আমি তওবা করতে চাই কিন্তু…


সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য। আমরা তাঁর প্রশংসা করছি এবং তাঁরই কাছে সাহায্য চাচ্ছি। আল্লাহ তা’আলা যাকে হেদায়াত দান করেন তাকে কেউ পথভ্রষ্ট করতে পারেনা। আর তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন তাকে কেউ পথ দেখাতে পারে না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন সত্য ইলাহ নেই। তিনি একক এবং তাঁর কোন শরীক নেই এবং আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল। অতঃপর:

মহান আল্লাহ সমস্ত মুমিনদেরকে তাওবা করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন:

হে মুমিনগণ! তোমরা সকলে আল্লাহর পানে তাওবা (প্রত্যাবর্তন) কর, নিশ্চয় তোমরা সফলকাম হবে। (আননূর: ৩১)

তিনি তাঁর বান্দাদেরকে তাওবাকারী ও অত্যাচারী হিসেবে ভাগ করেছেন। এখানে তৃতীয় কোন ভাগ নেই। মহান আল্লাহ বলেন:

যারা তাওবা করবে না, তারাই অত্যাচারী। (আলহুজুরাত: ১১)

আর এখন এমন এক সময় এসেছে যাতে মানুষ আল্লাহর দ্বীন থেকে দূরে সরে গেছে এবং পাপাচার ব্যাপকতা লাভ করছে ও বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে। অবস্থা এমন হয়েছে যে, এ থেকে কেউই বাঁচতে পারছে না আল্লাহর বিশেষ রহমত ছাড়া।

আল্লাহর বিশেষ ইচ্ছা এই যে, তিনি তাঁর নূরকে অবশ্যই পূর্ণতা দান করবেন, যার ফলে অনেক লোকই তাদের গাফলতী ও তন্দ্রা থেকে জেগে উঠেছে। তারা বুঝতে পেরেছে যে, তারা আল্লাহর হকের ব্যাপারে কার্পণ্য করেছে, তার অবাধ্যতার জন্য অনুতপ্ত, যার ফলে তারা তাওবার দিকে এগিয়ে এসেছে। অন্যরা এই বিষাক্ত জীবনের ব্যাপারে বিতশ্রদ্ধ হয়ে উঠেছে। তারা পথ খুঁজছে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের হয়ে আসার জন্য। কিন্তু তাদের সামনে বাধা হয়ে উঠেছে কিছু প্রতিবন্ধকতা যা তাদের মাঝে ও তাওবার মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এসব প্রতিবন্ধকতার মধ্যে কিছু হলো মনের মধ্যে, আর কিছু হলো তার চতুর্পাশে। আমি এ পুস্তিকা রচনা করেছি এ আশা করে যে, এসব বিষয় পরিষ্কার করা ও এর হুকুম স্পষ্ট করে বর্ণনা করার লক্ষ্যে এবং শয়তানকে বিতাড়িত করার উদ্দেশ্যে।

এ নিবন্ধে একটি ভূমিকা থাকবে গুনাহকে তুচ্ছজ্ঞান করার ভয়াবহতা সম্পর্কে, এরপর তাওবার শর্তাবলীর ব্যাখ্যা ও তার মানসিক চিকিৎসা সম্পর্কে। এরপর থাকবে তাওবা সম্পর্কে ফাত্ওয়া, দলীল প্রমাণসহ কুরআন, হাদীস এবং আহলুল ইলমের অভিমত। পরিশেষে থাকবে একটি উপসংহার। আল্লাহর নিকট দু’আ করি, তিনি যেন আমাকে এবং আমার ভাই-বোনদেরকে এ থেকে নসিহত ও উত্তম দাওয়াত গ্রহণ করার তাওফীক দান করেন এবং আমাদের সকলের তাওবা কবুল করেন।

পাপকে তুচ্ছজ্ঞান করার ভয়াবহতা

পরাক্রমশালী আল্লাহ তার বান্দাদের নির্দেশ দিয়েছেন নিষ্ঠার সাথে তাওবা করার জন্য। তিনি বলেন:

হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর নিকট নিষ্ঠার সাথে তাওবা কর (প্রত্যাবর্তন কর)।’’ (আত তাহরীম: ৮)

কেরামান কাতেবীন (ফেরেশতা) আমাদের কারো গুনাহ্ লিখার পূর্বে আল্লাহ আমাদেরকে তাওবার ব্যাপারে অনেক ঢিল দিয়েছেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: নিশ্চয় বামপাশের ফেরেশতা কলম উঠিয়ে রাখে ছয় ঘন্টা পর্যন্ত ভূলকারী মুসলিম বান্দা থেকে। বান্দা যদি অনুতপ্ত হয় এবং আল্লাহর নিকট ক্ষমা চায় তাহলে তা মাফ করে দেয়া হয়, নতুবা একটি গুনাহ লিখা হয়। (তাবারানী, বায়হাকী, ইমাম আলবানী হাদীসটিকে হাসান বলে অভিহিত করেছেন) আরেকটি ফুরসত হলো লিখার পরে এবং মৃত্যু উপস্থিত হওয়ার পূর্বে।

বর্তমান যুগের সমস্যা হলো অনেক মানুষই আল্লাহকে ভয় করে না, তারা রাতদিন বিভিন্ন রকমের গুনাহ করে চলেছে। এদের কেউ কেউ আবার গুনাহকে তুচ্ছজ্ঞান করে। এজন্য দেখবেন এদের কেউ কেউ সগীরা গুনাহকে খুবই তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে দেখে থাকে।

যেমন বলে, একবার খারাপ কিছু দেখলে অথবা কোন বেগানা মহিলার সাথে করমর্দন করলে কি-ই বা ক্ষতি হবে?

অনেকেই আগ্রহ ভরে হারাম জিনিসের দিকে নজর দেয় পত্র-পত্রিকায় বা টিভি সিরিয়াল বা সিনেমার দিকে, এমনকি এদের কেউ কেউ যখন জানতে পারে যে এটি হারাম, তখন খুবই রসিকতা করে প্রশ্ন করে, এতে কত গুনাহ রয়েছে? এটি কি কবীরা গুনাহ না সগীরা গুনাহ? আপনি যখন এটির বাস্তব অবস্থা জানবেন তখন তুলনা করে দেখুন নিমোক্ত দুটি বর্ণনার সাথে যা ইমাম বুখারী উল্লেখ করেছেন:

এক: হযরত আনাস রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তোমরা এমন সব কাজ কর যা তোমাদের দৃষ্টিতে চুলের চেয়েও সূক্ষ্ম। কিন্তু আমরা রাসূলুল্লাহর যুগে এগুলোকে মনে করতাম ধ্বংসকারী।

দুই: হযরত ইবনে মাসউদ রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একজন মুমিন গুনাহকে এভাবে দেখে থাকে যে, সে যেন এক পাহাড়ের নিচে বসে আছে যা তার মাথার উপর ভেঙ্গে পড়বে। পক্ষান্তরে পাপী তার গুনাহকে দেখে যেন মাছি তার নাকের ডগায় বসেছে, তাকে এভাবে তাড়িয়ে দেয়।

এরা কি বিষয়টির বিপজ্জনকতা উপলব্ধি করতে পারবে যখন তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই হাদীস পাঠ করবে ;

তোমরা নগণ্য ছোট ছোট গুনাহ থেকে সাবধান হও! নগণ্য ছোট ছোট গুনাহগুলোর উদাহরণ হল ঐ লোকদের মত যারা কোন মাঠে বা প্রান্তরে গিয়ে অবস্থান করল এবং তাদের প্রত্যেকেই কিছু কিছু করে লাকড়ি (জ্বালানি কাঠ) সংগ্রহ করে নিয়ে এলো। শেষ পর্যন্ত এতটা লাকড়ি তারা সংগ্রহ করল যা দিয়ে তাদের খাবার পাকানো হল। নিশ্চয় নগণ্য ছোট ছোট গুনাহতে লিপ্ত থাকা ব্যক্তিদেরকে যখন সেই নগণ্য ছোট ছোট গুনাহগুলো গ্রাস করবে (পাকড়াও করবে) তখন তাদেরকে ধ্বংস করে ফেলবে। অন্য এক বর্ণনায় এসেছে যে, তোমরা নগণ্য ছোট ছোট গুনাহ থেকে সাবধান হও; কেননা সেগুলো মানুষের কাঁধে জমা হতে থাকে অতঃপর তাকে ধ্বংস করে দেয়। (আহমদ, সহীহ আল-জামে ২৬৮৬-২৬৮৭)

