নবী করীম (সাঃ) যেভাবে নামাজ পড়তেন


মূল আরবীঃ মহামান্য শায়খ আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ্ বিন বায রাহিমাহুল্লাহ্

সাবেক প্রধান, ইসলামী গবেষণা, ইফতা, দাওয়াত ও এরশাদ বিভাগ রিয়াদ, সৌদি আরব।
অনুবাদঃ আব্দুন্ নূর বিন আব্দুল জব্বার
সম্পাদনাঃমোঃ জাকির হোসেন
*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*

الحمد لله وحده والصلاة والسلام على عبده ورسوله محمد وآله وصحبه.
যাবতীয় প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ্ জন্য এবং দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক তাঁর বান্দাহ্ ও তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম, তাঁর পরিবার-পরিজন এবং সাহাবাগণের প্রতি।আমি প্রত্যেক মুসলমান নারী ও পুরুষের উদ্দেশ্যে নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লামের নামায আদায়ের পদ্ধতি সম্পর্কে সংক্ষিপ্তাকারে বর্ণনা করতে ইচ্ছা করছি। এর উদ্দেশ্য হলো যে, যারা পুস্তিকাটি পাঠ করবেন তারা যেন প্রত্যেকেই নামায পড়ার বিষয়ে নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ করতে পারেন। এ সম্পর্কে নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেনঃ

((صَلُّوْا كَمَا رَأَيْتُمُوْنِيْ أُصَلِّيْ )) رواه البخاري
অর্থঃ ((তোমরা সেভাবে নামায আদায় কর, যে ভাবে আমাকে নামায আদায় করতে দেখ।)) [বুখারী]

পাঠকের উদ্দেশ্যে (নিম্নে) তা বর্ণনা করা হলোঃ-

১. সুন্দর ও পরিপূর্ণভাবে ওযু করবেঃ
আল্লাহ্ তা’আলা কুরআনে যেভাবে ওযু করার নির্দেশ প্রদান করেছেন সেভাবে ওযু করাই হলো পরিপূর্ণ ওযু। আল্লাহ্ সোবহানাহু ওয়াতা’আলা এ সম্পর্কে এরশাদ করেনঃ

(( يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُواْ إِذَا قُمْتُمْ إِلَى الصَّلاةِ فاغْسِلُواْ وُجُوْهَكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ إِلَى الْمَرَافِقِ وَامْسَحُواْ بِرُؤُوسِكُمْ وَأَرْجُلَكُمْ إِلَى الْكَعْبَيْنِ )) [سورة المائدة: 6]অর্থঃ ((হে মুমিনগণ! যখন তোমরা নামাযের উদ্দেশ্যে দণ্ডায়মান হও তখন (নামাযের পূর্বে) তোমাদের মুখমণ্ডল ধৌত কর এবং হাতগুলোকে কনুই পর্যন্ত ধুয়ে নাও, আর মাথা মাসেহ কর এবং পাগুলোকে টাখনু পর্যন্ত ধুয়ে ফেল।)) [সূরা আল-মায়েদাহঃ ৬]

নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেনঃ (( لاَ تُقْبَلُ صَلاَةٌ بِغِيْرِ طَهُوْرٍ وَلاَ صَدَقَةٌ مِنْ غُلُوْلٍ )) অর্থঃ ((পবিত্রতা ব্যতীত নামায কবুল করা হয় না। আর খেয়ানতকারীর দান গ্রহণ করা হয় না।))

ইমাম মুসলিম তাঁর সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেনঃ নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তিকে নামাযে ভুল করার কারণে বললেনঃ
(( ِإذَا قُمْتَ إِلىَ الصَّلاَةِ فَأَسْبِغِ الْوُضُوْءَ )) অর্থঃ ((তুমি যখন নামযে দাঁড়াবে (নামাযের পূর্বে) উত্তম রূপে ওযু করবে।))

২. মুসল্লী বা নামাযী ব্যক্তি কেবলামুখী হবেঃ
সে যে কোন জায়গায় থাক না কেন, তার সমস্ত শরীর ও মনকে যে ফরয বা নফল নামায আদায়ের ইচ্ছা করছে, অন্তরকে সেনামাযের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখবে। এবং মুখে নিয়্যত উচ্চারণ করবে না, কারণ মুখে নিয়্যত উচ্চারণ করা শরীয়ত সম্মত নয়; বরং বা তা বিদ’আত। কারণ নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাহাবাগণ কেউ মুখে নিয়্যত উচ্চারণ করেননি।সুন্নত হলো যে, নামাযী তিনি ইমাম হয়ে নামায আদায় করুন অথবা একা, তার সামনে সুত্রাহ (নামাযের সময় সামনে স্থাপিত সীমাচিহ্ন) রেখে নামায পড়বেন। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম নামাযের সামনে সুত্রাহ ব্যবহার করে নামায পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। কিবলামুখী হওয়া নামাযের শর্ত। তবে কোন কোন বিশেষ অবস্থা তার ব্যতিক্রম যা সুবিদিত বা সবার জানা এবং এ বিষয়ে আহ্লে ইলমদের কিতাবে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

৩. তাকবীরে তাহরীমাহঃ
আল্লাহু আকবার বলে তাকবীরে তাহরীমা দিয়ে নামাযে দাঁড়াবে এবং দৃষ্টিকে সিজদার স্থানে নিবদ্ধ রাখবে।

৪. তাকবীরে তাহরীমায় হাত উত্তোলনঃ
তাকবীরে তাহরীমার সময় উভয় হাতকে কাঁধ অথবা কানের লতি বরাবর উঠাবে।

৫. বুকে হাত বাঁধাঃ
এরপর ডান হাতের তালুকে বাম হাতের উপরের কব্জি অথবা বাহু ধারণ করে উভয় হাতকে বুকের উপর রাখবে। বুকের উপর হাত রাখা সম্পর্কে সাহাবী অয়েল ইবনে হুজর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু এবং কাবীসাহ্ ইবনে হুলব আততায়ী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু, তিনি তার পিতা থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন।

৬. সানা পড়াঃ
দো’আ ইস্তেফ্তাহ (সানা) পাঠ করা সুন্নাত। দো’আ ইস্তেফ্তাহ নিম্নরূপ:

