আল-কুর’আনের রহস্য পর্ব-১ (ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিসমূহ)


কুরআন মাজিদের রহস্য সংক্রান্ত মুজিজাসমূহ
কুরআন মাজিদের একটি অনন্য দিক হল, তা এমন অসংখ্য আয়াত ধারণ
করে কার্যকারণ, যুক্তি কিংবা সাধারণ বোধের মাধ্যমে যেগুলির ব্যাখ্যা দেয়া
যায় না। কুরআন মাজিদ এমন কিছু ঘটনা বা বিষয়ের বর্ণনা দেয়, আরব
উপদ্বীপ কিংবা আরব সমাজের শারীরিক কিংবা পরিবেশগত অবস্থার সঙ্গে
যার কোনো সম্পর্ক নেই, যেখানে কুরআন মাজিদ সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়।
এটাও স্মর্তব্য যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর প্রাপ্ত বয়সে
কেবল একবারই দীর্ঘ সফর করেছেন, মক্কা থেকে সিরিয়ায়। কুরআন
মাজিদে বর্ণিত ঘটনাগুলি না মক্কা থেকে সিরিয়া যাবার পথে দৃষ্টিগোচর হয়,
আর না তা সিরিয়ায় দেখা যায়। অধিকন্তু, কুরআন মাজিদে এমন কিছু
ঐতিহাসিক ঘটনা ও সেসবের নিদর্শন বর্ণিত হয়েছে কুরআন অবতরণের
প্রাক্কালে আরব-সমাজ যে সম্পর্কে ছিল সম্পূর্ণ বেখবর। তবে কুরআন
মাজিদ এসব ঘটনার এমন যথার্থ ও সবিস্তার বিবরণ প্রদান করে, মনে হবে
যেন তা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষকৃত। তাছাড়া কুরআন মাজিদের প্রতিটি বর্ণনাই
বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোল ইত্যাদির সাম্প্রতিক গবেষণার সঙ্গে সম্পূর্ণ
সঙ্গতিপূর্ণ। এভাবে এসব বর্ণনা কুরআন মাজিদের রহস্য, যা কেবল আল্লাহ্‌
তাআলা প্রদত্ত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মুজিজা বলেই
ব্যাখ্যা দেয়া যেতে পারে। নিমেড়ব কুরআন মাজিদের কিছু রহস্য তুলে ধরা
হল :

লুত সম্প্রদায়ের আজাব

 

যখন আমার প্রেরিত ফেরেশতাগণ লুতের কাছে আগমন করল,
তখন তাদের কারণে তিনি বিষন্ন হয়ে পড়লেন এবং তার মন
তাদের (রক্ষার) ব্যাপারে সংকীর্ণ হয়ে গেল। তারা বলল, ভয়
করবেন না এবং দুঃখ করবেন না। আমরা আপনাকে এবং
আপনার পরিবার বর্গকে রক্ষা করবই। আপনার স্ত্রী ব্যাতীত, সে
ধ্বংসপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত থাকবে। আমরা এই জনপদের
অধিবাসীদের ওপর আকাশ থেকে আজাব নাজিল করব তাদের
পাপাচারের কারণে। আমি (আল্লাহ) তাতে বুদ্ধিমান সম্প্রদায়ের
জন্যে একটি স্পষ্ট নিদর্শন রেখে দিয়েছি। (আনকাবুত, ২৯ :
৩৩-৩৫)

এই আয়াতসমূহে লুত আলাইহিস সালাম-এর সম্প্রদায়ের ওপর নাজিলকৃত
আযাবের উল্লেখ রয়েছে। তারা সমকামিতার মত জঘণ্য অপরাধে অভ্যস্ত
ছিল। ফলে আল্লাহু তাআলা তাদের জনপদকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে
দেন।
আয়াতগুলিতে স্পষ্ট নিদর্শন বলতে ‘সামুদ’ ও ‘গোমরাহ’ সম্প্রদায়ের
জনপদগুলির ধ্বংসাবশেষকে বুঝানো হয়েছে, যা সম্প্রতি মৃত সাগরের
কাছে আবিষ্কৃত হয়েছে। ভৌগলিকরা দেখতে পেয়েছেন, অঞ্চলটি প্রচুর
পরিমাণে গন্ধকে ভর্তি। ফলে সমগ্র অঞ্চলটিতে প্রাণী বা উদ্ভিদ কোনো
ধরনের জীবনের অস্তিত্ব নেই। পুরো এলাকা সর্বাঙ্গীন ধ্বংসের একটি
নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এভাবে এটি সকল যুগের মানুষের জন্য আল্লাহ্‌র
শাস্তির একটি উজ্জ্বল নিদর্শন হয়ে আছে। বলাবাহুল্য, নবী
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো অঞ্চলটি পরিদর্শন করেন নি।
জনপদগুলির ধ্বংসের তথ্য জানার মতো তার কোনো মাধ্যম ছিল।