বিদ্বানগণ উল্লেখ করেছেন: যখন সগীরা গুনাহর সাথে লজ্জাশরম কমে যাবে, কোন কিছুতে ভ্রুক্ষেপ করবে না, খোদাভীতি থাকবে না এবং আল্লাহর ব্যাপারে ভক্তি হবে না তখন একে কবীরা গুনাহতে পরিণত করবে। এজন্যই বলা হয়েছে যে, ক্রমাগত পাপ করলে তা আর সগীরা থাকে না এবং ক্ষমা প্রার্থনা করলে কবীরা থাকে না। অর্থাৎ ক্রমাগতভাবে সগীরা গুনাহ করতে থাকলে তা কবীরা গুনাহে পরিণত হয় এবং ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকলে কবীরা গুনাহ আর থাকে না তা মাফ হয়ে যায়। যার এ অবস্থা তাকে আমরা বলি, গুনাহ ছোট আপনি এদিকে দৃষ্টি দিবেন না, বরং আপনি দৃষ্টি দিবেন এদিকে যে, আপনি কার অবাধ্যতা করছেন।

আমার এ কথাগুলো দ্বারা অবশ্যই উপকৃত হবেন ইনশাআল্লাহ সত্যবাদীগণ, যারা অনুভব করছেন তাদের গুনাহ ঘাটতির ব্যাপারটি। তারা নয় যারা তাদের গোমরাহীতে অনড়, তাদের বাতিল অবস্থার প্রতি অবিচল। এটি তাদের জন্য যারা বিশ্বাস করে মহান আল্লাহর এ বাণীকে:

আপনি আমার বান্দাদের জানিয়ে দিন যে, নিশ্চয় আমিই একমাত্র ক্ষমাকারী দয়ালু । (সূরা আল হিজর: ৪৯)

তেমনি যারা ঈমান রাখে এ বাণীর উপর:

আর নিশ্চয়ই আমার শাস্তি হলো যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। (সূরা আল হিজর: ৫০)

তাওবার শর্ত ও এর পরিপূরক বিষয়

 

তাওবা শব্দটি এক মহান শব্দ। এর অর্থ খুবই গভীর। এমন নয় যা অনেকেই মনে করে থাকেন, মুখে শব্দটি বললাম অতঃপর গুনাহে লিপ্ত থাকলাম। আপনি আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণী অনুধাবন করে দেখুন। আল্লাহ্ কি বলছেন:

তোমরা তোমাদের প্রভূর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। অতঃপর তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন (তাওবা) কর। (সূরা হুদ: ৩)

আয়াতের মধ্যে সকলকে ক্ষমা চাইতে বলা হয়েছে, অতঃপর তাওবা করতে বলা হয়েছে। সুতরাং তাওবা হচ্ছে ক্ষমা প্রার্থনার পর অতিরিক্ত আলাদা বিষয়।

কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের জন্য অবশ্যই কিছু শর্ত থাকে। আলেম-ওলামাগণ কুরআন ও হাদীস মন্থন করে তাওবার জন্য কতিপয় শর্ত উল্লেখ করেছেন, তা হলো:
এক: দ্রুত পাপ থেকে বিরত হওয়া।
দুই: পূর্বে যা ঘটে গেছে সে জন্য অনুতপ্ত হওয়া।
তিন: পুনরায় পাপ কাজে ফিরে না আসার জন্য দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করা।
চার: প্রাপকদের হক ফিরিয়ে দেয়া যা অন্যায়ভাবে নেয়া হয়েছিল অথবা তাদের নিকট থেকে মাফ চেয়ে নেওয়া।

