিবসে মহাশূন্যের সবকিছুর পরিসমাপ্তি


নক্ষত্রসমূহের প্রকৃতি

 

আর আমি (আল্লাহ) নিকটবর্তী আসমানকে সুসজ্জিত করেছি
‘মাসাবিহ’ (প্রদীপমালা) দিয়ে। (ফুসসিলাত, ৪১ : ১২, মূলক,
৬৭ : ০৫)

কুরআন মাজিদ মানুষকে আল্লাহ তাআলার নিদর্শনসমূহে চিন্তা-ভাবনা
করার দাওয়াত দেয়। উল্লিখিত আয়াতসমূহ নক্ষত্ররাজিকে একটি বিশেষ
পারিভাষিক শব্দ ‘মাসাবিহ’-এর মাধ্যমে নির্দেশ করছে। যার অর্থ
‘প্রদীপসমূহ’। এ ক্ষেত্রে চিন্তা করে দেখা উচিত, এটা কি নক্ষত্ররাজির
কেবল এক বাহ্যিক বর্ণনা নাকি কুরআন মাজিদ আমাদেরকে নক্ষত্রসমূহের
আনবিক ও রাসায়নিক প্রকৃতির প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করে? মহাকাশ বিজ্ঞানের
সাম্প্রতিক উনড়বয়ন, বিশেষত বিগত দুই দশকের অগ্রগতি দেখিয়েছে যে,
নক্ষত্রগুলিতে এক ধরনের জ্বালানি জ্বলে আলো ও তাপ বিকিরণ করে,
যেমনটি হয়ে থাকে একটি প্রদীপে।

এটা এখন জ্ঞাত বিষয় যে, নক্ষত্রগুলো অসংখ্য অণুর সমন্বয়ে গঠিত। এই
অণুর নিউক্লিয়াসের চারপাশে ইলেক্ট্রনগুলো আবর্তিত হয়। ফলে নক্ষত্রগুলির
রয়েছে একটি নির্দিষ্ট Volume। আরও আছে বিচ্ছুরিত আলো ও শক্তি।
একটি নক্ষত্রের মৃত্যু মানে তার সেই আলোর শক্তি নিঃশেষিত হওয়া, যা
তার Volume নিয়ন্ত্রণ করে। মহাকাশে দুই ধরনের মহাকাশীয় অবস্থান
রয়েছে। যাদের নাম ‘শুভ্র গহ্বর’ বা কাউসার এবং কৃষ্ণ গহ্বর। প্রথমটি
অভাবনীয় পরিমাণ শক্তির উৎস। পরবর্তী অবস্থানটি হল সেই শূন্যস্থান যা
নক্ষত্রের মৃত্যুর ফলে সৃষ্টি হয়। যখন কোনো নক্ষত্রের মৃত্যু হয় তখন তা
তার মধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে সংকুচিত হয়ে যায়। মৃত নক্ষত্রটি আয়তনে
যত বড় হয়, তার মধ্যাকর্ষীয় সংকোচন ততই নিবিড় হয়, এমনকী তা তার
নিউক্লিয় স্তরে গিয়েই ক্ষান্ত হয় না; বরং আরো সংকুচিত হয়ে এমন এক
অবস্থায় উপনীত হয়, যাকে বলা হয় Singularity. এটি একটি কৃষ্ণ
গহ্বর তৈরি করে যা কোনোভাবেই দেখা যায় না। নক্ষত্রের আলো বিচ্ছুরণ
এবং পতনের সমগ্র প্রক্রিয়া নির্ভর করে তার শক্তির মাত্রা বা
Energy Level-এর ওপর। এটিকে সেই কারণ বলে ব্যাখ্যা দেওয়া যেতে পারে,
যার ফলে কুরআন মাজিদ এগুলিকে ‘প্রদীপসমূহ’ বলে আখ্যায়িত করেছে।

বিপরীত বস্তুর উপস্থিতি

 

পবিত্র ও মহান সে সত্তা যিনি সবকিছু জোড়া জোড়া সৃষ্টি করেছেন,
পৃথিবী যা উৎপন্ন করে তা থেকে, তাদের (মানুষের) নিজেদের
মধ্য থেকে এবং সেসব কিছু থেকেও যা তারা জানে না। (ইয়াসিন,
৩৬ : ৩৬)

 