( اَللَّهُمَّ بَاعِدْ بَيْنِيْ وَبَيْنَ خَطَاياَيَ كَمَا بَاعَدتَّ بَيْنَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ. اَللَّهُمَّ نَقِّنِيْ مِنْ خَطَايَايَ كَمَا يُنَقَّى الثَّوْبُ الْأَبْيَضُ مِنَ الدَّنَسِ. اَللَّهُمَّ اغْسِلْنِيْ مِنْ خَطَايَايَ بِالْمَاءِ وَالثَّلْجِ وَالْبَرْدِ.) উচ্চারণঃ((আল্লা-হুম্মা বা-‘ইদ বাইনী ওয়া বাইনা খাতা-ইয়া-য়া, কামা- বা-‘আদ্তা বাইনাল মাশরিক্বী ওয়াল মাগরিবি, আল্লা-হুম্মা নাক্কিনী- মিন খাতা-ইয়া-য়া কামা- ইউনাক্কাছ্ ছাওবুল আবইয়াদু মিনাদ্দানাসি, আল্লা-হুম্মাগসিলনী- মিন খাতা-ইয়া-য়া বিল মা-য়ি, ওয়াছ্ছালজি, ওয়াল বারদি)) অর্থঃ ((হে আল্লাহ্! তুমি আমাকে আমার পাপগুলো থেকে এত দূরে রাখ যেমন পূর্ব ও পশ্চিম পরস্পরকে পরস্পর থেকে দূরে রেখেছ। হে আল্লাহ্! তুমি আমাকে আমার পাপ হতে এমন ভাবে পরিষ্কার করে দাও, যেমন সাদা কাপড়কে ময়লা হতে পরিষ্কার করা হয়। হে আল্লাহ্! তুমি আমাকে আমার পাপ হতে (পবিত্র করার জন্য) পানি, বরফ ও শিশির দ্বারা ধুয়ে পরিষ্কার করে দাও।)) [বুখারী ও মুসলিম]

অন্য এক হাদীসে আবু হোরায়রাহ্ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন যে, যদি কেউ চায় তাহলে পূর্বের দো’আর পরিবর্তে নিম্নের দো’আটিও পাঠ করতে পারে । কারণ নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম থেকে তা পাঠ করার প্রমাণ রয়েছে-(( سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ وَتَبَارَكَ اسْمُكَ وَتَعَالَى جَدُّكَ وَلَا إِلَهَ غَيْرُكَ )) উচ্চারণঃ ((সোবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা, ওয়া তাবারাকাস্মুকা, ওয়া তা’আলা জাদ্দুকা ওয়া লা-ইলাহা গাইরুকা।)) অর্থঃ ((হে আল্লাহ্! আমি তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করছি। তুমি প্রশংসাময়, তোমার নাম বরকতময়, তোমার মর্যাদা অতি উচ্চে, আর তুমি ব্যতীত সত্যিকার কোন মা’বূদ নেই))

পূর্বের দো’আ দু’টি ছাড়াও যদি কেউ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত অন্যান্য যে সমস্ত দো’আয়ে ইস্তেফ্তাহ বা সানা রয়েছে, তা পাঠ করে তবে কোন বাধা নেই। কিন্তু উত্তম হলো যে, কখনও এটি আবার কখনও অন্যটি পড়া। কারণ এর মাধ্যমে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লামের পরিপূর্ণ অনুসরণ প্রতিফলিত হবে।এরপর বলবেঃ ((আ’উযু বিল্লাহি মিনাশ্ শাইত-নির রাজীম, বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।)) অর্থঃ ((আমি বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহ্ কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।)) অতঃপর সূরা আল-ফাতিহা পাঠ করবে । কেননা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ(( لاَ صَلاَةَ لِمَنْ لَمْ يَقْرَأْ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ )) অর্থঃ ((যে ব্যক্তি নামাযে সূরা ফতিহা পাঠ করে না তার নামায হয় না।)) [বুখারী ও মুসলিম]

সূরা ফতিহা পাঠ শেষে জাহরী নামাযে (যেমনঃ মাগরিব, এশা ও ফজর) উচ্চস্বরে আওয়াজ করে এবং ছির্রি নামাযে (যেমনঃ জোহর ও আসর) মনে মনে আ-মীন বলবে।এরপর পবিত্র কুরআন থেকে যে পরিমাণ সহজসাধ্য হয় পাঠ করবে। উত্তম হলো যে, জোহর, আসর এবং এশার নামাযে কুরআন মজিদের আওছাতে মুফাচ্ছাল [সূরা নাস থেকে সূরা দোহা পর্যন্ত] এবং ফজরে তেওয়াল [সূরা কাফ থেকে সূরা নাবা পর্যন্ত] আর মাগরিবে কিসার [সূরা দোহা থেকে সূরা নাস পর্যন্ত] থেকে পাঠ করা। মাগরিব নামাযে কখনও তেওয়াল অথবা আওসাত থেকে পাঠ করবে। এভাবে পাঠ করা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত রয়েছে। আসরের কিরআতকে জোহর এর কিরআত থেকে হালকা করা জায়েয আছে।

৭. রুকূঃ
উভয় হাত দু’কাঁধ অথবা কান বরাবর উঠিয়ে আল্লাহু আকবার বলে রুকূতে যাবে। মাথাকে পিঠ বরাবর রাখবে এবং উভয় হাতের আঙ্গুলগুলিকে খোলাবস্থায় উভয় হাঁটুর উপরে রাখবে। রুকূতে ইতমিনান বা স্থিরতা অবলম্বন করবে। এরপর বলবেঃ ((সুবহানা রাব্বি’আল ‘আজীম))। অর্থঃ ((আমি আমার মহান প্রভুর পবিত্রতা বর্ণনা করছি।)) দো’আটি তিন বা তার অধিক পড়া ভাল এবং এর সাথে নিম্নের দো’আটিও পাঠ করা মুস্তাহাব-জায়েয।
(( سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ رَبَّناَ وَبِحَمْدِكَ اَللَّهُمَّ اغْفِرْ لِيْ )) উচ্চারণঃ ((সোবহানাকা আল্লাহুম্মা রাব্বানা ওয়া বিহামদিকা আল্লাহুম্মাগ্ ফিরলি।)) অর্থঃ ((হে আল্লাহ্! আমাদের প্রতিপালক, তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করছি তোমার প্রশংসা সহকারে। হে আল্লাহ্! আমাকে ক্ষমা কর।))

৮. রুকূ থেকে উঠাঃ
উভয় হাত কাঁধ অথবা কান বরাবর উঠিয়ে ((সামি’আল্লাহু লিমান হামিদাহ্)) বলে রুকূ থেকে মাথা উঠাবে। ইমাম বা একাকী উভয়ই দো’আটি পাঠ করবে। রুকূ থেকে খাড়া হয়ে বলবেঃ(( رَبَّنَاوَلَكَ الْحَمْدُ،حَمْدًا كَثِيْرًا طَيِّبًا مُبَارَكًا ِفيْهِ؛ مِلْءَ السَّمَاوَاتِ وَ مِلْءَ الْأَرْضِ؛ وَمِلَءَ ماَ بَيْنَهُمَا ؛ وَمِلْءَ ماَ شِئْتَ مِنْ شَيْءٍ بَعْدُ. )) উচ্চারণঃ ((রাব্বানা- ওয়া লাকাল হামদ্, হামদান্ কাছী-রান্ তাইয়্যেবাম্ মুবা-রাকান ফি-হ, মিল্আস্ সামা-ওয়া-তি ওয়া মিল্আল্ ‘আরদি, ওয়া মিল্আ মা বাইনাহুমা, ওয়া মিল্আ মা শি’তা মিন শাইয়িম বা’দু।)) অর্থঃ ((হে আমাদের প্রতিপালক! তোমার জন্যই সমস্ত প্রশংসা। তোমার প্রশংসা অসংখ্য, উত্তম ও বরকতময়, যা আকাশ ভর্তি করে দেয়, যা পৃথিবী পূর্ণ করে দেয়, উভয়ের মধ্যবর্তী স্থান পূর্ণ করে এবং এগুলো ছাড়া তুমি অন্য যা কিছু চাও তাও পূর্ণ করে দেয়।))

