আল্লাহর সাথে শিরক


আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘য়ালা বলেনঃ

তোমরা আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক্ করবে না। (সূরা, নিসা-৪:৩৬)

শিরক শব্দের আভিধানিক অর্থ- অংশীদারিত্ব, অংশীবাদ, মিলানো, সমকক্ষ করা, অংশীস্থির করা, সমান করা, ভাগাভাগি, সম্পৃক্ত করা। ইংরেজীতে Poytheism (একাধিক উপাস্যে বিশ্বাস), Sharer, Partner, Associate।

পারিভাষিক পরিচিতি-
• “শরীয়তের পরিভাষায় যেসব গুনাবলী কেবল আল্লাহ্র জন্য নির্ধারিত সেসব গুনে অন্য কাউকে গুনান্বিত ভাবা বা এতে অন্য কারো অংশ আছে বলে মনে করাই শিরক্।”

• “শিরক্ হচ্ছে বান্দাহর আল্লাহর সাথে তাঁর রুবুবিয়্যাত সংক্রান্ত কর্ম কিংবা তাঁর জাত ও আসমা ওয়াস সিফাতে তথা নাম ও গুনাবলী অথবা উলুহিয়্যাতে (ইবাদতে) কাউকে শরীক করা”। (মিরাসিল আম্বিয়া, পৃঃ ৮)

• শিরক্ হচ্ছে আল্লাহর সাথে এমন বিষয়ে সমকক্ষ স্থির করা যেটা আল্লাহর জন্যই প্রযোজ্য। যেমন- আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করা, অন্য কারো নিকট আশা করা, আল্লাহর চাইতে অন্য কাউকে বেশী ভালবাসা, অর্থাৎ আল্লাহর ইবাদতের কোন একটি অন্যের দিকে সম্বোধন করাকে শিরক্ বলে।

• তাওহীদুল্লাহ হচ্ছে আল্লাহর সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পর্কযুক্ত মানুষের সকল বিশ্বাস, কথা ও কাজে আল্লাহর এককত্বের উপলব্দি ও মেনে চলা। পক্ষান্তরে শিরক্ হচ্ছে এর সম্পূর্ণ বিপরীত।

 

• ইমাম কুরতুবী বলেন, শিরক্ হল আল্লাহর নিরংকুশ প্রভূত্বে কারো অংশীদারিত্বের আক্বীদা পোষণ করা।

 

• আক্বীদার পরিভাষায়, শিরক্ হচ্ছে আল্লাহর সাথে সংশ্লিষ্ট ও সীমাবদ্ধ কোন বিষয় আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারো জন্য করা।

• “শিরকের ক্ষেত্রে একটা বিষয় লক্ষ্যনীয় যে, এতে দু‘শরীকের অংশ সমান হওয়া আবশ্যক নয়। বরং শতভাগের একভাগের অংশীদার হলেও তাকে অংশীদার বলা হয়। তাই আল্লাহতা‘য়ালার হকের সামান্যতম অংশ অন্যকে দিলেই তা শিরকে পরিণত হবে।এতে আল্লাহর অংশটা যতই বড় রাখা হোক না কেন।”

শিরকের ভয়াবহতা
শিরকের পরিণাম ভয়াবহ। এটি মানুষের চুড়ান্ত ধ্বংস ডেকে আনে। আল কোরআন ও সহীহ হাদীস থেকে এর ভয়াবহতার স্বরূপ তুলে ধরব ইনশাআল্লাহ্।

শিরক্ সবচেয়ে বড় অপরাধ-বড় গুনাহ-
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতা‘য়ালা বলেনঃ

আল্লাহর সাথে শরীক করো না। নিশ্চয়ই শিরক চরম যুলম। (সূরা, লুকমান ৩১:১৩)

ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন এক ব্যক্তি বলল,

হে আল্লাহর রাসুল সবচেয়ে বড় গোনাহ কোনটি? রাসুল(সঃ) বললেন, আল্লাহর সাথে শরীক করা, অথচ আল্লাহই তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। (সহীহ বুখারী, মুসলিম)

শিরক্ এর অপরাধ/ গুনাহ আল্লাহ্ ক্ষমা করবেন না-
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতা‘য়ালা বলেনঃ

নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করা ক্ষমা করেন না। এটি ছাড়া অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন। এবং কেহ আল্লাহর শরীক্ করলে সে এক মহাপাপ আরোপ করে। (সুরা, নিসা-৪:৪৮)

নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তাঁর সাথে শরীক্ করা ক্ষমা করেন না। এটি ছাড়া অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন। এবং কেহ আল্লাহর শরীক্ করলে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট হয়। (সুরা, নিসা-৪:১১৬)