আর খালেসভাবে তাওবার জন্য কতিপয় আলেম যেসব শর্ত উল্লেখ করেছেন, নিম্নে সেগুলো উদাহরণসহ আলোচনা করা হচ্ছে।

[এক]: শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য পাপ ত্যাগ করা, অন্য কোন কারণে নয়, যেমন;
অক্ষমতার কারণে পাপ থেকে দূরে থাকা, এসব কর্ম করতে ভাল না লাগা অথবা লোকজন মন্দ বলবে এই ভয়ে পাপ ত্যাগ করা। এজন্য তাকে তাওবাকারী বলা হবে না, যে ব্যক্তি পাপ ত্যাগ করেছে তার মানহানী ঘটায় বা এর জন্য হয়তো সে চাকুরীচ্যুত বা পদবী হারাতে পারে। তাকে তাওবাকারী বলা যাবে না, যে ব্যক্তি পাপ ত্যাগ করল তার শক্তি ও স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য। যেমন; কেউ জেনা করা ত্যাগ করলো যেন দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে বাঁচতে পারে অথবা তার শরীর ও স্মৃতি শক্তিকে দুর্বল না করে।

তেমনিভাবে তাকে তাওবাকারী বলা যাবে না, যে ব্যক্তি চুরি করা ছেড়ে দিয়েছে; কোন বাড়ীতে ঢুকার পথ না পেয়ে বা সিন্দুক খুলতে অসমর্থ কিংবা পাহারাদার ও পুলিশের ভয়ে। তাকে তাওবাকারী বলা যাবে না, যে দূর্নীতি দমন বিভাগের লোকজনদের জোর তৎপরতায় ধরা পড়ার ভয়ে ঘুষ খাওয়া বন্দ রেখেছে। আর তাকেও তাওবাকারী বলা যাবে না, যে ব্যক্তি মদ পান, মাদকদ্রব্য বা হেরোইন সেবন ইত্যাদি ছেড়ে দিয়েছে দারিদ্রের কারণে। তেমনিভাবে তাকেও তাওবাকারী বলা যাবে না, যে সামর্থহীন হওয়ার কারণে গুনাহ করা ছেড়ে দিলো। যেমন মিথ্যা বলা ছেড়ে দিয়েছে তার কথায় জড়তা সৃষ্টি হওয়ার কারণে কিংবা জেনা করছে না যেহেতু সে সহবাস ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে, কিংবা চুরি করা ছেড়ে দিয়েছে আহত হয়ে পঙ্গু হয়ে পড়ার কারণে।

বরং এসবে অবশ্যই অনুতপ্ত হতে হবে, সব ধরনের পাপ থেকে মুক্ত হতে হবে এবং অতীত কর্মকান্ডের জন্য লজ্জিত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।

এ জন্যেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “অনুতপ্ত হওয়াই হলো তাওবা।” (আহমাদ, ইবনে মাজা, সহীহ আল-জামে ৬৮০২)

মহান আল্লাহ আকাংখা পোষণকারী অপারগকে কর্ম সম্পাদনকারীর মর্যাদায় ভূষিত করেছেন। আপনি জানেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি বলেছেন:

দুনিয়া চার প্রকার লোকের জন্য;

(১) সেই বান্দার জন্য যাকে আল্লাহ মাল ও জ্ঞান দান করেছেন সুতরাং সে এতে তার প্রভূকে ভয় করছে, তার আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক রাখছে এবং তার ব্যাপারে আল্লাহর হক জানছে, এ হলো সর্বোত্তম অবস্থানে।

(২) সেই বান্দা যাকে আল্লাহ জ্ঞান দান করেছেন কিন্তু মাল দেননি, সে হলো সঠিক নিয়তের লোক, সে বলে, যদি আমার টাকা পয়সা থাকতো তাহলে উমুক ব্যাক্তির মত কাজ করতাম। সে তার নিয়ত অনুযায়ী সওয়াব পাবে। এদের দুজনের নেকী সমান হবে।