পূর্বের দো’আটির পরে যদি নিম্নের দো’আটিও পাঠ করা হয় তাহলে ভাল-((أَهْلُ الثَّنَاءِ وَالْمَجْدِ؛ أَحَقُّ مَا قاَلَ الْعَبْدُ؛ وَكُلُّناَلَكَ عَبْدٌ؛ اَللَّهُمَّ لاَمَانِعَ لِمَا أَعْطَيْتَ وَلاَ مُعْطِىَ لِمَا مَنَعْتَ وَلاَ يَنْفَعُ ذَالْجَدِّ مِنْكَ الْجَدُّ.)) উচ্চারণঃ ((আহলুস্ সানা-য়ি ওয়াল মাজদি, আহাক্কু মা কা-লাল ‘আবদু, ওয়া কুল্লানা- লাকা ‘আব্দুন। আল্লা-হুম্মা! লা- মা-নি’আ লিমা- আ’তাইতা ওয়ালা- মু’তিয়া লিমা- মানা’তা, ওয়ালা ইয়ানফা’উ যাল্ জাদ্দি মিনকাল্ জাদ্দু।)) অর্থঃ ((হে আল্লাহ্! তুমিই প্রশংসা ও মর্যাদার হক্কদার, বান্দাহ যা বলে তার চেয়েও তুমি অধিকতর হকদার। এবং আমরা সকলে তোমারই বান্দাহ্। হে আল্লাহ্! তুমি যা দান করেছো, তার প্রতিরোধকারী কেউ নেই। আর তুমি যা নিষিদ্ধ করেছো তা প্রদানকারীও কেউ নেই। এবং কোন সম্মানী ব্যক্তি তার উচ্চ মর্যাদা দ্বারা তোমার দরবারে উপকৃত হতে পারবে না।))

কোন কোন সহীহ্ হাদীসে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এই (পূর্বের) দো’আটি পড়া প্রমাণিত আছে। আর মুকতাদী হলে রুকূ থেকে উঠার সময় ((রাব্বানা ওয়া লাকাল হামদ. . . . .)) দো’আটি শেষ পর্যন্ত পড়বে। রুকূ থেকে মাথা উঠানোর পর ইমাম ও মুকতাদী সকলের জন্য দাড়ানো অবস্থায় যে ভাবে উভয় হাত বুকের উপর ছিল সে ভাবে বুকের উপর উভয় হাত রাখা মুস্তাহাব। এ বিষয়ে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম থেকে অয়েল ইবনে হুজর এবং সাহল বিন সা’দ রাদিয়াল্লাহু আনহুমা -এর বর্ণিত হাদীস থেকে প্রমাণিত।

৯. সিজদাহঃ
((আল্লাহু আকবার)) বলে যদি কোন প্রকার কষ্ট না হয় তা হলে দুই হাটু উভয় হাতের আগে (মাটিতে রেখে) সিজদায় যাবে। আর কষ্ট হলে উভয় হাত হাটুর পূর্বে (মাটিতে) রাখা যাবে। হাত ও পায়ের আঙ্গুলগুলি কিব্লামুখী থাকবে। এবং হাতের আঙ্গুলগুলি মিলিত ও প্রসারিত হয়ে থাকবে। সিজদাহ্ হবে সাতটি অঙ্গের উপর। অঙ্গগুলো হলোঃ নাক সহ কপাল, উভয় হাতুলী, উভয় হাঁটু এবং উভয় পায়ের আঙ্গুলের ভিতরের অংশ।সিজদায় গিয়ে বলবেঃ ((সুবহানা রাব্বিয়াল আ’লা)) অর্থঃ ((আমার সর্বোচ্চ প্রতিপালকের [আল্লাহর] প্রশংসা করছি।)) তিন বা তার

অধিকবার তা পুনরাবৃত্তি করবে। এর সাথেনিম্নের দো’আটি পড়া মুস্তাহাব-
(( سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ رَبَّناَ وَبِحَمْدِكَ اَللَّهُمَّ اغْفِرْ لِيْ )) উচ্চারণঃ ((সোবহানাকা আল্লাহুম্মা রাব্বানা ওয়া বিহামদিকা আল্লাহুম্মাগ্ফিরলি।))অর্থঃ ((হে আল্লাহ্! আমাদের প্রতিপালক, তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করছি তোমার প্রশংসা সহকারে। হে আল্লাহ্! আমাকে ক্ষমা কর।))

সিজদায় বেশি বেশি দো’আ করা মুস্তাহাব। কেননা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেনঃ
(( فأما الركوع فعظموا فيه الرب وأما السجود فاجتهدوا في الدعاء فقمن أن يستجاب )) অর্থঃ ((তোমরা রুকূ অবস্থায় মহান প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ব বর্ণনা কর এবং সিজদারত অবস্থায় অধিক দো’আ পড়ার চেষ্টা কর, কেননা তোমাদের দো’আ’ কবুল হওয়ার উপযোগী।))[মুসলিম]

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম আরো এরশাদ করেনঃ (( أَقْرَبُ مَا يَكُوْنُ الْعَبْدُ مِن رَّبِّهِ وَهُوَ سَاجِدٌ فَأَكْثِرُوْا الدُّعَاءَ. )) অর্থঃ ((বান্দাহ্ সিজদাহ্ অবস্থায় তার প্রতিপালকের অধিক নিকটবর্তী হয়ে থাকে। অতএব এই অবস্থায় তোমরা বেশি বেশি দো’আ করবে।)) [মুসলিম]