সামুদ ও গোমরাহ সম্প্রদায়ের জনপদ

 

আপনার প্রাণের কসম (হে নবী,) নিশ্চয় তারা (লুত সম্প্রদায়)
আপন নেশায় উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরপাক খাচ্ছিল। অতঃপর
সূর্যোদয়ের প্রাক্কালে একটি বিকট আওয়াজ তাদেরকে পাকড়াও
করল। অতঃপর আমি (আল্লাহ) তাদের (সাদুম গোত্রের)
জনপদগুলিকে উল্টে দিলাম এবং তাদের ওপর বষর্ণ করলাম
পোড়ামাটির পাথর। নিশ্চয় এতে পর্যবেক্ষণকারীদের জন্য
নিদর্শনাবলি রয়েছে। আর নিশ্চয় তা (জনপদগুলি) রাজপথের
পাশেই বিদ্যমান। নিশ্চয় এতে ঈমানদের জন্য নিদর্শনাবলি
রয়েছে। (হিজর, ১৫ : ৭২-৭৭)

এই আয়াতগুলিতে কুরআন মাজিদ ধ্বংসপ্রাপ্ত জনপদগুলির অধিক সুনিশ্চিত
অবস্থানস্থলের নির্দেশনা প্রদান করে। এতে বর্ণিত হয়েছে সেগুলি
রাজপথের পাশে অবস্থিত।
ভৌগলিকরা সম্প্রতি আবিষ্কার করেছে, জনপদগুলি মৃত সাগরের দক্ষিণ
পূর্বে, মক্কা থেকে সিরিয়া পর্যন্ত একটি রাজপথের পাশে অবস্থিত। নবী
মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, যার ভূগোল সম্পর্কে তেমন
কোনো জ্ঞান ছিল না, তথাপি এই আয়াতগুলি এমন এক বাস্তবতার কথা
বলে যা কেবল সাম্প্রতিক ভূগোল বিশারদদের দ্বারাই আবিষ্কৃত হয়েছে।

‘আইকার অধবিাসী

 

অতঃপর ভূমিকম্প তাদের (অসতর্ক অবস্থায়) পাকড়াও করল।
তারপর তারা তাদের গৃহে উপুড় হয়ে পড়ে রইল। সেসব লোক
যারা শুয়াইব আলাইহিস সালাম-কে মিথ্যাবাদী বলেছিল, মনে হয়
যেন তারা সেখানে বসবাসই করেনি। যারা শুয়াইবকে মিথ্যাবাদী
বলেছিল তারাই ছিল ক্ষতিগ্রস্ত। (আরাফ, ০৭ : ৯১-৯২)

 

আর নিশ্চয় আইকার অধিবাসীরা ছিল যালিম। অতএব আমি
(আল্লাহ) তাদের থেকে প্রতিশোধ নিলাম। আর এ (জনপদ) দুটি
উন্মুক্ত রাস্তার পাশেই বিদ্যমান। (হিজর, ১৫ : ৭৮-৭৯)

‘আইকা’ ছিল সেই সম্প্রদায় যেখানে নবী শুয়াইব আ. প্রেরিত হয়েছিলেন।
ভৌগলিকরা সম্প্রতি এই জনপদ আবিষ্কার করেছেন সৌদি আরবের তাবুক
শহরের সনিড়বকটে। এখনও যে কেউ (এই ধ্বংসস্তুপ প্রত্যক্ষ করে) কুরআন
মাজিদের এই আয়াতের বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করতে পারে। নবী মুহাম্মদ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম না ছিলেন একজন ভৌগলিক, না ছিলেন
কোনো পর্যটক। এটি অধিক সুস্পষ্ট যে,আল্লাহ তাআলা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর এই তথ্য অবতীর্ণ করেছেন। অতঃপর যা
তিনি কুরআন মাজিদের মাধ্যমে আমাদের কাছে পৌঁছিয়েছেন।

হিজরের অধিবাসী

 

আর ছামুদের নিকট (আমি প্রেরণ করেছি) তাদের ভাই
সালিহকে। সে বলল, ‘হে আমার কওম, তোমরা আল্লাহর ইবাদত
কর। তিনি ছাড়া তোমাদের কোনো (সত্য) ইলাহ নেই। (আরাফ,
০৭ : ৭৩)

 

