রাসুলুল্লাহ (সঃ) কথাবার্তার স্বরুপ


নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অত্যন্ত সুন্দর কথোপকথনকারী ও সুমিষ্ট ছিলেন।

হযরত রাফে ইবন খাদীজ (রা) হতে বর্ণিত, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, আমি(বাকপটুত্বে ও ভাষার অলংকারে) সবচেয়ে বেশি ফসীহ ও বলীগ। (নাসাঈ ও হাকেম)

হযরত বুরাইদা(রা) থেকে বর্ণিত, বেহেশতীগণ বেহেশতে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ভাষায়(আরবীতে) কথাবার্তা বলবে। (আবুল হাসান ইবন দ্বাহকাক, শামায়েলে)

হযরত ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অল্প কথা বলতেন, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা এত বিন্যাসের সাথে হত, যেমন মুক্তার মালা। (হাকেম)

হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা) বলেন, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমাদের ন্যায় অধিক কথা বলতেন না
(তিবরানী)

হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা সবচেয়ে বেশি সংক্ষেপিত হত, হযরত জিবরাঈল(আ) ও হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যখন যে বিষয়ে প্রয়োজন হত অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত শব্দে তা বলে দিতেন।হযরত ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা অত্যন্ত সংক্ষেপ ও কম শব্দে অধিক অর্থ বিশিষ্ট হত, তাতে কম বেশ হওয়ার অবকাশ ছিল না, তাঁর কথা মতির মালার ন্যায় গাঁথা হত। রাসুলুল্লাহ হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেমে থেমে একটু একটু করে কথা বলতেন, যেন শ্রোতারা হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাণী মুখস্ত করতে পারে।

হযরত হিন্দ ইবন আবি হালা (রা) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আওয়াজ উচ্চ ও কথা বলার ভঙ্গী মধুর ছিল। (শামায়েলে তিরমিযি)

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বেশির ভাগ সময় চুপ থাকতেন, প্রয়োজন ছাড়া আদৌ কথা বলতেন না।হযরত আব্দুল্লাহ ইবন উমার (রা) হতে বর্ণিত, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অশ্লীল কথা বলতেন না। ক্রোধ ও আবেগ সর্বদাই সত্য কথা বলতেন। (আবু দাউদ)

হযরত আলী(রা) হতে বর্ণিত, যে ব্যক্তি কোন অশ্লীল কথা বলে ফেলত, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতেন। অগত্যা কোন শক্ত কথা যদি হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বলতেই হত, তবে তা তিনি ইঙ্গিতে বলতেন, কখনও পরিষ্কারভাবে বলতেন না।

হযরত আলী(রা) হতে বর্ণিত, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন নীরবতা অবলম্বন করতেন, তখন উপস্থিত লোকজন কথা বলতেন, তিনি মজলিসে কারো কথায় বাধা দিতেন না। হযরত জাবের (রা) বলেন, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শুভাকাংক্ষী হিসেবে হাসি পরিত্যাগ করে লোকদেরকে নসিহত করতেন। (মুসলিম শরীফ)

হযরত আব্দুল্লাহ ইবন হারেস(রা)থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বীয় সাহাবীদের(রা) সামনে বেশি বেশি মুচকি হাসি দিতেন এবং তাদের কথাবার্তার উপর অত্যন্ত আনন্দিত হতেন এবং তাদের সাথে বেশি মিলে মিশে থাকতেন। (তিরমিযি)