ফরয অথবা নফল উভয় নামাযে মুসলিম [নামাযী] সিজদার মধ্যে তার নিজের এবং মুসলমানদের জন্য আল্লাহ্ কাছে দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণের জন্য দো’আ করবে। সিজদার সময় উভয় বাহুকে পার্শ্বদেশ থেকে, পেটকে উভয় উরু এবং উভয় উরু পিন্ডলী থেকে আলাদা রাখবে। এবং উভয় বাহু [কনুই] মাটি থেকে উপরে রাখবে। (কেননা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম কুনইকে মাটির সাথে লাগাতে নিষেধ করেছেন।) নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেনঃ (( اِعْتَدِلُوْا فِي السُّجُوْدِ وَلاَيبسِطُ أَحْدُكُمْ ذِرَاعَيْهِ إِنْبِسَاطَ الْكَلْبِ.)) [متفق عليه] অর্থঃ ((তোমরা সিজদায় বরাবর সোজা থাকবে। তোমাদের কেউ যেন তোমাদের উভয় হাতকে কুকুরের ন্যায় বিছিয়ে প্রসারিত না রাখে।)) [বুখারী ও মুসলিম]

১০. সিজদা থেকে উঠাঃ
((আল্লাহু আকবার)) বলে (সিজদাহ থেকে) মাথা উঠাবে। বাম পা বিছিয়ে দিয়ে তার উপর বসবে এবং ডান পা খাড়া করে রাখবে। দু’হাত তার উভয় রান (উরু) ও হাঁটুর উপর রাখবে। এবং নিম্নের দো’আটি বলবে-

(( رَبِّ اغْفِرْلِيْ؛ رَبِّ اغْفِرْلِيْ؛ رَبِّ اغْفِرْلِيْ؛ اَللَّهُمَ اغْفِرْلِيْ، وَارْحَمْنِيْ وَاهْدِنِيْ وَارْزُقْنِيْ وَعَافِنِيْ وَاجْبُرْنِيْ.)) উচ্চারণঃ ((রব্বিগ্ফিরলী-, রব্বিগ্ফিরলী-, রব্বিগ্ফিরলী-, আল্লাহুম্মাগ্ফিরলী-, ওয়ারহামনী-, ওয়াহদিনী-, ওয়ারযোকনী-, ওয়া ‘আ-ফিনী-, ওয়াজবুরনী-।)) অর্থঃ ((হে আল্লাহ্! আমাকে ক্ষমা কর, হে আল্লাহ্! আমাকে ক্ষমা কর, হে আল্লাহ্! আমাকে ক্ষমা কর। হে আল্লাহ্! আমাকে ক্ষমা কর, আমাকে রহম কর, আমাকে হেদায়াত দান কর, আমাকে রিযিক দান কর, আমাকে সুস্থ্যতা দান কর এবং আমার ক্ষয়ক্ষতি পূরণ কর।))এই বৈঠকে ধীর স্থির থাকবে যাতে প্রতিটি হাড়ের জোর তার নিজস্ব স্থানে ফিরে যেতে পারে রুকূর পরের ন্যায় স্থির দাঁড়ানোর মতো। কেননা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম রুকূর পরে ও দু’সিজদার মধ্যবর্তী সময়ে স্থিরতা অবলম্বন করতেন।

১১. দ্বিতীয় সিজদাহঃ
((আল্লাহু আকবার)) বলে দ্বিতীয় সিজদাহ করবে। এবং দ্বিতীয় সিজদায় তাই করবে প্রথম সিজদায় যা করেছিল।

১২. আরামের বৈঠকঃ
সিজদাহ থেকে ((আল্লাহু আকবার)) বলে মাথা উঠাবে। ক্ষণিকের জন্য বসবে, যে ভাবে উভয় সিজদার মধ্যবর্তী সময়ে বসেছিল। এ ধরনের পদ্ধতিতে বসাকে ((জলসায়ে ইসতেরাহা)) বা আরামের বৈঠক বলা হয়। আলেমদের দু’টি মতের মধ্যে অধিক সহীহ্ মতানুসারে এ ধরনের বসা মুস্তাহাব এবং তা ছেড়ে দিলে কোন দোষ নেই। ((জলসায়ে ইস্তেরাহা)) এ পড়ার জন্য (নির্দিষ্ট) কোন দো’আ নেই।অতঃপর দ্বিতীয় রাক’আতের জন্য যদি সহজ হয় তাহলে উভয় হাঁটুতে ভর করে উঠে দাঁড়াবে। তার প্রতি কষ্ট হলে উভয় হাত মাটিতে ভর করে দাঁড়াবে।এরপর (প্রথমে) সূরা ফাতিহা এবং কুরআনের অন্য কোন সহজ সূরা পড়বে। প্রথম রাকআতে যেভাবে করেছে ঠিক সে ভাবেই দ্বিতীয় রাকআতেও করবে। মুকতাদী তার ইমামের পূর্বে কোন কাজ করা জায়েয নেই। কারণ নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতকে এ রকম করা থেকে সতর্ক করেছেন। ইমামের সাথে সাথে (একই সঙ্গে) করা মাকরূহ। সুন্নাত হলো যে, মুকতাদীর প্রতিটি কাজ কোন শিথিলতা না করে ইমামের আওয়াজ শেষ হওয়ার সাথে হবে। এ সম্পর্কে নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেনঃ

(( إنما جعل الإمام ليؤتم به فلا تختلفوا عليه؛ فإذا كبر فكبروا؛ وإذا ركع فاركعوا؛ وإذا قال سَمِعَ اللهُ لِمَنْ حَمِدَهُ، فقولوا رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ؛ وإذا سجد فاسجدوا. )) [متفق عليه] অর্থঃ ((ইমাম এই জন্যই নির্ধারণ করা হয়, যাতে তাকে অনুসরণ করা হয়, তার প্রতি তোমরা ইখতেলাফ করবে না। সুতরাং ইমাম যখন আল্লাহু আকবার বলবে তোমরাও “আল্লাহু আকবার” বলবে এবং যখন তিনি রুকূ করবেন তোমরাও রুকূ করবে এবং তিনি যখন “সামি’আল্লাহু লিমান হামিদাহ” বলবেন তখন তোমরা “রাব্বানা ওয়া লাকাল হামদ” বলবে আর ইমাম যখন সিজদাহ করবেন তোমরাও সিজদাহ করবে।)) [বুখারী ও মুসলিম]

১৩. প্রথম বৈঠকঃ
নামায যদি দু’রাক্আত বিশিষ্ট হয় যেমনঃ ফজর, জুমআ ও ঈদের নামায, তা’হলে দ্বিতীয় সিজদাহ থেকে মাথা উঠিয়ে ডান পা খাড়া করে বাম পায়ের উপর বসবে। ডান হাত ডান উরুর উপর রেখে শাহাদাত বা তর্জনী আঙ্গুলি ছাড়া সমস্ত আঙ্গুল মুষ্টিবদ্ধ করে দো’আ ও আল্লাহর নাম উল্লেখ করার সময় শাহাদাত আঙ্গুল দ্বারা নাড়িয়ে তাওহীদের ইশারাহ্ করবে। যদি ডান হাতের কনিষ্ঠা ও অনামিকা বন্ধ রেখে এবং বৃদ্ধাঙ্গুলি মধ্যমাঙ্গুলির সাথে মিলিয়ে গোলাকার করে শাহাদাত বা তর্জনী দ্বারা ইশারা করে তবে তা ভাল। কারণ নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম থেকে দু’ধরনের বর্ণনাই প্রমাণিত। উত্তম হলো যে, কখনও এভাবে এবং কখনও ওভাবে করা। এবং বাম হাত বাম উরু ও হাঁটুর উপর রাখবে।অতঃপর এই বৈঠকে তাশাহহুদ (আত্তাহিয়্যতু) পড়বে। তাশাহহুদ বা আত্তাহিয়্যতুঃ