জাবির বিন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত, নবী (সঃ) বলেছেন- বান্দার জন্য সর্বদাই ক্ষমা রয়েছে যতক্ষন পর্যন্ত হিযাব বা পর্দা পতিত না হয়। বলা হলো, হে আল্লাহর রাসুল! হিযাব বা পর্দা কি? তিনি বললেন, আল্লাহর সাথে শরীক্ করা। (মুসনাদে আহমদ, ইবনু কাছীর ১ম খন্ড ৬৭৮পৃঃ)

শিরক্ করলে জান্নাত হারাম এবং জাহান্নাম অবধারিত-

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘য়ালা বলেনঃ

হে বনী ইসরাইল! তোমরা আমার রব এবং তোমাদের রব আল্লাহর ইবাদত কর। কেউ আল্লাহর শরীক করলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত অবশ্যই হারাম করবেন এবং তার আবাস জাহান্নাম। (সূরা, মায়েদা-৫:৭২)

রাসুল (সঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোন কিছুকে আল্লাহর সাথে শরীক্ করা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, সে জাহান্নামে যাবে। (মুসলিম)

শিরক্ করলে সব আমল বাতিল হয়ে যায় এবং ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যায়-

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘য়ালা বলেনঃ

তোমার প্রতি এবং তোমার পূর্ববর্তীদের প্রতি অবশ্যই এই ওহী হয়েছে তুমি আল্লাহর সাথে শরীক্ করলে তোমার আমল নিষ্ফল হয়ে যাবে এবং অবশ্য তুমি হবে ক্ষতিগ্রস্থ। (সূরা যুমার, ৩৯:৬৫)

সূরা আনফালের ৮৩-৮৭ আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘য়লা ১৮ জন নবীর নাম নিয়ে তাদের ব্যাপারে বলেছেন-

এটি আল্লাহর হেদায়েত, নিজ বান্দাহদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তিনি এটি দ্বারা সৎপথে পরিচালিত করেন। তারা যদি শিরক্ করতো তবে তাদের কৃতকর্ম নিস্ফল হত। (সূরা, আনআম-৬:৮৮)

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘য়লা আরও বলেনঃ

আমি তাদের আমলের প্রতি মনোনিবেশ করব, অতঃপর সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধুলিকনায় পরিণত করে দেব। (সূরা, ফোরক্বান-২৫:২৩)

শিরককারী ধ্বংসে এবং বিপর্যয়ে পতিত হয়-

আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতা‘য়ালা বলেনঃ

যে কেউ আল্লাহর শরীক করে সে যেন আকাশ থেকে পড়ল, কিংবা বায়ু তাকে উড়িয়ে নিয়ে এক দূরবর্তী স্থানে নিক্ষেপ করল। (সূরা, হাজ্জ ২২:৩১)

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘য়ালা আরও বলেনঃ

যারা আল্লাহর সাথে অপর ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে, সুতরাং শীঘ্রই ওরা (মুশরিকরা) এর পরিনতি জানতে পারবে। (সূরা, হিজর ১৫ঃ৯৬)

আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি নবী (সঃ) থেকে বর্ণনা করেন, নবী (সঃ) বলেন- তোমরা সাতটি ধ্বংসাত্মক বস্তু থেকে বেঁচে থাকবে। সাহাবাগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসুল সেগুলো কি? রাসুল (সঃ) বলেলেন, ‘‘আল্লাহর সাথে শরীক করা এবং যাদু——— (বুখারী ও মুসলিম)

শিরককারী মুশরিক অপবিত্র –

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘য়ালা বলেনঃ
নিশ্চয়ই মুশরিকরা অপবিত্র। (সূরা, তাওবাহ-৯:২৮)

মুশরিকদের জন্য দোয়া করা যাবে না

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘য়ালা বলেনঃ
আত্মীয়-স্বজন হলেও মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা নবী ও মুমিনদের সংগত নয়, এ বিষয়টি সুস্পষ্ট হওয়ার পর যে তারা জাহান্নামী। (সূরা, তাওবাহ ৯:১১৩)

মুশরিকরা সৃষ্টির অধম-

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘য়ালা আরও বলেনঃ
আহলে কিতাব ও মুশরিক কাফেররা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে থাকবে। তারাই সৃষ্টির অধম। (সূরা, বাইয়্যেনাহ ৯৮:৬)