(৩) আর সেই বান্দা যাকে আল্লাহ টাকা পয়সা দিয়েছেন কিন্তু জ্ঞান দান করেননি। সে না জেনেই তার টাকা পয়সা খরচ করছে। এতে সে আল্লাহকে ভয় করে না, আত্মীয়তা রক্ষা করে না এবং এতে আল্লাহর হকও সে জানে না। সে হলো সর্ব নিকৃষ্ট অবস্থানে।

(৪) আর সেই বান্দা যাকে আল্লাহ মালও দেননি জ্ঞানও দেননি, সে বলে আমার টাকা পয়সা থাকলে উমুকের মতই (খারাপ কাজ) করতাম। সে তার নিয়ত অনুযায়ী প্রতিদান পাবে। এরা দুজনই গুনাহর দিক থেকে সমান। (আহমদ, তিরমিযী, সহীহুত তারগীব ওয়াত তারহীব: ১/৯)

[দুই]: পাপের কদর্যতা ও ভয়াবহতা অনুভব করা; অর্থাৎ সঠিক তাওবার সাথে কখনো আনন্দ ও মজা পাওয়া যাবেনা অতীত পাপের কথা স্মরণ হলে অথবা কখনো ভবিষ্যতে সেসব কাজে ফিরে যাবে, এ কামনা মনে স্থান পাবে না।

ইবনুল কাইয়্যেম রহমতুল্লাহ আলাইহে তার লিখা [الداء والدواء ] ‘রোগ ও চিকিৎসা’ এবং [الفوائد ] ‘আল্ফাওয়াইদ’ নামক গ্রন্থে গুনাহের অনেক ক্ষতির কথা উল্লেখ করেছেন। তন্মধ্যে: জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হওয়া, অন্তরে একাকিত্ব অনুভব করা, কাজকর্ম কঠিন হয়ে যাওয়া, শরীর দুর্বল হয়ে যাওয়া, আল্লাহর আনুগত্য থেকে বঞ্চিত হওয়া, বরকত কমে যাওয়া, কাজে সমন্বয় না হওয়া, গুনাহর কাজে অভ্যস্থ হয়ে যাওয়া, আল্লাহর ব্যাপারে পাপীর অনাসক্তি সৃষ্টি হয় এবং লোকজন তাকে অশ্রদ্ধা করে, জীবজন্তু তাকে অভিশাপ দেয়, সে সর্বদা অপমানিত হতে থাকে, অন্তরে মোহর পড়ে যায়, লানতের মাঝে পড়ে এবং দু’আ কবুল হয় না, জলে ও স্থলে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়, আত্মমর্যাদাবোধ কমে যায়, লজ্জা চলে যায়, নিয়ামত দূর হয়ে যায়, আজাব নেমে আসে, পাপীর অন্তরে সর্বদা ভয় নেমে আসে এবং সে শয়তানের দোসরে পরিণত হয়, তার জীবন সমাপ্ত হয় মন্দের উপর এবং পরকালীন আজাবে নিপতিত হয়।

পাপের এই ক্ষতি ও বিপর্যয় যদি বান্দা জানতে পারে তাহলে সে পাপ থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকবে। কিছু কিছু লোক এক পাপ ছেড়ে আরেক পাপ করতে শুরু করে তার কিছু কারণ হলো:

১. মনে করে যে, এর পাপ কিছুটা হালকা।
২. মন পাপের দিকে বেশী আকৃষ্ট হয় এবং এর দিকে ঝোক খুবই প্রবল থাকে।
৩. এ পাপ করার জন্য পারিপার্শিক অবস্থা সহজ ও সহায়ক হয় অন্যটির তুলনায়, অন্য পাপের মোকাবেলায় যার জন্য অনেক কিছু জোগাড় করা লাগে।
৪. তার সঙ্গী সাথীরা এ পাপের সাথে জড়িত, তাদেরকে ত্যাগ করা কঠিন বলে মনে হয়।

