গুহাবাসী লোকেরা (আসহাবে কাহফ)


তুমি কি মনে করেছ যে, গুহা ও রকিমের অধিবাসীরা ছিল আমার আয়াতসমূহের এক বিস্ময়? যখন যুবকরা গুহায় আশ্রয় নিল, অতঃপর বলল, ‘হে আমাদের রব, আমাদেরকে আপনার পক্ষ থেকে রহমত দিন এবং আমাদের জন্য আমাদের কর্মকাণ্ড সঠিক করে দিন।’ ফলে আমি গুহায় তাদের কান বন্ধ করে দিলাম অনেক বছরের জন্য।বিতর্ককারীরা বলবে, ‘তারা ছিল তিনজন, চতুর্থ হল তাদের কুকুর।’ আর কতক বলবে, ‘তারা ছিল পাঁচজন, ষষ্ঠ হল তাদের কুকুর।’ এসবই অজানা বিষয়ে অনুমান করে। আর কেউ কেউ বলবে, ‘তারা ছিল সাতজন; অষ্টম হল তাদের কুকুর। (কাহফ, ১৮ : ০৯,১২,২২)

কুরআন মাজিদের টিকাকারদের মতে, এই আয়াতে একদল যুবকের কথা উল্লিখিত হয়েছে, যারা এক রোমান রাজার উৎপীড়ন থেকে নিজেদের ঈমান ও জীবন রক্ষার জন্য পাহাড়ের একটি গর্তে আশ্রয় নিয়েছিল। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে গুহার ভেতর প্রায় তিনশ বছর ঘুমিয়ে রেখেছিলেন। যখন তারা ঘুম থেকে জাগ্রত হল, তাদের একজন সাথীকে একটি মুদ্রা দিয়ে খাবার কিনে আনার জন্য পাঠাল। যখন সে শহরে প্রবেশ করল, দেখতে পেল পুরো শহর সম্পূর্ণরূপে বদলে গেছে। দোকানী এত প্রাচীন মুদ্রা দেখে হতবিহ্বল হয়ে গেল। সে মনে করল, এই যুবক কোনো ধরনের

ধনভাণ্ডারের সন্ধান পেয়েছে এবং সে এই মুদ্রার উৎস সম্পর্কে জানতে চাইল। যুবকটি এমন বিপত্তির মুখে পড়ে আরও অধিক বিস্মিত হল।বিষয়টি শেষ পর্যন্ত রাজ দরবার পর্যন্ত গড়াল। রাজা যুবকটির কাহিনী শুনে বিস্মিত হলেন। অতঃপর তার সভাসদদের সঙ্গে নিয়ে সেই গুহার কাছে গেলেন এবং যুবকদেরকে তাদের জন্য দুআ করতে বললেন। পরবর্তীতে তারা সেই একই গুহার মধ্যেই বসবাস করতে লাগল এবং মৃত্যু বরণকরল। ‘গিবন’ তার ‘রোমান সম্রাজ্যের উত্থান-পতন’ (অধ্যায় ৩৩) নামক গ্রন্থে এই ঘটনার আরও কিছু বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। তার মতে, এই ঘটনাটি সংঘটিত হয় রোম সম্রাট ‘ডিসাস’ এর রাজত্বকালে ২৪৯-২৫১ খৃস্টাব্দে। যুবকরা অতঃপর জাগ্রত হয়েছিল রোমান সম্রাট থিউডুসাস এর রাজত্বকালে। যার শাসনকাল ছিল ৪০৭ থেকে ৪৫০ খৃস্টাব্দ।