শিরক্ করলে ঈমানদার ও কাফের-মুশরিকে পরিণত হয়ে যায়-
ঈমান আনার পরেও কেউ যদি আল্লাহর সাথে শিরক্ করে তবে সে কাফের এবং মুশরিক হয়ে যায়। ইসলামী শরী‘য়া অনুযায়ী তাকে ‘মুর্তাদ’ বলা হয়। তার হুদুদ (শাস্তি) মৃত্যুদন্ড। রাসুল (সঃ) বললেন- “তোমরা সাতটি ধ্বংসাত্মক ও সর্বনাশা গুনাহ থেকে বিরত থাক।’’ অত:পর শিরকের কথা বললেন।

অত:পর বললেন- যে ব্যক্তি নিজের দ্বীনকে পরিবর্তন করে(অর্থাৎ ইসলামকে ত্যাগ করে) তাকে হত্যা কর। (বুখারী, আহমাদ, কবীরা গুনাহ-বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার পৃঃ৭)

আল্লাহ সুবতানাহু ওয়াতা‘য়ালা বলেনঃ

যদি তোমরা তাদের (মুশরিকদের) কথামত চল তবে তোমরা অবশ্যই মুশরিক হবে। (সূরা, আনআম ৬ঃ১২১)

উপরোক্ত আয়াতে আল্লাহ সুবতানাহু ওয়াতা‘য়ালা মুসলিমদেরকে সাবধান করে দিয়েছেন যদি তারা মুশরিকদের আক্বীদা-বিশ্বাস, কাজ-কর্মে আনুগত্য করে তাহলে তারা মুশরিক হয়ে যাবে।
শিরক মানবতার জন্য অবমাননাকর-

মানুষের সম্মানকে ধূলায় লুন্ঠিত করে ও তার সামর্থ্যকে নিচু করে দেয়। তার মর্যাদাকেও নিচু করে দেয়, কারণ আল্লাহ পাক মানুষকে খলীফা হিসেবে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন এবং তাকে সম্মানিত করেছেন এবং তাকে সমস্ত নাম শিখিয়েছেন। তার অনুগত করে দিয়েছেন; যা কিছু আছে আসমান ও যমীনে, তাকে এই জগতের সকলের উপর নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিন্তু সে তার অবস্থাকে ভুলে গেছে। ফলে সে এই জগতের কোন কোন জিনিসকেও ইলাহ ও মাবুদ বানিয়ে নিয়েছে। তার কাছে নিজেকে ছোট করে এবং অপমানিত হয়। এর থেকে অসম্মানের বিষয় আর কি হতে পারে যা আজকে দেখা যাচ্ছে কোটি কোটি লোক হিন্দুস্তানে গাভীর পূজা করছে যাকে আল্লাহ পাক মানুষের খেদমতের জন্য সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে ঝাঁক ধরে বসে আছে। তাদের কাছে নিজেদের প্রয়োজন নিবেদন করছে। অথচ তারাও তাদের মতই আল্লাহ পাকের দাস। না নিজেদের জন্য তারা কোন উপকার করতে পারে; না ক্ষতি করতে পারে। দেখ, হোসেন (রাঃ) নিজেকে শহীদ হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে পারেনি জীবিতাবস্থায়। তবে কেমন করে অপরের কষ্ট দূর করবেন এখন মৃত্যুর পর এবং ভালকে ডেকে আনবেন? মৃতরাই জীবিত মানুষের দোয়ার মুখাপেক্ষী। তাই আমরা তাদের জন্য দোয়া করি। আমরা যেন তাদের কাছে দোয়া না চাই আল্লাহকে ছেড়ে।

আল্লাহ পাক এই সম্বন্ধে বলেনঃ
অর্থাৎ, যারা আল্লাহকে ছেড়ে অন্যকে ডাকে তারা এতটুকুও জিনিস সৃষ্টি করে না, বরং তাদেরকেই সৃষ্টি করা হয়েছে।মৃতরা কখনই জীবিতদের সমান নয় এবং তারা জানে না কখন তাদেরকে কবর থেকে উঠানো হবে। (সুরা নহলঃ ২০)

এবং অন্যত্র আল্লাহ পাক বলেনঃ
যে আল্লাহ পাকের সাথে কোন শিরক করে, যেন সে আকাশ থেকে পড়ে গেছে এবং এক পাখি তাকে ঠোঁট দিয়ে নিয়েছে অথবা তাকে বাতাস বহু দূরে নিক্ষেপ করেছে। (সুরা হজ্জঃ ৩১)

 

কুসংস্কার ও ভয়ঃ
যেখানে শিরক চলতে থাকে সেখানে নানা ধরনের কুসংস্কার ও ভয় প্রকাশ পেতে থাকে কোন প্রকাশ্য কারণ ছাড়াই। আল্লাহ পাক এই সম্বন্ধে বলেনঃ