৫. কোন কোন ব্যক্তির নিকট বিশেষ পাপ তার মান সম্মানের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় তার সঙ্গী সাথীদের মাঝে। এজন্য সে চিন্তা করে যেন তার অবস্থান সে ধরে রাখে এবং এ পাপ অব্যাহত রাখে, যেমনটি ঘটে বিভিন্ন অপরাধ ও সন্ত্রাসী গ্র“পের প্রধানদের বেলায়। যেমনটি ঘটেছিল অশ্লীল কবি আবু নাওয়াসের বেলায়, যখন তাকে কবি আবুল আতাহিয়া উপদেশ দেয় ও ভর্ৎসনা করে তার পাপের জন্য। সে তখন জবাবে লিখে –

হে আতাহিয়া! তুমি কি চাও আমি
ছেড়ে দেই আনন্দ ফূর্তি করা
তুমি কি চাও আমি ধর্মকর্ম করে হারিয়ে ফেলি
আমার লোকদের কাছে আমার মর্যাদা।

[তিন]: যার জন্য তাওবার প্রয়োজন সে যেন তাড়াতাড়ি তাওবা করে। কারণ তাওবা করতে দেরী করাটাই পাপ।

[চার]: আল্লাহর হক যা ছুটে গেছে তা যথাসম্ভব আদায় করা। যেমন জাকাত দেয়া যা সে পূর্বে দেয়নি। কেননা এতে আবার দরিদ্র লোকজনের অধিকারও রয়েছে।

[পাঁচ]: পাপের স্থানকে ত্যাগ করা যদি সেখানে অবস্থান করলে আবার সে পাপে জড়িয়ে পড়ার আশংকা থাকে।

[ছয়]: যারা পাপ কাজে সহযোগিতা করে তাদেরকে পরিত্যাগ করা (এটিও পূর্ববর্তী ১০০টি লোক হত্যাকারীর হাদীস থেকে গ্রহণ করা হয়েছে।)
মহান আল্লাহ বলেন:

আন্তরিক বন্ধুরাই সেদিন একে অপরের শত্রুতে পরিণত হবে, মুত্তাকীরা ছাড়া। (সূরা আল-যুখরুফ: ৬৭)

খারাপ সাথীরা একে অপরকে কিয়ামতের দিন অভিশাপ দিবে। এজন্য হে তাওবাকারী, আপনাকে এদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে ও এদের থেকে সতর্ক থাকতে হবে, যদি আপনি তাদেরকে দাওয়াত দিতে অপারগ হন। শয়তান যেন আপনার ঘাড়ে আবার সওয়ার হবার সুযোগ না পায় এবং আপনাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে আবার কুপথে নিয়ে না যায়। আর আপনি তো জানেন যে, আপনি দুর্বল তাকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবেন না। এ ধরণের অনেক ঘটনা রয়েছে যে, অনেক লোকই তার পুরাতন বন্ধু বান্ধবের সাথে সম্পর্কিত হওয়ার পর আবার পাপে জড়িয়ে পড়েছে।

[সাত]: নিজের কাছে রক্ষিত হারাম জিনিসকে নষ্ট করে ফেলা। যেমন মাদক দ্রব্য, বাদ্যযন্ত্র, যেমন একতারা, হারমনিয়াম, অথবা ছবি, ব্লু ফ্লিম, অশ্লীল নভেল নাটক। এগুলো নষ্ট করে ফেলতে হবে অথবা পুড়িয়ে ফেলতে হবে। তাওবাকারীকে সঠিক পথে দৃঢ়ভাবে থাকার জন্য অবশ্যই সব জাহেলিয়াতের জিনিস থেকে মুক্ত হতে হবে। এ ধরণের অনেক ঘটনা রয়েছে, যাতে দেখা যায়, এসব হারাম জিনিসই তাওবাকারীর পূর্বের অবস্থানে ফিরে যাবার পিছনে প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এর দ্বারাই সে পথভ্রষ্ট হয়েছে। আমরা আল্লাহর নিকট সঠিক পথে টিকে থাকার জন্য তাওফীক কামনা করছি।