বলার অপেক্ষা রাখে না, পৃথিবী বিভিন্ন খনিজ পদার্থ উৎপাদন করে।
বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণা প্রমাণ করেছে, প্রত্যেক খনিজ পদার্থই হয়ত
ধনাত্মক কিংবা ঋনাত্মক আধান (Charge) বিশিষ্ট অতি পারমাণবিক
কণিকা দ্বারা গঠিত। কুরআন মাজিদে এই সত্যটি অবতীর্ণ হয়েছে এই বলে,
পৃথিবী থেকে উৎপাদিত সকল বস্তুই জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করা হয়েছে।
খনিজ পদার্থের পাশাপাশি এমনকি পানিও যা পৃথিবী উৎপাদন করে, তাও
বিপরীতধর্মী যৌগমূল দ্বারা গঠিত। পানি গঠিত হয় দুটি বিপরীতধর্মী
উপাদনা দ্বারা। একটি ধনাত্মক উপাদানবিশিষ্ট হাইড্রোজেন অনু এবং
অপরটি ঋনাত্মক উপাদানবিশিষ্ট অক্সিজেন অনু।
অধিকন্তু পৃথিবী থেকে উৎপন্ন জোড়া জোড়া বস্তুসমূহ আরও অন্তর্ভুক্ত করতে
পারে সেসব সমজাতীয় জোড়া, যা তাদের দৈহিক ও রাসায়নিক ধর্মের
ক্ষেত্রে ভিনড়ব ভিনড়ব। যেমন- ধাতু ও অধাতু। অনুরূপ বিপরীতধর্মী
উপাদানবিশিষ্ট জোড়া যেমন, ধনাত্মক ও ঋনাত্মক উপাদানবিশিষ্ট আয়ন
থেকে ধনাত্মক ও ঋনাত্মক বৈদ্যুতিক উপাদানসমূহ চৌম্বকীয় বিপরীতধর্মী
জোড়া, যেমন- চুম্বকের উত্তরপ্রান্ত ও দক্ষিণপ্রান্ত, আকর্ষণ ও বিকর্ষণ শক্তি,
তেমনিভাবে কেন্দ্রনির্গত শক্তির মাধ্যমে মধ্যাকর্ষণ ভারসাম্য ইত্যাদি।
মানবিক জোড়ার ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে- পুরুষ ও মহিলার লিঙ্গভেদ,
পরিপূর্ণ ব্যক্তিত্ব প্রকাশক গুণ, যেমন- নিষ্ঠুরতা ও পরদুঃখ কাতরতা, সাহস
ও ভয়, উদারতা ও কৃপণতা ইত্যাদি। অতঃপর যে কেউ সহজে উপসংহারে
আসতে পারে যে, জোড়ার রহস্য পুরুষ ও মহিলা কিংবা বিপরীত বৈদ্যুতিক
উপাদান ও বিপরীতধর্মী গুণ মানব জাতিসহ সব ধরনের প্রাকৃতিক বিষয় ও
শক্তিসমূহের মধ্যে বিদ্যমান। এ কথা উপরোক্ত কুরআনি আয়াতে
পরিষ্কারভাবে বর্ণিত হয়েছে। এখন আমরা নিজেদেরকে আরো একবার প্রশ্ন
করি, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মত একজন মানুষ যিনি
না লিখতে পারতেন, না পড়তে। এমনকি যিনি নিজের নামটি পর্যন্ত স্বাক্ষর
করতে পারতেন না, তিনি কি কুরআন মাজিদের গ্রন্থকার হতে পারেন? না
তা এমন একটি গ্রন্থ যা সর্বজ্ঞ ও জ্ঞানময় আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তাঁর
ওপর অবতীর্ণ হয়েছে?

বিচার দিবসে মহাশূন্যের সবকিছুর পরিসমাপ্তি

আর (যখন) শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে। আসমানসমূহে (মহাশূন্যে)
যারা আছে এবং পৃথিবীতে যারা আছে সকলে বেহুঁশ হয়ে পড়বে,
তবে আল্লাহ তাআলা যাদেরকে ইচ্ছে করেন। অতঃপর আবার
যখন শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে তখন তারা দাঁড়িয়ে তাকাতে থাকবে।
(যুমার, ৩৯ : ৬৮)