কিছুদিন পূর্বে আমি জর্ডানে এক স্থান ভ্রমণ করি, যাকে অধিকাংশ লোক আসহাবে কাহফের গুহা বলে ধারণা করে থাকে। এটি রাজধানী শহর আম্মানের বহিরপার্শ্বে অবস্থিত। পুরো এলাকাটি খুব এবড়ো-থেবড়ো, পিঙ্গলবর্ণ পাহাড়ময়। একটি পাহাড়ের নিচে চাপা পড়ে আছে একটি সুপ্ত গুহা, যার রয়েছে একটি বড় কক্ষ। আমি কক্ষটিতে প্রবেশ করলাম। পাথরে খোদিত সাতটি গর্ত দেখতে পেলাম। প্রতিটি গর্তের ভেতর একটি করে প্রকোষ্ঠ, যাতে একেকটি মানব কঙ্কাল। সেখানে অন্য একটি গর্ত আছে,যাতে আছে কুকুরের কঙ্কাল। স্মর্তব্য, এসব লোকের ব্যাপারে ন্যূনতম জ্ঞান অর্জন কিংবা জানার জন্য মুহাম্মদ সা.-এর কাছে কোনো মাধ্যম কিংবা উৎস ছিল না এবং বাস্তবতা হল, তা এখনো মাটির নিচে একটি গুহায় চাপা পড়ে আছে। এটি কুরআনের মুজিজা যে, তা ঐতিহাসিকদের বর্ণনা বা নৃবিজ্ঞানীদেরআবিষ্কারের শত শত বছর পূর্বের ঘটনার বর্ণনা দিয়েছে।

গুহাবাসীদের কর্ণকুহর বন্ধ করে দেয়া

 

ফলে আমি (আল্লাহ) গুহায় তাদের কান (শ্রবণশক্তি) বন্ধ করে দিলাম বহু বছরের জন্য (যাতে তারা গভীর নিদ্রায় নিমগ্ন হয়)।(কাহফ ১৮ : ১১)

এই আয়াতে সেসব যুবকের কথা উল্লেখিত হয়েছে যারা গুহার ভেতর ঘুমিয়ে ছিল তিনশত বছর। লক্ষ্য করলে বিস্মিত হতে হয় যে, এই আয়াতে কুরআন মাজিদ শ্রবণ ব্যতীত সেসব যুবকের অন্য কোনো শরীরবৃত্তের বর্ণনা দেয় নি। সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছে, সকল সংবেদনশীল অঙ্গের মধ্যে কেবল কানই, এমন কি, ঘুমের মধ্যেও সক্রিয় থাকে। এ কারণেই ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার জন্য আমাদের শাব্দিক সংকেত প্রয়োজন হয়।যেহেতু, আল্লাহ তাআলা এসব লোককে দীর্ঘদিনের জন্য নিদ্রিত রাখতে ইচ্ছা করলেন, তিনি তাদের শ্রবণেন্দ্রীয়কেও বন্ধ করে দিলেন। নিশ্চিতভাবে নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চৌদ্দশ বছর পূর্বে ঘুমের শরীরবৃত্তীয় বিদ্যা সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না।

গুহাবাসীদের পার্শ্ব পরিবর্তন

 

তুমি তাদের মনে করতে জাগ্রত, অথচ তারা ছিল ঘুমন্ত। আমি তাদেরকে পার্শ পরিবর্তন করাচ্ছি ডানে ও বামে এবং তাদের কুকুরটি আঙিনায় তার সামনের দু’পা বাড়িয়ে আছে। (কাহফ, ১৮: ১৮)

এই আয়াতটি গুহার যুবকদের ঘুমানোর ধরন সম্পর্কিত। এই আয়াত বলে, যদিও তারা তিনশ বছরের অধিককাল ঘুমিয়েছিল, আল্লাহ তাআলা তাদের ডানে ও বামে পার্শ্ব পরিবর্তন করাতেন। এই আয়াতটি এভাবে সেসব লোকদের জন্য একটি বিশেষ স্বাস্থ্য-নিয়মের নির্দেশনা দেয় যারা দীর্ঘ সময়ের জন্য বিছানায় শুয়ে থাকতে বাধ্য হয়। এ ধরনের লোকদের উপদেশ দেয়া হয়েছে বিছানায় তাদের অবস্থান নিয়ত পরিবর্তন করতে।অন্যথায় পরিণামে তারা বিভিনড়ব স্বাস্থ্য-সমস্যায় পতিত হবে। যেমন- রক্ত সঞ্চালনজনিত জটিলতা, ত্বকের পঁচন, শরীরের নিমড়বাংশে রক্তের চাপ ইত্যাদি। আল্লাহ তাআলা ব্যতীত আর কে এসব যুবকের ঘুমানোর ধরন বর্ণনার ক্ষেত্রে এমন যথার্থ ভাষা ব্যবহার করতে পারেন?

মুলঃ আল-কুর’আনের ১৬০ মুজিজা ও রহস্য

****************

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s