(( اَلتَّحِيَّاتُ لِلَّهِ وَالصَّلَوَاتُ وَالطَّيِّبَاتُ، السَّلَامُ عَلَيْكَ أَيُّهَا النَّبِيُّ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ، السَّلَامُ عَلَيْنَا وَعَلَى عِبَادِ اللَّهِ الصَّالِحِيْنَ، أَشْهَدُ أَن لَّاإِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ.)) উচ্চারণঃ ((আত্তাহিয়্যা-তু লিল্লাহি ওয়াস্ সালাওয়া-তু ওয়াত্ তাইয়্যিবা-তু আস্ সালা-মু ‘আলাইকা আইয়্যুহান্নাবিয়্যু ওয়া রাহমাতুল্লা-হি ওয়া বারাকা-তুহু, আস্ সালামু ‘আলাইনা- ওয়া আলা- ‘ইবাদিল্লা-হিস্ সা-লেহী-ন। আশহাদু আল লা-ইলাহা ইল্লাল্লা-হু ওয়া আশ্হাদু আন্না মুহাম্মাদান্ ‘আব্দুহু- ওয়া রাসূলুহ্।)) অর্থঃ ((যাবতীয় ইবাদত, মৌখিক, শারীরিক ও আর্থিক সমস্তই আল্লাহ্র জন্য। হে নবী, আপনার উপর আল্লাহর শান্তি, রহমত ও বরকত অবতীর্ণ হোক। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্ ছাড়া (সত্য) কোন মা’বূদ নেই এবং আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ্ বান্দাহ ও তাঁর রাসূল।))

অতঃপর [দরূদ] বলবেঃ (( اَللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَّعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيْمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيْمَ إِنَّكَ حَمِيْدٌ مَجِيْدٌ, وبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيْمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِْيدٌ مَجِيْدٌ .)) উচ্চারণ: ((আল্লাহুম্মা সল্লি ‘আলা- মুহাম্মাদিউঁ ওয়া’আলা- আ-লি মুহাম্মাদিন, কামা- সল্লাইতা ‘আলা- ইব্রা-হী-মা ওয়া আলা- আ-লি ইব্রা-হী-মা ইন্নাকা হামীদুম মাজী-দ। ওয়া বা-রিক ‘আলা মুহাম্মাদিউঁ ওয়া’আলা- আ-লি মুহাম্মাদিন কামা বা-রাকতা আলা- ইব্রা-হী-মা ওয়া’আলা- আ-লি-ইব্রা-হী-মা ইন্নাকা হামীদুম মাজী-দ।)) অর্থঃ ((হে আল্লাহ্! মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর পরিবারবর্গের উপর রহমত বর্ষণ কর। যেমন তুমি ইব্রাহীম ও তাঁর পরিবারবর্গের উপর রহমত বর্ষণ করেছ। নিশ্চয় তুমি প্রশংসিত ও গৌরবান্বিত। এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর পরিবারবর্গের উপর বরকত নাযিল কর, যেমন তুমি ইব্রাহীম ও তাঁর পরিবারবর্গের উপর নাযিল করেছ। নিশ্চয় তুমি প্রশংসিত ও গৌরাবান্বিত।))

অতঃপর নিম্নের দো’আটি পড়বেঃ এতে আল্লাহর নিকট চারটি ভয়াবহ বস্তু থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করবে-(( اَللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوْذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ جَهَنَّمَ وَمِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ ومِنْ فِتْنَةِ الْمَحْيَا وَالْمَمَاتِ ومِنْ فِتْنَةِ الْمَسِيْحِ الدَّجَّال)) উচ্চারণঃ ((আল্লা-হুম্মা ইন্নী- আ’ঊযুবিকা মিন আযা-বি জাহান্নাম, ওয়া মিন আযা-বিল ক্বাব্রি, ওয়া মিন ফিত্নাতিল্ মাহ্ইয়া- ওয়ালমামা-তি ওয়া মিন ফিত্নাতিল মাসী-হিদ্দাজ্জা-ল।)) অর্থঃ ((আমি আল্লাহর নিকট আশ্রয় কামনা করি জাহান্নামের আযাব থেকে, কবরের শাস্তি থেকে, জীবন ও মৃত্যুর যন্ত্রণা থেকে এবং মাসীহ দাজ্জালের ফেৎনা থেকে।))

এরপর দুনিয়া ও আখেরাতের মঙ্গল কামনা করে নিজের পছন্দমত যে কোন দো’আ করবে। ব্যক্তি যদি তার পিতা-মাতা ও অন্যান্য মুসলমানের জন্য দো’আ করে তাতে কোন দোষ নেই। দো’আ করার বিষয়ে ফরয অথবা নফল সালাতে কোনই পার্থক্য নেই। কারণ নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লামের কথায় ব্যাপকতা রয়েছে, ইবনে মাসউদের হাদীসে যখন তিনি তাশাহহুদ শিক্ষা দিচ্ছিলেন তখন বলেছিলেনঃ
(( ثُمَّ لِيَتَخَيَّرْ مِنَ الدُّعاَءِ أَعْجَبَهُ إِلَيْهِ فَيَدْعُوْا )) অর্থঃ ((অতঃপর তার কাছে যে দো’আ পছন্দনীয়, তা নির্বাচন করে দো’আ করবে।))

অন্য এক বর্ণনায় আছে,(( ثُمَّ يَتَخَيَّرْ مِنَ الْمَسْأَلَةِ مَا شَاءَ )) অর্থঃ((অতঃপর যা ইচ্ছা চেয়ে দো’আ করতে পারে।)) এই দো’আগুলি যেন বান্দাহর দুনিয়া ও আখেরাতের সমস্ত বিষয়কে শামিল করে। অতঃপর (নামাযী) তার ডান দিকে (তাকিয়ে)- السلام عليكم ورحمة الله ((আস্সালা-মু ‘আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ্)) অর্থঃ ((তোমাদের উপর শান্তি ও আল্লাহ্ রহমত বর্ষিত হোক)) এবং বাম দিকে (তাকিয়ে) ((আস্সালা-মু ‘আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ্)) বলে ছালাম ফিরাবে বা সালাত সমাপ্ত করবে।