একদা একটি গ্রামবাসী রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে এমতাবস্থায় হাজির হল, যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মন পেরেশান ছিল, সাহাবায়ে কেরাম(রা) রাসুলুল্লাহর উজ্জ্বল চেহারায় বিষন্নতার ভাব দেখে বুঝে ফেললেন যে, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মন আজ পেরেশান। ঐ গ্রাম্য ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট কিছু জিজ্ঞেস করতে চাইল, কিন্তু সাহাবায়ে কেরাম (রা) তাকে নিষেধ করলেন যে, এ সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মন পেরেশান, এ সময় কিছু জিজ্ঞেস করো না। গ্রাম্য ব্যক্তি বলল, তোমরা আমাকে নিষেধ করো না। ওই সত্ত্বার কসম ! যিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সত্য নবী হিসেবে প্রেরণ করেছেন, আমি হুজুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে না হাসিয়ে ছাড়বো না। সারকথা , ঐ গ্রাম্য ব্যক্তি আরজ করলো যে, ইয়া রাসুলুল্লাহ ! শুনতে পেলাম যে, দাজ্জাল ছরিদ(এক প্রকার খাদ্য) নিয়ে আসবে, আপনার কি এ অনুমতি যে, আমি অনাহারে মারা যাই, আর আদৌ ঐ ছরিদ আহার না করি, না এ অনুমতি যে, আমি ঐ ছরিদ খুব পেট ভরে খেয়ে, আল্লাহ তায়ালার উপর ঈমান এনে তাকে(দাজ্জাল) অস্বীকার করি?
একথা শুনামাত্র রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এত হাসলেন যে, হুজুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দাঁত মোবারক প্রকাশ হয়ে গেল। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঐ গ্রাম্য ব্যক্তির উত্তরে এরশাদ করলেন, যে বস্তুর দ্বারা আল্লাহ তায়ালা অন্যান্য মুসলমানদেরকে ঐ (দাজ্জাল) কাফের থেকে বেপরোয়া করে দিবেন, তোমাকেও ঐ জিনিসের দ্বারা ঐ অভিশপ্ত থেকে বেপরোয়া করে দিবেন।
হযরত হিন্দ ইবন আবি হালা(রা) বর্ণনা করেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবাগণ(রা)ও হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুকরণ ও সম্মানার্থে তাঁর সামনে শুধু মুচকি হাসি হাসতেন, উচ্চ হাসি দিতেন না। (শামায়েলে তিরমিযি)

হুজুর হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বদা প্রফুল্লচিত্ত ও আনন্দিত থাকতেন, কিন্তু কোরআন মাজীদ অবতীর্ণ হবার সময়, কেয়ামতের আলোচনার সময় ও ওয়াজের সময়, হুজুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর চেহারায় মুচকি হাসির স্থলে, ভয় ভীতির ভাব প্রকাশ পেত।

হযরত ইবন উমার(রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রকৃত সন্তুষ্টির সময় অত্যন্ত আনন্দিত ও প্রফুল্ল থাকতেন, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওয়াজ শরীফ(নসীহতমূলক) ঘটনায় পরিপূর্ণ থাকত, হাস্যকর ও পরিহাস থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকত, রাসুলুল্লাহ (সা) যদি কখনও রাগ হতেন তবে শুধু আল্লাহ তায়ালা ও দ্বীনের সন্তুষ্টির জন্যেই হতেন। (ইবন হাব্বান)

হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর বিনয়

হযরত উসামা ইবন যায়েদ (রা) হতে বর্ণিত, নবী করীম রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সমস্ত পৃথিবী থেকে সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও সবার থেকে বেশি বিনয়ী ও বিনীত স্বভাবের ছিলেন। (বুখারী ও মুসলিম)

হযরত ইবন আমর (রা) হতে বর্ণিত , আমি রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে দেখেছি যে,(হজ্ব সম্পাদনকালে) লাল উটে আরোহিত অবস্থায় ‘জমরা’ তে প্রস্তরসমূহ নিক্ষেপ করেছিলেন। তখন তাঁর নিকটে আসতে কাউকেও বাধা দেওয়া হত না। যেমন অন্যান্য বাদশাহদের জন্য রাস্তা খালি করা হয়।


রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এত বিনীত প্রকৃতির ছিলেন যে, স্বীয় গাধার উপর গদির স্থলে চাদর বিছিয়ে আরোহন করতেন পরে কাউকে নিজের সাথে আরোহন করাতেন।

রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রোগীদের রোগ পরিদর্শন করতেন। জানাযার সাথে তাশরীফ নিতেন। ক্রীতদাসের দাওয়াত কবুল করতেন। স্বীয় কাপড় নিজেই পট্টি লাগাতেন এবং ঘরে পারিবারিক কাজে অংশগ্রহণ করতেন।

হযরত আনাস (রা) হতে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেহেতু কারো থেকে কাজ নেয়াকে পছন্দ করতেন না তাই সাহাবায়ে কেরাম(রা) তাঁর কাজ করতেন না। (তিরমিযি)

হযরত জাবির (রা) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিশুদের কাছ দিয়ে অতিক্রম করতেও তাদেরকে সালাম করতেন। (বুখারি ও মুসলিম)

হযরত আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত, একজন ব্যক্তিকে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর দরবারে উপস্থিত করা হল। সে ভয়ে কাঁপতে লাগল, নবীজী (সা) তাকে সান্তনামূলক বাণী শোনালেন, ভীত হইও না। আমি বাদশাহ নই, বরং আমি কোরাইশ বংশের এক মহিলার সন্তান যিনি শুকনা গোশত খেতেন। (আবু দাউদ, নাসাঈ)

হযরত আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবায়ে কেরাম(রা) এর সাথে এরুপভাবে মিলে বসতেন যে, কোন অপরিচিত ব্যক্তি তাকে জিজ্ঞাসা করা ব্যতীত চিনতে পারত না। তাই সাহাবায়ে কেরামগণ আরজ করলেন যে, আপনি এমন জায়গায় বসুন যাতে অপরিচিত মানুষজন আপনাকে চিনতে পারে। সুতরাং শুধু এ উদ্দেশ্যে সাহাবাগণ হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বসার জন্যে মাটির একটি উঁচু স্থান বানিয়ে দেন। (আবু দাউদ, নাসাঈ)

হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা) বলেন যে, একবার আমি আরজ করলাম, ইয়া রাসুলুল্লাহ ! (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার আত্মা আপনার উপর উৎসর্গ হোক। আপনি বালিশে ঠেস দিয়ে আহার করুন। এতে আপনি আরাম পাবেন। কিন্তু
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আহার করার সময় ঠেস দেয়ার স্থলে আরো বেশি ঝুকে আহার করতে লাগলেন, এমনকি তাঁর মাথা মুবারক জমিনে লাগার উপক্রম হয়ে গেছে। অতঃপর হুজুর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করলেন, আমি ক্রীতদাসের ন্যায় খাব ও ক্রীতদাসের ন্যায় বসবো। (ইবন জারীর)

হযরত আনাস (রা) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জীবনে কখনো ঐ থালা যাতে উপহারাদি পরিবেশন করা হয় তাতে এবং ট্রে এর মধ্যে আহার করেননি। (বুখারি)

নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে যদি কোন সাহাবা (রা) কিংবা কোন অপর ব্যক্তি ডাকতেন, তখন উত্তরে তিনি বলতেন লাব্বাইক, অর্থাৎ আমি উপস্থিত। (আবু নাঈম, শামায়েলে তিরমিযি)

রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন লোকদের সাথে অর্থাৎ সাহাবায়ে কেরামের সাথে মজলিসে বসতেন, তখন তারা যেরূপ কথাবার্তা বলতেন তিনিও তাই বলতেন। যেমন তারা যদি দুনিয়ার কথাবার্তা শুরু করতেন, তখন তিনিও দুনিয়ার কথাবার্তা বলতেন। সারকথা, হুজুর(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ভদ্রতার কারণে মজলিসেও লোকদের লক্ষ্য রাখতেন।

হযরত জাবের ইবন ওমর (রা) হতে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সামনে সাহাবায়ে কেরাম (রা) কবিতা আবৃত্তি করতেন এবং জাহেলিয়াত বা অজ্ঞতার কালের কথা আলোচনা করে হাসতেন, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও তাদের সাথে মুচকি হাসি দিতেন এবং হারাম ব্যতীত অন্য কোন (বৈধ) জিনিসের জন্য তাদেরকে নিষেধ করতেন না। (মুসলিম শরীফ)

***************************

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s