[আট]: ভাল সঙ্গী-সাথী গ্রহণ করতে হবে যারা তাকে দ্বীনের ব্যাপারে সহায়তা করবে এবং এরা হবে খারাপ সঙ্গী সাথীর বিকল্প। আর চেষ্টা করতে হবে বিভিন্ন ধর্মীয় ও ইলমী আলোচনায় বসার জন্য। নিজেকে সব সময় এমন কাজে মশগুল রাখতে হবে যাতে কল্যাণ রয়েছে, যেন শয়তান তাকে পূর্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেবার সুযোগ না পায়।

[নয়]: নিজ শরীরের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে যাকে সে হারাম দিয়ে প্রতিপালন করেছে। একে আল্লাহর আনুগত্যের কাজে লাগাতে হবে এবং হালাল রুজি খেতে হবে যেন শরীরে আবার পবিত্র রক্ত-মাংস সৃষ্টি হয়।

[দশ]: তাওবা দম আটকে যাওয়া বা ফুরিয়ে যাবার (মৃত্যুর পূর্বক্ষণে শ্বাসকষ্ট শুরু হবার) পূর্বে এবং পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হবার পূর্বে হতে হবে। ঘড়ঘড়ার অর্থ হলো কণ্ঠনালী হতে এমন শব্দ বের হওয়া যা মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে হয়ে থাকে। এর উদ্দেশ্য হলো কিয়ামতের পূর্বেই তাওবা করতে হবে তা ছোট কিয়ামত হোক (মৃত্যু) বা বড় কিয়ামতই হোক (পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হওয়া)।

কেননা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহর নিকট তাওবা করবে ঘড়ঘড়া উঠার পূর্বে, আল্লাহ তার তাওবা কবুল করবেন।” (আহমাদ, তিরমিযী, সহীহ আল জামে’ : ৬১৩২)

অপর হাদীসে তিনি বলেন: “যে ব্যক্তি পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উঠার পূর্বে তাওবা করবে, আল্লাহ তা’আলা তার তাওবা কবুল করবেন।” (মুসলিম)

তওবার জন্য নামাজঃ

হযরত আবু বকর রাযিআল্লাহু তা’আলা আনহু হতে বর্ণিত তিনি বলেন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, কোন মানুষ পাপ করার পর যদি পবিত্রতা অর্জন করে, অতঃপর নামায পড়ে এরপর আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে, তাহলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেবেন। (আসহাবুস সুনান, সহীহ আত্তারগীব ওয়াত্তারহীব ১/২৮৪)

অতঃপর তিনি এ আয়াত পাঠ করেন:

যারা অশ্লীল কাজ করার পর অথবা নিজেদের প্রতি জুলুম করার পর আল্লাহকে স্মরণ করে এরপর নিজেদের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে, আর আল্লাহ ব্যতীত গুনাহ সমূহ ক্ষমা করতে কেউ সক্ষম নয় এবং তারা নিজেদের কৃতকর্মের উপর অটল থাকে না এবং তারা (গুনাহের বা পাপের উপর অটল থাকার ভীষণ পরিণাম) জানে। (সূরা আলে-ইমরান: ১৩৫)

অন্যান্য সহীহ বর্ণনায় এসেছে এই দু’রাকাতের গুণাবলীর কথা যা গুনাহ মাফের কারণ হবে তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ:

(১) যে কেউ সুন্দরভাবে অযু করে তার সগীরা গুনাহ মাফ করে দেয়া হয় (কেননা অযু করলে ধৌত অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সগীরা পাপ পানির সাথে অথবা পানির শেষ বিন্দুর সাথে ঝরে পড়ে)
আর উত্তমভাবে অযু হলো: প্রথমে বিসমিল্লাহ বলে শুরু করা এবং শেষে এ দু’আ করা:

আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহু

“আমি সাক্ষ্য দিচিছ যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন সত্য মাবুদ নেই। তিনি একক তাঁর কোন শরীক নেই এবং আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ তাঁর বান্দা ও রাসূল।