১৪. তিন বা চার রাকা’আত বিশিষ্ট নামাযেঃ
নামায যদি তিন রাকা’আত বিশিষ্ট হয় যেমন, মাগরিবের নামায অথবা চার রাকা’আত বিশিষ্ট যেমন, জোহর, আছর ও এশার নামায, তাহলে পূর্বোল্লেখিত ((তাশাহহুদ)) পড়বে এবং এর সাথে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি দরূদও পাঠ করা যাবে। অতঃপর ((আল্লাহু আকবার)) বলে হাঁটুতে ভর করে (সোজা হয়ে) দাঁড়িয়ে উভয় হাত কাঁধ বরাবর উঠিয়ে পূর্বের ন্যায় বুকের উপর রাখবে। এবং শুধু সূরা ফাতিহা পড়বে। যদি কেউ জোহর ও আসরের তৃতীয় ও চতুর্থ রাকা’আতে কখনও সূরা ফাতিহার পর অতিরিক্ত অন্য কোন সূরা পড়ে ফেলে তবে কোন বাধা নেই। কেননা, এ বিষয়ে আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু কতৃক নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম থেকে হাদীস বর্ণিত আছে। প্রথম তাশাহহুদে যদি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি দরূদ পাঠ করা ছেড়ে দেয় এতেও কোন ক্ষতি নেই। কারণ প্রথম বৈঠকে দরূদ পাঠ করা ওয়াজিব নয়; বরং মুস্তাহাব।অতঃপর মাগরিবের নামাযের তৃতীয় রাকা’আত এবং জোহর, আসর ও এশার নামাযের চতুর্থ রাকাআতের পর তাশাহহুদ পড়বে এবং নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লামের উপর দরূদ পাঠ করবে আর আল্লাহ্ কাছে জাহান্নামের আযাব, কবরের আযাব, জীবিত ও মৃত্যুর ফেৎনা এবং মাসীহে দাজ্জালের ফেৎনা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করবে এবং বেশি বেশি দো’আ করবে।===

************************************************************

নামাযের শেষ বৈঠকে এবং এর পরবর্তী সময়ে সুন্নাতী কিছু দো’আঃ

আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম অধিক সময় নিম্নের দো’আটি পাঠ করতেন।
(( رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ )) উচ্চারণঃ ((রব্বানা- আ-তিনা- ফিদ্দুনিয়া- হাসানাতান, ওয়া ফিল আখেরাতি হাসানাতান, ওয়াক্বিনা- আযা-বান্না-র।)) অর্থঃ ((হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন এবং আখেরাতে কল্যাণ দান করুন এবং আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।))

যেমন তা দু’রাকা’আত বিশিষ্ট নামাযে উল্লেখ হয়েছে।অতঃপর যখন শেষ বৈঠকের জন্য বসবে তখন এ বৈঠকে তাওয়াররুক করে বসবে অর্থাৎ, ডান পা খাড়া করে এবং বাম পা ডান পায়ের নিম্ন দিয়ে বের করে রাখবে। পাছা যমীনের উপর রাখবে। এ বিষয়ে আবু হুমাইদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এরপর সব শেষে ((আস্সালামু ‘আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ্)) বলে প্রথমে ডান দিকে এবং পরে বাম দিকে সালাম ফিরাবে।সালামের পর ৩ বার أستغفر الله ((আস্তাগফিরুল্লাহ্)) পড়বে (অর্থঃ আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি)) তারপর নিম্নের দো’আগুলো ১ বার করে পড়বেঃ

(( اَللَّهُمَّ أنْتَ الّسَّلاَمُ وَمِنْكَ السَّلاَمُ تَبَارَكْتَ يَاذَاالْجَلاَلَِ واْلإِكْرَامِ )) উচ্চারণঃ ((আল্লা-হুম্মা আনতাস্ সালা-মু, ওয়ামিনকাস্ সালা-মু, তাবা-রাকতা ইয়া-যাল জালা-লি ওয়াল ইকরা-ম।))অর্থঃ ((হে আল্লাহ্, তুমি প্রশান্তি দাতা, আর তোমার কাছেই শান্তি, তুমি বরকতময়, হে মর্যাদাবান এবং কল্যাণময়।))

(( لاَإِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ لاَشَرِيْكَ لَهُ؛ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ; اَللَّهُمَّ لاَمَانِعَ لِمَا أَعْطَيْتَ وَلاَ مُعْطِىَ لِمَا مَنَعْتَ وَلاَ يَنْفَعُ ذَاالْجَدِّ مِنْكَ الْجَدُّ; لاَحَوْلَ وَلاَ قُوَّةَ إِلاَّ بِاللهِ ؛ لاإِلَهَ إ لاَّ اللهُ وَلاَ نَعْبُدُ إِلاَّ إِيَّاهُ؛ لَهُ النِّعْمَةُ َولَهُ الْفَضْلُ وَلَهُ الثَّنَاءُ الْحَسَنُ ؛ لاَ إِلَه اِلاَّ اللهُ مُخْلِصِيْنَ لَهُ الدِّيْنَ وَلَوْكَرِهَ الْكَافِرُوْنَ. ))উচ্চারণঃ ((লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়াহদাহু- লা-শারী-কালাহু, লাহুল মুল্কু, ওয়ালাহুল হাম্দু, ওয়াহুয়া ‘আলা- কুল্লি শায়্যিন ক্বাদী-র। আল্লা-হুম্মা লা- মা-নি’আ লিমা- আ’তাইতা, ওয়ালা- মু’তিয়া লিমা- মানা’তা, ওয়ালা ইয়ানফা’উ যালজাদ্দি মিনকালজাদ্দু। লা- হাওলা ওয়ালা- কুওওয়াতা ইল্লা- বিল্লা-হি, লা- ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু, ওয়ালা- না’বুদু ইল্লা- ইয়্যা-হু, লাহুন্নি’মাতু ওয়ালাহুল ফাদ্বলু, ওয়ালাহুস্ ছানা-উল হাসানু, লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু মুখলিসী-না লাহুদ্দী-না ওয়ালাউ কারিহাল কা-ফিরূন।))অর্থঃ ((আল্লাহ্ ছাড়া (সত্য) কোন মা’বূদ নেই, তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই, সকল বাদশাহী ও সকল প্রশংসা তাঁরই এবং তিনি সব কিছুর উপরেই ক্ষমতাশালী। হে আল্লাহ! তুমি যা দান করেছো, তার প্রতিরোধকারী কেউ নেই। আর তুমি যা নিষিদ্ধ করেছো তা প্রদানকারীও কেউ নেই। এবং কোন সম্মানী ব্যক্তি তার উচ্চ মর্যাদা দ্বারা তোমার দরবারে উপকৃত হতে পারবে না। তোমার শক্তি ছাড়া অন্য কোন শক্তি নেই। আল্লাহ্ ছাড়া (সত্য) কোন মা’বূদ নেই। আমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করি, নেয়ামতসমূহ তাঁরই, অনুগ্রহও তাঁর এবং উত্তম প্রশংসা তাঁরই। আল্লাহ্ ছাড়া কোন (সত্য) মা’বূদ নেই। আমরা তাঁর দেয়া জীবন বিধান একমাত্র তাঁর জন্যই একনিষ্ঠ ভাবে পালন করি। যদিও কাফেরদের নিকট তা অপছন্দনীয়।))