যারা কুফরী করে আমি তাদের অন্তরে ভয়কে নিক্ষেপ করব। ঐ কারণে যে তারা আল্লাহর সাথে শিরক করছে, আর যে সম্বন্ধে আল্লাহ পাক কোন প্রমান পাঠাননি। তাদের ঠিকানা আগুন এবং জালেমদের জন্য সেটা কতই না নিকৃষ্ট জায়গা। (সুরা আল ইমরানঃ ১৫১)

শিরকের কারণ

কোরআন এবং সুন্নাহ থেকে আমরা এখানে র্শিকের ৬ টি কারণ উপস্থাপন করছি, যেন সকলে এগুলো জেনে শিরক থেকে বেঁচে থাকতে পারে-

আল্লাহ সম্পর্কে মন্দ ধারণা ও খারাপ মনেবৃত্তি পোষণ করা-
মন্দ ধারণাই শিরকের নেপথ্য কারণ। যে কোন শিরকের পেছনে আল্লাহ সম্পর্কে কোন না কোন দোষ-ত্রুটি ও মন্দ ধারণা কাজ করে। ভালবাসার বিপরীত এ মন্দ ধারণা পোষন করার কারণেই মানুষ আল্লাহকে ছেড়ে অন্যেও ইবাদত করে। গায়রুল্লাহকে তার জন্য আল্লাহর চেয়ে অধিক দয়ালু ও কল্যানকামী মনে করে। আল্লাহ সম্পর্কে যারা মন্দ ধারণা পোষণ করে তাদের ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেনঃ

এবং মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারী, মুশরিক পুরুষ ও মুশরিক নারী যারা আল্লাহ সম্পর্কে মন্দ ধারণা পোষন করে আল্লাহ তাদেরকে শাস্তি দেবেন। অমঙ্গল চক্র তাদের জন্য। আল্লাহ তাদের উপর রাগান্বিত হয়েছেন এবং তাদের প্রতি অভিসম্পাত করেছেন এবং তাদের জন্য জাহান্নাম প্রস্তুত রেখেছেন, তা কত নিকৃষ্ট আবাস। (সূরা ফাতহ ৪৮ঃ৬)

মুশরিকদের এ মন্দ ধারণার বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিবাদ জানিয়ে তাওহীদের ইমাম ইব্রাহীম (আঃ) তাঁর সূর্য্য, চন্দ্র, নক্ষত্র ও মূতি পুজারী জাতির সামনে যে বক্তব্য দিয়েছিলেন পবিত্র কুরআনে তা এভাবে উদ্ধৃত হয়েছে-

তোমরা কিসের পুজা করছ? তোমরা কি আল্লাহকে বাদ দিয়ে সম্পূর্ণ মিথ্যা অলীক মাবুদগুলোকে চাও? তাহলে বিশ্ব জাহানের রব সমন্ধে তোমাদের কি ধারণা? (সূরা- সাফফাত ৩৭ঃ৮৫-৮৭)

এ কথার মর্ম হলো, তোমরা রাব্বুল আলামীনের মধ্যে কি ধরণের দোষ-ত্রুটি ও মন্দের ধারনা পোষণ করছ? যার ফলে তাকে পরিত্যাগ করেছ এবং তাঁর পরিবর্তে এতসব মা’বুদ ও দেবতা বানিয়ে নিয়েছ? আল্লাহর সত্ত্বা, তাঁর গুনাবলী ও কার্যাবলী সম্পর্কে কি ধরণের খারাপ মনোবৃত্তি পোষণ করছ? কি ধরণের দোষ-ত্রুটি তাঁর মধ্যে আছে বলে ধারণা করছ? কি ধরণের অক্ষমতা, অপারগতা, করুণার অভাব তাঁর মধ্যে আছে বলে তোমরা মনে করছ? যার ফলে সরাসরি তাঁর ইবাদত না করে ভায়া ও মাধ্যমের পুজা করছ এবং তাদের কাছেই কল্যাণের প্রত্যাশা করছ? এবং অকল্যাণ থেকে বাঁচার জন্য তাদের শরণাপন্ন হচ্ছ? ঊপরন্তু মুশরিকরা মনে করে যে, আল্লাহ তাদেরকে দয়া করবেন না। এজন্যই তারা মাধ্যম ও ভায়া মা’বুদের ইবাদত করে। আল্লাহর নিকট এসব ভায়া মা’বুদের প্রভাব-প্রতিপত্তি আছে বলে বিশ্বাস করে। আল্লাহ তাদেরকে ভাল না বাসলেও ভায়া মা’বুদরা সুপারিশ করলে সে সুপারিশ আল্লাহ বাতিল করতে পারেন না।