যারা অহংকার করেছিল তারা বলল, নিশ্চয় তোমরা যার প্রতি
ঈমান এনেছ, আমরা তাকে অস্বীকার করি। ফলে ভূমিকম্প
তাদেরকে পাকড়াও করল। তাই সকালে তারা তাদের গৃহে উপুড়
হয়ে মরে রইল। (আরাফ, ০৭ : ৭৬-৭৮)

 

আর অবশ্যই হিজরের অধিবাসীরা (সালেহের কওম) রাসুলদেরকে
অস্বীকার করেছে। আর আমি তাদেরকে আমার আয়াতসমূহ
দিয়েছিলাম, তবে তারা তা থেকে বিমখু হয়েছে। আর তারা
পাহাড় কেটে বাড়ি বানাত, নিরাপদ ভেবে। কিন্তু অবশেষে
ভোরের প্রাক্কালে এক বিকট আওয়াজ তাদেরকে পাকড়াও করল।
আর তারা যা উপাজর্ন করত তা তাদের কোনো কাজে আসল
না। (হিজর, ১৫ : ৮০-৮৪)

ঐতিহাসিকরা বলেন, ‘হিজর’ ছিল ছামুদ সম্প্রদায়ের লোকদের প্রধান
শহর। ধারণা করা হয়, তারা ছিল হযরত নুহ আ.-এর পঞ্চম অধঃস্তন
বংশধর, যার ধ্বংসাবশেষ সম্প্রতি আবিষ্কৃত হয়েছে আধুনিক শহর ‘আল-
উলা’র সনিড়বকটে, যা সৌদি আরবের মদিনা থেকে তাবুক যাওয়ার পথে
অবস্থিত। অষ্টম শতাব্দীর মহান পরিব্রাজক ইবনে বতুতা এই এলাকাটি
ভ্রমণ করেন এবং লিখেন, ‘আমি লাল পর্বতসমূহে খোদাই করা ছামুদ
সম্প্রদায়ের লোকদের ভবনগুলি দেখেছি। সেগুলির চিত্রকর্মগুলি এতই
উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল যেন সেগুলি অতি সম্প্রতি সেখানে স্থাপন
করা হয়েছে। এবং সেখানকার অধিবাসীদের জরাজীর্ণ অস্থিসমূহ এখনও
তাদের ধ্বংসাবশেষে বিদ্যমান। এটি কুরআন মাজিদের একটি মুজিজা, যে
কেউ এটির সত্যতা আজও স্বচক্ষে আবলোকন করতে পারে।

‘ইরাম’ শহর

 

তুমি কি দেখনি তোমার রব কিরূপ আচরণ করেছেন আদ জাতির
সঙ্গে? ইরাম (গোত্রের) সঙ্গে, যারা ছিল সুউচ্চ স্তম্ভের অধিকারী?
যাদের মত সৃষ্টির করা হয় নি কোনো দেশে? (ফজর, ৮৯ : ০৬-
০৮)

National Geography ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বর সংখ্যায়
একটি প্রাচীন শহর ‘মলবা’, যা ১৯৭৩ সনে সিরিয়ায় খননকার্যের মাধ্যম
আবিষ্কৃত হয়েছে, তার ব্যাপারে একটি মজাদার বিবরণ দিয়েছে। শহরটি
প্রায় তেতাল্লিশ শত বছরের প্রাচীন। ম্যাগাজিনটি আরও লিখেছে,
শহরটিতে একটি লাইব্রেরি ছিল। তাতে পাশ্ববর্তী শহরগুলির একটি তালিকা
ছিল, যাদের সঙ্গে এলবার অধিবাসীরা বাণিজ্য করত। আরও বিস্ময়কর
ব্যাপার হল, সেই শহরগুলির তালিকায় ‘ইরাম’ নামক একটি শহরের নামও
লিপিবদ্ধ ছিল। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিভাবে ৬ষ্ঠ
শতাব্দীতে এমন একটি শহর সম্পর্কে জানতে পারেন যা ছিল তেতাল্লিশ
শত বছরের পুরনো এবং যা অতি সম্প্রতি ১৯৭৩ সালে ভূতত্ত্ববিদদের
মাধ্যমে আবিষ্কৃত হয়েছে? আল্লাহ তাআলা ব্যতীত আর কে তাঁকে এই
জ্ঞান দান করেছেন?
_____________________________________________

মূলঃআল কুরআনের ১৬০ মুজিজা ও রহস্য
ড. মাজহার কাজি
ভাষান্তর
মুহাম্মদ ফয়জুল্লাহ মুজহিরী
সম্পাদনা
এম মুসলেহ উদ্দিন
মুহাম্মদ শামসুল হক সিদ্দিক
অন্যথা পাবলিকেশন

******************

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s