سبحان الله ((সোবহানাল্লাহ্)) (আল্লাহ্ মহাপবিত্র) ৩৩ বার, الحمد لله ((আল-হামদুলিল্লাহ্)) (সকল প্রশংসা আল্লাহর) ৩৩ বার এবং الله أكبر (( আল্লাহু আকবার)) (আল্লাহ্ সবচেয়ে বড়) ৩৩ বার পড়বে আর একশত পূর্ণ করতে নিম্নের দো’আটি পড়বে।(( لاَإِلَهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لاَشَرِيْكَ لَهُ ؛ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَعَلىكُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ ))উচ্চারণঃ ((লা-ইলাহা ইল্লাল্লা-হু ওয়াহদাহু লা-শারী-কালাহু, লাহুল মুল্কু ওয়ালাহুল হামদু, ওয়াহুয়া ‘আলা- কুল্লি শাইইন ক্বাদী-র।))অর্থঃ ((আল্লাহ্ ছাড়া (সত্য) কোন মা’বূদ নেই, তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই। সকল বাদশাহী ও সকল প্রশংসা তাঁরই জন্য। তিনিই সব কিছুর উপর ক্ষমতাশালী।))

অতঃপর আয়াতুল কুরসী পাঠ করবেঃ(( اللّهُ لاَ إِلَـهَ إِلاَّ هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ لاَ تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلاَ نَوْمٌ لَّهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الأَرْضِ مَن ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلاَّ بِإِذْنِهِ يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَلاَ يُحِيطُونَ بِشَيْءٍ مِّنْ عِلْمِهِ إِلاَّ بِمَا شَاء وَسِعَ كُرْسِيُّهُ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضَ وَلاَ يَؤُودُهُ حِفْظُهُمَا وَهُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيمُ.)) [سورة البقرة: 255]উচ্চারণঃ ((আল্লাহু লা- ইলাহা ইল্লা- হুওয়া, আল হাইয়্যুল কাইয়্যু-ম, লা-তা’খুযুহু ছিনাতুউঁ- ওয়ালা- নাউ-ম, লাহু- মা- ফিচ্ছামা-ওয়া-তি ওয়ামা- ফিল ‘আরদি; মান্ যাল্লাযী- ইয়াশফা’উ ‘ইন্দাহু- ইল্লা- বিইয্ নিহি, ই’য়ালামু মা-বাইনা আইদী-হিম ওয়ামা- খালফাহুম, ওয়ালা- ইউহী-তূ-না বিশাইয়িম্ মিন ‘ইলমিহী-, ইল্লা- বিমা-শা-আ, ওয়াছি’আ কুরছিয়্যুহুচ্ছামা-ওয়া-তি, ওয়াল ‘আরদা, ওয়ালা- ইয়াউ-দুহু হিফজুহুমা- ওয়াহুয়াল ‘আলিয়্যুল আযী-ম।))অর্থঃ ((আল্লাহ্; তিনি ছাড়া অন্য কোন (সত্য) মাবূদ নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সবকিছুর ধারক, তাঁকে তন্দ্রা এবং নিদ্রা স্পর্শ করতে পারে না। আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই তাঁর। কে আছে এমন যে, তাঁর অনুমতি ব্যতীত তাঁর কাছে সুপারিশ করবে? তাদের সম্মুখে ও পশ্চাতে যা কিছু আছে তা তিনি অবগত আছেন। যতটুকু তিনি ইচ্ছে করেন, ততটুকু ছাড়া তারা তাঁর জ্ঞানের কিছুই আয়ত্ত করতে পারে না। তাঁর কুরসী সমস্ত আকাশ ও পৃথিবী পরিবেষ্টিত করে আছে। আর সেগুলোকে রক্ষণা-বেক্ষণ করা তাঁকে ক্লান্ত করে না। তিনি মহান শ্রেষ্ঠ।)) [সূরা আল-বাকারাহঃ ২৫৫]

প্রত্যেক নামাযের পর আয়াতুল কুরসী, সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক এবং সূরা নাছ পড়বে। মাগরিব ও ফজর নামাযের পরে এই সূরা তিনটি (ইখলাস, ফালাক এবং নাছ) তিনবার করে পুনরাবৃত্তি করা মুস্তাহাব। কারণ, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এ সম্পর্কে সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়েছে। একই ভাবে পূর্ববর্তী দো’আগুলির সাথে ফজর ও মাগরিবের নামাযের পর নিম্নের দো’আটি বৃদ্ধি করে দশ বার করে পাঠ করা মুস্তাহাব। কারণ, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এ সম্পর্কে (হাদীসে) প্রমাণিত আছে।

(( لاَإِلَهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لاَشَرِيْكَ لَهُ ؛ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ يُحْييِ وَيُمِيْتُ وَهُوَعَلىكُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ.))উচ্চারণঃ ((লা-ইলাহা ইল্লাল্লা-হু, ওয়াহদাহু- লা-শারী-কালাহু, লাহুল মুলকু, ওয়ালাহুল হামদু, ইওহ য়ী- ওয়া ইউমী-তু ওয়াহুয়া ‘আলা- কুল্লি শায়্যিন ক্বাদী-র।))অর্থঃ ((আল্লাহ্ ছাড়া (সত্য) কোন মা’বূদ নেই, তিনি একক ,তাঁর কোন শরীক নেই। সকল বাদশাহী ও সকল প্রশংসা তাঁরই জন্য। তিনিই জীবিত করেন ও মৃত্যু দান করেন। তিনিই সব কিছুর উপরে ক্ষমতাশালী।))অতঃপর ইমাম হলে তিনবার ((আছ্তাগফিরুল্ল্লাহ)) এবং ((আল্লা-হুম্মা আন্তাস্ সালা-মু, ওয়ামিনকাস্ সালা-মু, তাবা-রাকতা ইয়া- যাল জালা-লি ওয়াল ইকরা-ম।)) বলে মুকতাদীদের দিকে ফিরে মুখোমুখী হয়ে বসবে। অতঃপর পূর্বোল্লেখিত দো’আগুলি পড়বে। এ বিষয়ে অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে, এর মধ্য থেকে সহীহ মুসলিমে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা কর্তৃক নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত আছে। এই সমস্ত আযকার বা দো’আ পাঠ করা সুন্নাত; ফরয নয়।প্রত্যেক মুসলমান নারী এবং পুরুষের জন্যে জোহর নামযের পূর্বে ৪ রাকা’আত এবং পরে ২ রাকা’আত, মাগরিবের নামাযের পর ২ রাকা’আত, এশার নামাযের পর ২ রাকা’আত এবং ফজরের নামযের পূর্বে ২ রাকা’আত। এই মোট ১২ রাকা’আত নামায পড়া মুস্তাহাব। এই ১২ রাকা’আত নামাযকে ‘সুনানে রাওয়াতিব’ বলা হয়। কারণ, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত রাকা’আতগুলি মুকীম অবস্থায় নিয়মিত যত্ন সহকারে আদায় করতেন। আর সফরের অবস্থায় ফজরের সুন্নাত ও (এশা পরবর্তী) বিতর ব্যতীত অন্যান্য রাকা’আতগুলি ছেড়ে দিতেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম সফর এবং মুকীম অবস্থায় উক্ত ফজরের সুন্নাত ও বিতর নিয়মিত আদায় করতেন। তাই আমাদের জন্য নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লামের আমলই হলো উত্তম আদর্শ। আল্লাহ্ তা’আলা এরশাদ করেনঃ(( لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ )) [الأحزاب: 21]অর্থঃ ((নিশ্চয়ই রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম) এর মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ।)) [সূরা আল-আহযাবঃ ২১]