হে আল্লাহ! আমাকে তাওবাকারীদের এবং পবিত্রতা অর্জনকারী ব্যাক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করুন। হে আল্লাহ! আপনার স্তুতির সাথেই আমি আপনার প্রশংসা করছি। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি ব্যতীত কোন সত্য মাবুদ নেই। আমি আপনার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং আপনার নিকট তাওবা করছি।”

(২) এতে মনে মনে কোন কথা বলা যাবে না।
(৩) এতে একাগ্রতা ও বিনয়ীভাব আনতে হবে।
(৪) এরপর ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে।

পূর্বোক্ত কাজের ফলাফল:

(ক) পূর্বের সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে।
(খ) জান্নাত অবধারিত হয়ে যাবে। (সহীহ আততারগীব ১/৯৪-৯৫)

তওবার পর করণীয়ঃ

আপনি সহীহ হাদীসে উল্লিখিত এই উদাহরণটি ভালভাবে চিন্তা করে দেখুন! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

ঐ ব্যক্তির উদাহরণ হলো, যে খারাপ কাজ করে সে সেই ব্যক্তির মত যার গায়ে খুব আটোসাটো লৌহবর্ম চাপান আছে যা তাকে চেপে ধরে রেখেছে, অতঃপর সে একটি নেক কাজ করলে একটি আংটা খুলে গেল, অতঃপর আরেকটি নেক কাজ করলে আরেকটি আংটা খুলে গেল, এভাবে সব খুলে মাটিতে পড়ে যায়

(মুসনাদে আহমাদ, তাবারানী)

সুতরাং নেকী পাপীকে গুনাহের বন্দীখানা থেকে মুক্ত করে তাকে আনুগত্যের প্রশস্ত ময়দানে বের করে নিয়ে আসে। প্রিয় ভাই! নিচের ঘটনা আপনাকে বিষয়টি আরো পরিষ্কার করে দিবে।

হযরত ইবনে মাসউদ রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বলে,

হে আল্লাহর রাসূল! আমি এক মহিলাকে বাগানের ভিতর একাকী পেয়ে সব কিছুই করেছি কিন্তু সহবাস করিনি। চুমা খেয়েছি, তাকে চেপে ধরেছি, এছাড়া আর কিছু করিনি। এখন আপনি আমার ব্যাপারে যা ইচ্ছা করতে পারেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে কিছু বললেন না, সুতরাং লোকটি চলে গেল। অতঃপর হযরত উমর রাযিআল্লাহু তা’আলা আনহু বলেন, আল্লাহ লোকটির অবস্থা গোপন রেখেছিলেন যদি সে নিজের কথা গোপন রাখত। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চোখ তুলে তাকালেন এবং বললেন, ওকে আমার কাছে নিয়ে এসো।
যখন তাকে ডেকে নিয়ে আসা হলো তখন তাকে এ আয়াত পাঠ করে শুনালেন:

আপনি নামাজ প্রতিষ্ঠা করুন দিনের দুই প্রান্তে এবং রাতের একটি অংশে। নিশ্চয়ই নেকী গুনাহকে মিটিয়ে দেয়। এটি হলো উপদেশ, উপদেশ গ্রহণকারীদের জন্য। (সূরা হুদ: ১১৪)

মুয়ায রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু বলেন, অপর বর্ণনায় এসেছে হযরত উমার থেকে তিনি বললেন: হে আল্লাহর রাসুল! এটি কি তার একার জন্য না সকল মানুষের জন্য? তখন তিনি বললেন, বরং সমস্ত মানুষের জন্য। (মুসলিম)

আল্লাহ আমাদের সবাইকে খালেসভাবে তওবা করে তাঁর পথে ফিরে আসার তওফিক দান করুন আমীন।

পাপের ভয়াবহতা, সগিরা গুনাহ, তওবার শর্ত, তওবার নিয়ম, পাপ থেকে বাচার উপায়, তওবার ফলাফল।

********************

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s