সৃষ্টিকে স্রষ্টার সমতুল্য করা-

আল্লাহর সাথে শিরকের কারণ হচ্ছে, সৃষ্টিকে স্রষ্টার সমতুল্য করা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন-

তাঁর সমতুল্য কোন কিছুই নেই এবং তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। (সূরা শুরা ৮২ঃ১১)
তাঁর সমতুল্য কেউই নেই। (সূরা- ইখলাস ঃ৪)

অথচ মানুষ দু’আ, ভয়, আশা-ভরসা, সিজদা, মানত, কোরবানী এসব ইবাদত গুলো এককভাবে আল্লাহর জন্য নিবেদন না করে সৃষ্টিকেও এসব ইবাদতে শরীক করছে। পীর, ফকির, মাজার, মুর্তি, মৃত অলী-আউলিয়াদের জন্য তারা এসব নিবেদন করার মাধ্যমে সৃষ্টিকে স্রষ্টার সমতুল্য করছে। আল্লাহ আমাদের একমাত্র রব। অথচ মানুষ নবী, ফেরেশতা, জ্বীন, ওলী- আউলিয়া, পোপ-ফাদার, পুরোহিত, পীরবাবা, খাজাবাবা, দয়াল বাবা, কবর-মাজারস্থ মৃত ব্যক্তি, মুর্তি-দেবতার কাছে মানুষের লাভ-ক্ষতি, দান-বঞ্চনার ক্ষমতা আছে বলে মনে করে একমাত্র রব আল্লাহর সমতুল্য করছে। আল্লাহ একমাত্র আইন-বিধান দাতা, সার্বভৌমত্বেও মালিক অথচ মানুষ মানুষের জন্য আইন-বিধান দিয়ে সার্বভৌমত্বেও মালিক সাজছে। এমনি আরো অসংখ্যভাবে মানুষ সৃষ্টিকে স্রষ্টার সমতুল্য করছে।

আল্লাহকে যথাযথ মর্যাদা না দেয়া-

শিরক মানে আল্লাহর সমস্ত মর্যাদাকে অস্বীকার করা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেনঃ

তারা আল্লাহর যথোচিত সম্মান করে না। কেয়ামতের দিন সমগ্র পৃথিবী থাকবে তাঁর হাতের মুঠোয় এবং আকাশমন্ডলী ভাঁজ করা থাকবে তাঁর ডান হাতে। পবিত্র মহান তিনি। তারা যাকে শরীক করে তিনি তাঁর উর্দ্ধে। (সূরা যূমার ৩৯ঃ৬৭)

আয়াতের “হাক্কা ক্বাদরিহী” অর্থ যথাযথ মর্যাদা, যেরূপ মর্যাদা দিতে হয় সেরূপ মর্যাদা। পরিপূর্ণ, অবিভাজ্য, অংশীদারমুক্ত মর্যাদা। সে মর্যাদার অপর নাম তাওহীদ, একত্ব, পরিপূর্ণ আত্মসমর্পন। যে শিরক করল সে তাঁর মর্যাদা খন্ডিত করল, ভাগ করল, তাঁর মর্যাদার একাংশ অন্যকে দিল এবং আল্লাহকে দিল আংশিক মর্যাদা। আল্লাহকে যেরূপ মর্যাদা দেয়া উচিত সেরূপ মর্যাদা না দেয়ার কারণেই অনেকে আল্লাহর সাথে শিরক করে।

আল্লাহ সম্পর্কে অজ্ঞতা ও মুর্খতা-

শিরকের কারণ সমূহের মধ্যে এটি হল জননী বা মাতৃ কারণ। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেনঃ

বলুন, হে মূর্খরা! তোমরা কি আমাকে আল্লাহ ব্যতীত অন্যের ইবাদত করতে আদেশ করছ? (সূরা, যুমার-৩৯ঃ৬৪)
আল্লাহ এবং তাঁর একত্ব সম্পর্কে মূর্খতা সবচেয়ে বড় মূর্খতা। আর আল্লাহর একত্ব সম্পর্কে জ্ঞান হচ্ছে সবচেয়ে বড় জ্ঞান। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেনঃ জেনে রেখো, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। (সূরা মুহাম্মদ-৪৭ঃ১৯)

সুতরাং আসুন আমরা এ সকল কারণ পরিত্যাগ করে ও আল্লাহ সব’হানাহু ওয়া তা’আলার সুন্দর এই দ্বীন সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করে আমাদেরকে এই ধ্বংসাত্মক গুনাহ বা অপরাধ থেকে বাঁচাই।

**************************

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s