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেনঃ(( صَلٌّوْا كَمَا رَأَيْتُمُوْنِيْ أُصَلِّيْ. )) [رواه البخاري] অর্থঃ ((তোমরা সেভাবে নামায আদায় কর, যে ভাবে আমাকে নামায আদায় করতে দেখ।)) [বুখারী]

এই সমস্ত সুনানে রাওয়াতিব এবং বিতরের নামায নিজ ঘরে পড়াই উত্তম। যদি কেউ তা মসজিদে পড়ে তাতে কোন দোষ নেই। এ সম্পর্কে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেনঃ(( أَفْضَلُ صَلاَةِ الْمَرْءِ فِيْ بَيْتِهِ إِلاَّ الْمَكُْوْبَةْ )) [متفق علىصحته]অর্থঃ ((ফরয নামায ব্যতীত মানুষের অন্যান্য নামায (নিজ) ঘরে পড়াই উত্তম।)) [বুখারী ও মুসলিম, হাদীসটি সহীহ]

এই সমস্ত রাকা’আতগুলি (দৈনিক ১২ রাকা’আত নামায) নিয়মিত যত্ন সহকারে আদায় করা হলো জান্নাতে প্রবেশের একটি মাধ্যম। সহীহ মুসলিমে উম্মে হাবীবাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছিঃ(( مَا مِنْ عَبْدٍ مُسْلِمٍ يُصَلِّيْ لِلَّهِ كُلَّ يَوْمٍ ثِنْتَيْ عَشَرَةَ رَكْعَةً تَطَوُعًا إِلاَّ بَنَى اللَّهُ لَهُ بَيْتاً فِي الْجَنَّةِ. )) [مسلم] অর্থঃ ((যে কোন মুসলিম ব্যক্তিই আল্লাহ্ জন্য (খালেস নিয়্যতে) দিবা-রাত্রে ১২ রাকা’আত নফল নামায পড়বে, আল্লাহ্ অবশ্যই তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর বানাবেন।))

আমরা যা পূর্বে উল্ল্লেখ করেছি ইমাম তিরমিযী তার বর্ণনায় অনুরূপ বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। যদি কেউ আসরের নামাযের পূর্বে ৪ রাকা’আত এবং মাগরিবের নামাযের পূর্বে ২ রাকা’আত এবং এশার নামাযের পূর্বে ২ রাকা’আত পড়ে, তা হলে তা উত্তম হবে। কেননা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ(( رَحِمَ اللَّهُ امْرَأً صَلَّى أَرْبَعًا قَبْلَ الْعَصْرِ.))অর্থঃ ((আল্লাহ্ ঐ ব্যক্তির উপর রহম করুন, যে আসরের (ফরয( নামাযের পূর্বে চার রাকা’আত (নফল( নামায পড়ে থাকে।)) হাদীসটি ইমাম আহমাদ, আবুদাউদ, তিরমিযী বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন এবং ইবনে খুযায়মাহ সহীহ বলেছেন।

রাসূলুল্ল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ(( بَيْنَ كُلِّ أَذَانَيْنِ صَلاَةٌ ؛ بَيْنَ كُلِّ أَذَانَيْنِ صَلاَةٌ ؛ ثُمَّ قَالَ فِي الثَّالِثَةِ لِمَنْ شَاءَ )) [بخاري] অর্থঃ ((প্রত্যেক আযান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়ে (নফল( নামায, প্রত্যেক আযান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়ে (নফল( নামায।)) তৃতীয় বার বলেন ((যে ব্যক্তি পড়ার ইচ্ছে করে।)) [বুখারী]

যদি কেউ জোহরের পূর্বে ৪ রাকা’আত এবং পরে ৪ রাকা’আত পড়ে তবে তা ভাল। এর প্রমাণে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লামে হাদীস; তিনি বলেনঃ(( مَنْ حَافَظَ عَلَى أَرْبَعٍ قَبْلَ الظُّهْرِ وَأَرْبْعٍ بَعْدَهَا حَرَّمَهُ اللَّهُ تَعَالىَ عَلَى النّاَرِ )) [أحمد, صحيح]অর্থঃ ((যে ব্যক্তি জোহরের পূর্বে ৪ রাকা’আত ও পরে ৪ রাকা’আত (সুন্নাত নামায( এর প্রতি যত্নবান থাকে, আল্লাহ্ তা’আলা তার উপর জাহান্নামের আগুন হারাম করে দিবেন।)) [ইমাম আহমাদ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং আহলে সুনান সহীহ সূত্রে উম্মে হাবীবাহ থেকে উল্ল্লেখ করেছেন] অর্থাৎ সুনানে রাতেবার নামাযে জোহরের পরে ২ রাকা’আত বৃদ্ধি করে পড়বে। কারণ জোহরের পূর্বে ৪ রাকা’আত এবং পরে ২ রাকা’আত পড়া সুনানে রাতেবাহ। অতএব জোহরের পরে ২ রাকা’আত বৃদ্ধি করলে উম্মে হাবীবাহর হাদীসের প্রতি আমল হবে। আল্লাহ্ই তাওফীকদাতা। দরূদ ও ছালাম বর্ষিত হোক, আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তাঁর পরিবার-পরিজন এবং সাহাবাগণের প্রতি এবং কেয়ামত পর্যন্ত যারা তাঁর ইত্তেবা’ বা অনুসরণ করবেন তাদের প্রতিও।

>>>সমাপ্ত<<<

***********************

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s