যখন কুরআন মাজিদ অবতীর্ণ হয়েছিল তখন কেউ জানত না, মানুষ
একদিন আকাশে উড়বে, এমনকি মহাকাশে স্টেশন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠা করবে।
একজন নাস্তিক এ কথা বলে কুরআন মাজিদকে নিয়ে বিদ্রুপ করেছিল যে,
যখন বিচার দিবস কায়েম হবে, পৃথিবীতে যারা আছে তারা মৃত্যু বরণ
করবে; কিন্তু যারা মহাশূন্যে আছে তারা এই প্রলয় থেকে নিরাপদ থাকবে।
কুরআন মাজিদ এই আয়াতে দু’টি বিষয়ের ভবিষ্যতবাণী করেছে। প্রথমত,
এমন একদিন আসবে যেদিন মানুষ আকাশে উড়বে এবং মহাশূন্যে বসবাস
করবে। দ্বিতীয়ত, যখন বিচার দিবস কায়েম হবে, যারা মহাশূন্যে থাকবে
তারা মৃত্যু বরণ করবে, যারা পৃথিবী-পৃষ্ঠে থাকবে তাদের মতোই। আবারও
আমরা কুরআন মাজিদের প্রতিটি শব্দে বিস্ময়কর জ্ঞানগভীরতা প্রত্যক্ষ
করি।

অতিক্রান্ত পৃষ্ঠাগুলি প্রাকৃতিক রহস্যের বহু প্রত্যক্ষণ প্রদান করে। এই
প্রত্যক্ষণগুলি মানব-জাতির পূর্ববর্তী প্রজন্মের কাছে রহস্য বলে বিবেচিত
হত। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চৌদ্দশ বছরের অগ্রগতি ও উন্নতি এই
প্রত্যক্ষণগুলিকে এখন প্রকৃতির রহস্য নয়, বরং বাস্তব সত্য হিসেবে
প্রমাণিত করেছে। স্মর্তব্য, এই প্রত্যক্ষণগুলি মানবজাতির কাছে প্রদত্ত
হয়েছে একজন নিরক্ষর মানুষ তথা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম
এর মাধ্যমে, যিনি লিখতে পড়তে জানতেন না। নাস্তিকরা বলে, মুহাম্মদ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরআন মাজিদে এ সকল প্রত্যক্ষণ
লিপিবদ্ধ করেছেন তাঁর তীব্র কল্পনা শক্তিকে কাজে লাগিয়ে। পক্ষান্তরে
ইহুদি ও খৃস্টানরা অভিযোগ করে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহুহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম
এসব বিষয় বাইবেলের পুরাতন নিয়ম (Old Testament) ও নতুন নিয়ম
(New Testament) থেকে নকল করেছেন।

তবে বাস্তবতা হল এই প্রত্যক্ষণগুলি, এমনকি সেই সময়ের সঙ্গেও সংশ্লিষ্ট
নয়, যখন কুরআন মাজিদ অবতীর্ণ হয়েছিল। অধিকন্তু এই প্রত্যক্ষণগুলো
না পুরাতন নিয়মে বিদ্যমান, আর না নতুন নিয়মে। অতএব কারও মনে
প্রশ্ন জাগতে পারে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর এই
জ্ঞানের উৎস কী? তিনি কি এ সকল প্রত্যক্ষণ তাঁর তীব্র চিন্তা ও
কল্পনা শক্তি ব্যবহার করে রচনা করেছিলেন, নাকি তা সর্বজ্ঞাতা ও
সর্বজ্ঞ আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তাঁর ওপর অবতীর্ণ হয়েছিল?
তার যথার্থ উত্তর হল,আল্লাহ তাআলা এসব সত্য মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়া সাল্লাম-এর ওপর অবতীর্ণ করেছেন।

 

‘নিশ্চয় তোমাদের কাছে চাক্ষুষ নিদর্শনাবলি এসেছে তোমাদের রবের পক্ষ
থেকে। অতএব যে দেখবে (সত্য) তবে তা হবে তার নিজের (কল্যাণের)
জন্যেই। আর যে অন্ধ সাজবে তবে তা (তার অনিষ্টতা) তার ওপরই
(বর্তাবে)। আর বলুন, (হে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমি
(এখানে) তোমাদের ওপর সংরক্ষক নই। (চাই তোমরা এই সত্যকে গ্রহণ
কর কিংবা প্রত্যাখ্যান কর)।’ (আনআম, ০৬ : ১০৪)

মূলঃ আল-কুর’আনের ১৬০ মুজিজা ও রহস্য

************************

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s